স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তপশিল এখনো ঘোষণা হয়নি, তবে এর আগেই ভোটের হিসাব-নিকাশ শুরু করে দিয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো। সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাই, তাদের জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা যাচাই, প্রতিটি পদে একক প্রার্থী নিশ্চিত করা এবং দলের ভেতরের কোন্দল সামাল দিতে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত তৎপরতা চলছে। বিএনপি আনুষ্ঠানিক মনোনয়ন না দিয়ে এলাকায় জনপ্রিয় ও জয়ের সম্ভাবনা আছে—এমন নেতাদের সমর্থন দেওয়ার পথে হাঁটছে, আর জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটে দেখা দিয়েছে কৌশলগত মতভেদ: জামায়াত একা লড়ার প্রস্তুতি নিলেও শরিকেরা সমঝোতার দিকে বেশি ঝুঁকছে এবং তাদের ধারণা, শেষ পর্যন্ত জামায়াতও সেদিকে আসতে পারে।
রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন সাংবাদিকদের জানান, সেপ্টেম্বরে তপশিল ঘোষণা হতে পারে এবং নভেম্বরে ভোটগ্রহণ শুরু করতে চায় ইসি। বিএনপির নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানিয়েছে, এ নির্বাচনে দল আনুষ্ঠানিকভাবে কাউকে মনোনয়ন দেবে না; দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান শুধু সিটি করপোরেশনের মেয়র পদপ্রার্থীদের পরিচয় আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরবেন। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও উপজেলায় সমর্থন দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রার্থীর স্থানীয় জনপ্রিয়তা, গ্রহণযোগ্যতা ও জয়ের সম্ভাবনার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট আসনের সংসদ সদস্য এবং জেলার শীর্ষ নেতাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
দলীয় সূত্র জানায়, গত ৪ জুলাই থেকে গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে বিভাগভিত্তিক জেলা নেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিক সাংগঠনিক বৈঠক করছেন তারেক রহমান; ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের বৈঠক শেষ হয়েছে, খুলনা, বরিশাল ও ময়মনসিংহসহ বাকি বিভাগগুলোর সঙ্গে পর্যায়ক্রমে বসার কথা রয়েছে। সর্বশেষ চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও পাবনার নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি কোন্দল মিটিয়ে একক প্রার্থী বাছাইয়ের নির্দেশ দেন, আর বিতর্কিত কাউকে সমর্থন না দিতেও নেতাদের সতর্ক করা হচ্ছে। ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী বাছাইয়ের ভার উপজেলা নেতাদের এবং উপজেলা চেয়ারম্যান বাছাইয়ের ভার জেলা নেতাদের দেওয়া হয়েছে; দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কেউ বিদ্রোহী প্রার্থী হলে কঠোর ব্যবস্থার কথাও জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, প্রতিটি এলাকায় স্থানীয় নেতারা জরিপ করবেন, আর প্রার্থী বাছাইয়ে জনপ্রিয়তা, গ্রহণযোগ্যতা, আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা ও জয়ের সম্ভাবনা দেখা হবে। তার ভাষ্য, ক্ষমতা বা টাকাপয়সা কম থাকলেও এলাকায় যার ব্যাপক জনসমর্থন আছে, দল তাকেই সমর্থন দেবে। রিজভী জানান, দলীয় প্রতীক না থাকায় ইউনিয়ন ও পৌরসভার প্রার্থী নিয়ে মত দেবেন উপজেলা বিএনপির নেতারা, আর উপজেলা চেয়ারম্যান প্রার্থী ঠিক করবেন জেলার নেতারা।
দলের একাধিক নেতা মনে করেন, তপশিলের আগে প্রার্থী চূড়ান্ত হলে ভেতরের গ্রুপিং কমবে এবং সহিংসতাও অনেকটা এড়ানো যাবে; তবে দলীয় প্রতীক না থাকায় স্থানীয় অনেক প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে চাইতে পারেন, প্রতিটি এলাকায় আগ্রহীর সংখ্যাও একাধিক। ইতোমধ্যে বহু জায়গায় সম্ভাব্য প্রার্থীরা একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ কমিয়ে দিয়েছেন, কেউ কেউ অনুসারীদের নিয়ে আলাদা শোডাউন করছেন, ফলে কেন্দ্রের নির্দেশনা মেনে বিদ্রোহী প্রার্থী ঠেকানোই এখন দলটির বড় চ্যালেঞ্জ। দলীয় সমর্থন পেতে এমপির সমর্থন জরুরি—এমন ধারণা থেকে সম্ভাব্য প্রার্থীদের অনেকে ঢাকায় এসে নিজ এলাকার সংসদ সদস্য ও দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে দেখা করছেন, এলাকায় এমপি গেলেও নিয়মিত সাক্ষাৎ করছেন।
জামায়াতের সূত্র বলছে, তপশিলের আগেই দেশের ৮০ শতাংশের বেশি এলাকায় সম্ভাব্য প্রার্থী ঠিক করে প্রচারে নেমেছে দলটি; সিটি করপোরেশনের মেয়র ও ওয়ার্ড কাউন্সিলর থেকে শুরু করে ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্য পদ পর্যন্ত প্রার্থী অনুমোদন পেয়েছেন, যেখানে অগ্রাধিকার পাচ্ছেন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জোটের হিসাবের কারণে মনোনয়নবঞ্চিত জ্যেষ্ঠ নেতারা, আর শক্ত প্রার্থী না থাকলে স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় কাউকে সমর্থনের কৌশল নেওয়া হয়েছে। দলটির নেতারা বলছেন, জুলাই সনদের বাস্তবায়ন, রাষ্ট্র সংস্কার আর জাতীয় নির্বাচন—মূলত এই তিন লক্ষ্যে ১১ দলীয় ঐক্য গড়া হয়েছিল; প্রতীকহীন স্থানীয় নির্বাচন প্রতিটি দলের সাংগঠনিক শক্তি ও স্থানীয় নেতৃত্ব যাচাইয়ের ক্ষেত্র বলে কেন্দ্রীয়ভাবে সমঝোতার পরিকল্পনা তাদের নেই। দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এইচএম হামিদুর রহমান আযাদের ভাষ্য, জোট হয়েছিল জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে, অতীতেও স্থানীয় ভোট জোটগতভাবে হয়নি এবং এবার দলীয় প্রতীকও নেই; সংসদের ৩০০ আসনে সমঝোতা করতেই কয়েক মাস লেগেছিল, অথচ স্থানীয় নির্বাচনের পরিসর অনেক বড়, তবে মাঠপর্যায়ে কোথাও সমঝোতা হলে কেন্দ্রের আপত্তি থাকবে না।
জোটের শরিকদের ধারণা, শেষ মুহূর্তে জামায়াত সমঝোতায় আগ্রহ দেখাতে পারে এবং আগেভাগে সারা দেশে একক প্রার্থী ঠিক করে রাখায় দর-কষাকষিতে বাড়তি সুবিধা পেতে পারে; তাই পাল্টা কৌশল হিসেবে এনসিপিসহ কয়েকটি দল নিজেদের মতো করে একক প্রার্থী বাছাইয়ে নেমেছে, আর জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতা না হলে এনসিপি ও জোটের বাইরের কয়েকটি দলকে নিয়ে বিকল্প বোঝাপড়ার কথাও ভাবছে শরিকেরা। এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন জানান, দলটি এককভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং জেলা-উপজেলা সফর করে কমিটি গঠনের পাশাপাশি প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে; ১১ দলীয় ঐক্যে সমঝোতার সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি, তবে হলে জাতীয় নির্বাচনের মতোই প্রার্থী প্রত্যাহার করা হবে। জোটের আরেক শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ৩০ সদস্যের নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করেছে এবং দলের ৮২টি সাংগঠনিক ইউনিটকে ভাগ করা হয়েছে আটটি জোনে; দলটির মহাসচিব জালালুদ্দীন আহমদ জানান, আগামী সপ্তাহে সম্ভাব্য প্রার্থীর তালিকা জমা পড়বে ও শিগগির তা চূড়ান্ত হবে, আর যেখানে শরিকদের ভালো প্রার্থী থাকবে, সেখানে অন্যরা স্থানীয়ভাবে সমর্থন দিয়ে সরে দাঁড়াতে পারেন।






