১৯৭৫ সালের ১১ নভেম্বর তৎকালীন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান নিজেকে রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কহীন একজন সৈনিক হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন এবং নিজের সরকারকে অরাজনৈতিক বলেছিলেন। পরের তিন বছরে সামরিক বাহিনীর শীর্ষ পদ থেকে ধীরে ধীরে তিনি রাজনীতির কেন্দ্রে উঠে আসেন এবং ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর গঠন করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এই যাত্রায় ছিল কয়েকটি ধাপ: ১৯ দফা ঘোষণা, গণভোট, উপদেষ্টা হিসেবে বেসামরিক ব্যক্তিদের যুক্ত করা, নানা দলের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং জাগদল ও জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট গঠন।
১৯৭৬ সালের মে মাসে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের এক জনসভায় তিনি নিজেকে ‘একজন শ্রমিক’ বলে পরিচয় দেন। পরের বছর ৩০ এপ্রিল উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উৎপাদন বৃদ্ধিকে গুরুত্ব দিয়ে ঘোষণা করেন ১৯ দফা কর্মসূচি, যা পরে তার রাজনীতির অন্যতম ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৭৭ সালেই তার প্রতি আস্থা যাচাইয়ে গণভোট হয়; নির্বাচন কমিশনের হিসাবে ভোট পড়ে ৮৮ দশমিক ৫০ শতাংশ, যার ৯৮ দশমিক ৯ শতাংশ ছিল হ্যাঁ ভোট।
গণভোটের পর জিয়াউর রহমান বেসামরিক ব্যক্তিদের উপদেষ্টা করেন এবং বিভিন্ন দলের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন, যাদের অন্যতম মশিউর রহমান যাদু মিয়া, তিনি তখন ভাসানী-ন্যাপের সভাপতি। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নুরুল ইসলাম শিশু তখন সেনাবাহিনীর প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার; তার দপ্তরে রাতে রাজনীতিকদের আসা-যাওয়া ছিল, মাঝেমধ্যে সেখানে তাদের সঙ্গে বসতেন জিয়া। জিয়ার একান্ত সচিব কর্নেল অলি আহমদ নিজেও তৃণমূলের রাজনীতিকদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতেন।
নিজের নামে সরাসরি দল গড়ার আগে অনুগত একটি রাজনৈতিক শক্তি তৈরির চেষ্টা করেন জিয়া। ১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে গঠিত জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) তেমন সাড়া জাগাতে পারেনি; পরে ১ মে তাকে চেয়ারম্যান করে নানা দল ও গোষ্ঠী নিয়ে গঠিত হয় জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট। ১৯৭৮ সালের ২৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তিনি জয়ী হন, পান ৭৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ ভোট।
জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টের অভিজ্ঞতার পর একক দল গঠনের সিদ্ধান্ত নেন জিয়া। আলোচনায় থাকা তানভীর আহমেদ সিদ্দিকী জাস্টিস পার্টি নাম প্রস্তাব করলেও তা পছন্দ হয়নি জিয়ার; দলের নামে জাতীয়তাবাদী শব্দটি রাখা জরুরি মনে করে তিনি নিজেই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল নাম ঠিক করেন। ১৯৭৮ সালের ২৮ আগস্ট জাগদল বিলুপ্ত ঘোষণার পর ১ সেপ্টেম্বর ঢাকার রমনা রেস্তোরাঁ প্রাঙ্গণে সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির নাম, গঠনতন্ত্র ও কর্মসূচি ঘোষণা করেন তিনি; প্রথমে ১৮ সদস্যের এবং ১৯ সেপ্টেম্বর ৭৬ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি দেওয়া হয়।
নতুন দলে বাম, ডান ও মধ্যপন্থি নানা মতের মানুষকে যুক্ত করা হয়, সামনে আনা হয় ৪৫ শতাংশ নতুন ও তরুণ মুখ। গঠনতন্ত্র তৈরির কাজে সরাসরি যুক্ত ৯ জনের মধ্যে জিয়াউর রহমান ছাড়াও ছিলেন মওদুদ আহমদ, নাজমুল হুদা, বিচারপতি আবদুস সাত্তার, ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও মশিউর রহমান যাদু মিয়া; বদরুদ্দোজা চৌধুরী হন দলের প্রথম মহাসচিব। জিয়াউর রহমানের ছেলে তারেক রহমান এখন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন।






