বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর; দলটির প্রতিষ্ঠাতা তখনকার সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান। লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদের ‘বিএনপি সময়-অসময়’ বইয়ে (প্রথমা প্রকাশন, ২০১৬) সেনা উর্দি ছেড়ে রাজনীতির মঞ্চে জিয়ার এই উত্তরণকে ধাপে ধাপে ক্ষমতা ও জনসমর্থনের নতুন হিসাব মেলানোর কাহিনি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ১৯৭৫ সালের ১১ নভেম্বর বেতার-টেলিভিশন ভাষণে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান নিজেকে রাজনীতিবিদ নয়, একজন সৈনিক হিসেবে পরিচয় দিয়ে সরকারকে নির্দলীয় ও অরাজনৈতিক বলেছিলেন, আর ১৯৭৬ সালের মে মাসে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের এক জনসভায় বলেছিলেন, ‘আমি একজন শ্রমিক।’

বইয়ের বর্ণনা অনুযায়ী, একজন সৈনিক কীভাবে একের পর এক ধাপ পেরিয়ে ক্ষমতার চূড়ায় পৌঁছাতে পারেন, তার নকশা আগেই তৈরি করে গিয়েছিলেন পাকিস্তানের সেনাপতি আইয়ুব খান, আর স্বভাবে ধীর-স্থির জিয়া সেই পথ ধরেই ধীরে ধীরে এগোন। উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে জোর দিয়ে ১৯৭৭ সালের ২২ মে আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে তিনি ১৯ দফা কর্মসূচি দেন; সেনাবাহিনীতে তাঁর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকলেও এবং রাজনৈতিক বিরোধীরা বিভক্ত ও দিশেহারা থাকলেও তিনি যে কেবল অস্ত্রের জোরে নয়, জনসমর্থন নিয়েই ক্ষমতায় আছেন, তা দেখানোর প্রয়োজন ছিল। সেই আস্থা যাচাইয়ে হ্যাঁ-না ভোট হয়, যেখানে নির্বাচন কমিশনের হিসাবে ৮৮.৫০ শতাংশ ভোটার অংশ নেন এবং তাঁদের ৯৮.৯ শতাংশ হ্যাঁ ভোট দেন; বইয়ে ভোটার উপস্থিতির এই হারকে অবিশ্বাস্য বলা হয়েছে এবং গণভোটের মধ্য দিয়ে জিয়া রাজনৈতিক বৈধতার ছাড়পত্র তৈরি করেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

জিয়া তাঁর উপদেষ্টা পরিষদে কয়েকজন বেসামরিক পরিচিত মুখকে যুক্ত করেন, যাঁদের মধ্যে ছিলেন মুহাম্মদ শামসুল হক (রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য), সৈয়দ আলী আহসান (জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য) এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসা প্রশাসন ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ। রাজনীতিকদের মধ্যে শুরুর দিকে যাঁদের সঙ্গে তাঁর আলাপ শুরু হয়, তাঁদের একজন মশিউর রহমান যাদু মিয়া, তখন যিনি ভাসানী-ন্যাপের সভাপতি। বইয়ের ভাষ্যে, ১৯৭৫ সালে মহাসমারোহে বাকশালে যোগ দেওয়া অনেকে আগস্টের মাঝামাঝি পরিস্থিতি উল্টে গেলে নতুন শাসকের অনুগ্রহ পেতে বাকশালের নিন্দায় মেতে ওঠেন, আর এমন রাজনীতিকদের জিয়া দেখতেন খানিকটা করুণা ও খানিকটা ঘৃণা নিয়ে।

জিয়ার কাছে ভিড়তে চাওয়া কারও কারও অভিজ্ঞতা ছিল তিক্ত, যেমন ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ও প্রথম জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, যিনি বর্তমানে বিএনপি নেতা। ১৯৭৫ সালের নভেম্বরে খন্দকার মোশতাকের গড়া ডেমোক্রেটিক লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি; ১৯৭৭ সালে জিয়া যখন রাজনীতিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করছিলেন, মোশতাক তখন কারাগারে, আর ঠিক হয় দলের পক্ষে মোহাম্মদ উল্লাহ, অলি আহাদ, কে এম ওবায়দুর রহমান ও শাহ মোয়াজ্জেম বঙ্গভবনে গিয়ে জিয়ার সঙ্গে কথা বলবেন। শাহ মোয়াজ্জেমের বর্ণনা উদ্ধৃত করে মহিউদ্দিন আহমদ লিখেছেন, বঙ্গভবনে যাওয়ার কথা বলে তাঁকে গাড়িতে তোলা হলেও গাড়ি চলে যায় অন্য পথে এবং শেষে তাঁকে নেওয়া হয় ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে, যাকে তিনি নিচু স্তরের প্রবঞ্চনা বলে বর্ণনা করেছেন।

দল গঠনের আগে জিয়া বিভিন্ন দলকে নিয়ে একটি রাজনৈতিক ফ্রন্ট গড়ার কথা ভাবেন; বইয়ের ভাষ্যে, নির্দিষ্ট দর্শন বা কর্মসূচির চেয়ে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের বিপরীতে একটি বড় মঞ্চ দাঁড় করানোই তখন তাঁর কাছে বেশি জরুরি ছিল। সব ডিম এক ঝুড়িতে না রেখে তিনি নানা ব্যক্তি ও মাধ্যম কাজে লাগান: ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নুরুল ইসলাম শিশু, যিনি তখন সেনাবাহিনীর প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার, তাঁর দপ্তরে রাতে শীর্ষ রাজনৈতিক নেতারা আসতেন, কখনো কখনো জিয়াও থাকতেন, আর মাঠপর্যায়ের অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন জিয়ার একান্ত সচিব কর্নেল অলি আহমদ, যিনি পরে ২০০৬ সালে দল ছেড়ে এলডিপি গড়েন। জোট নিয়ন্ত্রণে নিজের শতভাগ অনুগত একটি দল প্রয়োজন মনে করে ১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে নেপথ্যে থেকে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল বা জাগদল গঠনের ঘোষণা দেন জিয়া, তবে চেনা রাজনীতিকেরা খুব কমই এতে যোগ দেওয়ায় দলটি তেমন সাড়া ফেলতে পারেনি।

১৯৭৮ সালের ২৮ এপ্রিল জিয়া নিজেকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে পদোন্নতি দেন, একই দিনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষিত হয় এবং ১ মে তাঁকে চেয়ারম্যান করে জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট গঠনের ঘোষণা আসে; সেনাপ্রধান থাকা অবস্থাতেই তিনি পুরোদস্তুর রাজনীতিক হয়ে ওঠেন, জুনের নির্বাচনে ৭৬.৩৩ শতাংশ ভোট পেয়ে রাষ্ট্রপতি হন এবং যাদু মিয়াকে মন্ত্রিসভায় সিনিয়র মিনিস্টার করা হয়। একসময় রাজনীতি কঠিন করে দেওয়ার কথা বলা জিয়াকে মাঠের রাজনীতির জন্য তৈরি করার প্রসঙ্গে মহিউদ্দিন আহমদ বইয়ে মোখলেসুর রহমানের (সিধু ভাই, যাদু মিয়ার ভাই) একটি সাক্ষাৎকার তুলে ধরেছেন, যেখানে মোখলেসুর রহমান দাবি করেন, শুরুতে জিয়া বাংলা বক্তৃতা উর্দুতে লিখে নিয়ে পড়তেন এবং ভালো বক্তৃতা দিতে পারতেন না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, জিয়া একটানা ২০ থেকে ৩০ মাইল হাঁটতে পারেন জেনে তিনি যাদু মিয়াকে পরামর্শ দেন জিয়াকে নিয়ে গ্রামে গ্রামে হেঁটে মানুষের খোঁজখবর নিতে; যেখানে কখনো ইউনিয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যানও যাননি, সেখানে খোদ প্রেসিডেন্টকে পেয়ে গ্রামের মানুষ ভাবতে শুরু করেন জিয়া তাঁদের খোঁজ রাখেন, আর এর মধ্যেই জিয়া বক্তৃতা দেওয়াও রপ্ত করে ফেলেন।

জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টের দলগুলোর ঐক্যের একমাত্র ভিত্তি ছিল আওয়ামী লীগবিরোধিতা; নানা মতের এই জোটে স্বস্তি না পেয়ে জিয়া একমনা লোকজন নিয়ে আলাদা দল গড়ার সিদ্ধান্ত নেন, তানভীর আহমেদ সিদ্দিকীর প্রস্তাবিত জাস্টিস পার্টি নামটি পানসে মনে হওয়ায় বাদ পড়ে এবং জিয়া নিজেই নাম ঠিক করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। জাগদল বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয় ১৯৭৮ সালের ২৮ আগস্ট, আর ১ সেপ্টেম্বর ঢাকার রমনা রেস্তোরাঁ প্রাঙ্গণে সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির প্রধান হিসেবে জিয়া দলের নাম, গঠনতন্ত্র ও কর্মসূচি ঘোষণা করেন; গঠনতন্ত্র তৈরির কাজে সরাসরি যুক্ত নয়জনের মধ্যে জিয়া ছাড়াও ছিলেন মওদুদ আহমদ, বিচারপতি সাত্তার, ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও নাজমুল হুদা। মহিউদ্দিন আহমদের পর্যবেক্ষণ, এ অঞ্চলের অন্য দলগুলো জন্ম নিয়েছে রাজপথে, আলোচনার টেবিলে কিংবা ক্ষমতার বৃত্তের বাইরে, কিন্তু বিএনপি গড়ে উঠেছিল ক্ষমতার শীর্ষে থাকা এমন একজন অরাজনৈতিক ব্যক্তির হাতে, যিনি নিজেই রাজনীতিতে নামার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।