একগুঁয়েমি ও অভিমান পরিহার করে সংসদীয় ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় যুক্তিভিত্তিক আলোচনায় অংশ নিতে বিরোধীদলকে আহ্বান জানিয়েছেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। তিনি বলেছেন, বিরোধীদল সংসদের ৩৪টি কমিটিতে সদস্য মনোনয়ন দিলেও সংবিধান সংশোধন কমিটিতে নাম না দেওয়া যুক্তিসংগত নয়।
মন্ত্রীর ভাষ্যে, জনগণ সংসদে প্রতিনিধি পাঠিয়েছে আলোচনা করার জন্যই; রাষ্ট্র রাগ বা অভিমানে চলে না, রাষ্ট্র চলে যৌক্তিকতার ভিত্তিতে।
সংবিধান দিবস উপলক্ষে বুধবার (৪ নভেম্বর) বিকেলে জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। আলোচনা সভার আয়োজন করে গণফোরাম।
ডা. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘উনারা (বিরোধীদল) সব সংসদীয় কমিটিতে যাবেন, মিটিং করবেন, নাম দেবেন, কিন্তু সংবিধান সংশোধন কমিটিতে নাম দেবেন না, এটা কেমন কথা! ৩৪টা কমিটিতে নাম দিয়েছেন, যুক্তিটা কী? জনগণ তো সংসদে পাঠিয়েছে আলোচনা করার জন্যই।’
তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্র রাগ বা অভিমান দিয়ে চলতে পারে না; রাষ্ট্র চলবে যৌক্তিকতা দিয়ে। সংসদীয় কমিটিতে গিয়ে আলোচনা করতে হবে, নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরতে হবে; এরপর সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতই গ্রহণযোগ্য হবে।
কেউ কেউ এমন মনোভাব দেখাচ্ছেন যে, ‘আমি যেটা চেয়েছি সেটাই পেতে হবে, না হলে আমি নাই’ বলে মন্ত্রী উল্লেখ করেন। শিশুদের মতো ঘুঁয়ারেমি বা একগুঁয়েমি পরিহার করে সংসদীয় ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় যুক্তি দিয়ে কথা বলা এবং জাতীয় স্বার্থে আলোচনায় অংশ নেওয়াই দায়িত্বশীল রাজনৈতিক আচরণ বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সংবিধান পরিবর্তনের যুক্তি
সংবিধানের প্রয়োজনীয় পরিবর্তন ও পরিমার্জনের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে ডা. জাহিদ বলেন, মানুষের জীবন একটি গতিশীল বিষয়। পরিবর্তিত জন-আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ ও প্রতিফলন করার নামই সংবিধান।
স্বাধীনতার সময় দেশের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি, যা এখন বেড়ে ১৮ কোটিতে দাঁড়িয়েছে বলে তিনি জানান। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে সঠিকভাবে সেবা দেওয়া, মানবাধিকার নিশ্চিত করা এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার স্বার্থে সংবিধানে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন ও পরিমার্জন আনা যুক্তিসঙ্গত ও স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধ একটি জাতির ইতিহাসে বারবার আসে না, এটি একবারই এসেছে। এর ঐতিহাসিক চেতনাকে রক্ষা করতে হবে। সংবিধানে প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধন বা পরিমার্জন করা যেতে পারে।
এ প্রসঙ্গে তিনি একটি বাড়ির উদাহরণ দেন—একটি বাড়ির কক্ষের নকশা, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কিংবা ভেতরের সাজসজ্জা পরিবর্তন করা যায়, কিন্তু যে ভিত্তির ওপর বাড়িটি দাঁড়িয়ে আছে, তা ভেঙে ফেলা যায় না। সংবিধানের ক্ষেত্রেও মূল ভিত্তি অক্ষুণ্ন রেখে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
দ্বিমুখী আচরণ বন্ধের আহ্বান
রাজনীতিতে দ্বিমুখী আচরণ ও সুযোগসন্ধানী প্রবণতা বন্ধের আহ্বান জানিয়ে সমাজকল্যাণমন্ত্রী বলেন, রাজনীতির ভেতরে মনে এক আর মুখে আরেক প্রকাশের যে মুনাফেকি ও গুণগত অধঃপতন ঘটেছে, তা বন্ধ করা জরুরি।
তিনি বলেন, স্বার্থ হাসিল কিংবা ভোটের উদ্দেশ্যে হঠাৎ সুহৃদ সেজে সুযোগসন্ধানী আচরণ এবং নিজের পরিচয় গোপন করে অন্যের ক্ষতি করার রাজনীতি প্রতিহত করতে হবে। যে দলই এমন করুক না কেন, সুযোগসন্ধানীদের চিহ্নিত করতে হবে।
‘সবার আগে বাংলাদেশ’ চেতনাকে সামনে রেখে দেশের স্বাধীনতা, অস্তিত্ব ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
দেশের স্বাধীনতা, জাতীয় পতাকা ও সার্বভৌমত্বকে জাতির সবচেয়ে বড় অর্জন উল্লেখ করে ডা. জাহিদ বলেন, রাজনীতিতে যাতে স্বৈরাচার বা কর্তৃত্ববাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে এবং মানুষের মানবাধিকার অক্ষুণ্ন থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। দেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষায় ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
সভায় যারা ছিলেন
আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সভাপতি ও গণফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ড. কামাল হোসেন। সভাপতিত্ব করেন গণফোরামের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী। সভা সঞ্চালনা করেন দলটির সাধারণ সম্পাদক ডা. মো. মিজানুর রহমান।
সম্মানিত আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য অধ্যাপক ড. আবু সাঈদ, বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও সংসদ সদস্য জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ফজলুর রহমান, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না এবং আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক।
Source: জাগো নিউজ২৪






