এলডিপি (লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদের প্রায় পাঁচ দশকের রাজনৈতিক জীবন বারবার মোড় নিয়েছে জোট আর সমীকরণ বদলের মধ্য দিয়ে। জিয়াউর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে যাত্রা শুরু করে তিনি বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য, দীর্ঘদিন স্থায়ী কমিটির সদস্য ও মন্ত্রী ছিলেন; ২০০৬ সালে দল ছেড়ে নতুন দল গড়ার পর কখনো বিএনপির সঙ্গে জোটে, কখনো আলাদা পথে হেঁটেছেন। বিএনপির সঙ্গে টানাপোড়েনের পর তিনি এখন জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যে, আর ২০২৬ সালের আগস্টের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে এই জোটই তাকে প্রার্থী করে বিএনপির প্রার্থীর বিপরীতে দাঁড় করায়, যে বিএনপির রাজনীতি দিয়েই তার উত্থান।
রাজনীতিতে আসার আগে সেনা কর্মকর্তা অলি আহমদ ১৯৭১ সালে ছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে; সেখান থেকে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়ে জিয়াউর রহমানের জেড ফোর্সের অধীনে লড়াই করেন এবং বীরত্বের স্বীকৃতিতে বীরবিক্রম খেতাব পান। জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রপতি থাকাকালে অলি ছিলেন তার একান্ত সচিব, ১৯৭৭-৭৮ সালে নতুন দল গঠনের প্রস্তুতিকালে বিভিন্ন নেতা ও সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগে বড় ভূমিকা রাখেন, আর ১৯৭৮ সালে বিএনপি গঠিত হওয়ার পর জিয়ার আহ্বানে, চাকরির ৯ বছর বাকি থাকতেই, ১৯৮০ সালে সেনাবাহিনী ছেড়ে দলে যোগ দিয়ে সে বছর উপনির্বাচনে জিতে প্রথমবার সংসদে যান। দ্রুত দলের প্রথম সারির নেতা হয়ে ওঠা অলি ১৯৮৪ সালে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটিতে জায়গা পান, ১৯৯১ সালে ধানের শীষ নিয়ে জিতে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন প্রথম বিএনপি সরকারে যোগাযোগমন্ত্রী হন এবং ১৯৯৬ সালে অনুষ্ঠিত দুটি নির্বাচনেই বিএনপির টিকিটে জয়ী হন।
বিএনপির সঙ্গে প্রথম দূরত্ব তৈরি হয় ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে চারদলীয় জোট গঠন নিয়ে; সংসদ সদস্য হলেও খালেদা জিয়ার চারদলীয় জোট সরকারের মন্ত্রিসভায় তার জায়গা হয়নি, অথচ মন্ত্রী হন জামায়াতের তখনকার দুই শীর্ষ নেতা। দলের নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়ে তার অসন্তোষ ক্রমে প্রকাশ্যে আসে; জোটে জামায়াতের ভূমিকা নিয়েও তার আপত্তি ছিল বলে তখন রাজনৈতিক মহলে আলোচনা ছিল, আর তার সমর্থকদের ধারণা ছিল, জামায়াতের বিরোধিতার কারণেই তিনি মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পাননি। শেষ পর্যন্ত ২০০৬ সালের অক্টোবরে স্থায়ী কমিটিসহ বিএনপির সব পদ ছাড়েন তিনি, সঙ্গে দল ছাড়েন আরও কয়েকজন নেতা; ২৬ অক্টোবর সাবেক রাষ্ট্রপতি একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বিকল্পধারার সঙ্গে সমঝোতায় গঠিত হয় এলডিপি, যার সভাপতি হন প্রয়াত বদরুদ্দোজা চৌধুরী, মহাসচিব প্রয়াত মেজর (অব.) এম এ মান্নান এবং নির্বাহী সভাপতি অলি আহমদ।
বিএনপির ৩২ জন সাবেক মন্ত্রী ও এমপি তখন নতুন দলটিতে যোগ দেওয়ায় রাজনীতিতে বেশ আলোচনা তৈরি হয়, তবে মতভেদের জেরে ২০০৭ সালেই এলডিপি ও বিকল্পধারার পথ ভাগ হয়ে যায়; ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে এলডিপির ছাতা প্রতীকে একা লড়ে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে পরাজিত করে সংসদে যান অলি আহমদ। প্রায় ছয় বছর পর বিএনপির নেতৃত্বে ২০১২ সালে ২০ দলীয় জোট গঠিত হলে এলডিপি তাতে শরিক হয়, ২০১৪ সালের নির্বাচনও করে বিএনপির সঙ্গে থেকে; ২০১৮ সালে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে সক্রিয় অলি সে বছরের একাদশ সংসদ নির্বাচনে ছাতা প্রতীক নিয়ে জোটের প্রার্থী হয়ে প্রথমবারের মতো হারেন, তখন তিনি জোটের মুখপাত্রও ছিলেন। নির্বাচনের পর দূরত্ব আবার বাড়ে: বিএনপির নির্বাচিত এমপিরা যেন শপথ না নেন, ২০১৯ সালে সেই অবস্থান নিয়েছিলেন তিনি, দলটির সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্তেরও সমালোচনা করেন; ২০২২ সালের ডিসেম্বরে বিএনপি ২০ দলীয় জোট ভেঙে দিলে এলডিপি বিএনপির নেতৃত্বাধীন যুগপৎ আন্দোলনে যুক্ত হয়।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন মেরূকরণে বিএনপির সঙ্গে এলডিপির দূরত্ব আবার বাড়ে; সংসদ নির্বাচনে বিএনপির কাছে ১৪টি আসন চেয়ে না পেয়ে ২০২৫ সালের ২৪ ডিসেম্বর, ভোটের দেড় মাস আগে, একা নির্বাচন করার ঘোষণা দেন অলি আহমদ, আর চার দিনের মাথায়, ২৮ ডিসেম্বর, যোগ দেন জামায়াত জোটে। একসময় বিএনপির জোটে জামায়াতের প্রভাব নিয়ে যার আপত্তি ছিল, প্রায় দুই দশক পর সেই তিনিই জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে যাওয়ায় বিষয়টি রাজনৈতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রে আসে; অনেকে একে তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারের আরেকটি বড় অবস্থান বদল হিসেবে দেখছেন। ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জোট থেকে সাতটি আসন ছাড় পেলেও এলডিপির কোনো প্রার্থী জেতেননি; অলি আহমদের নিজের আসন চট্টগ্রাম-১৪-তে বিএনপির জসিম উদ্দিন আহমেদের কাছে পরাজিত হন তার ছেলে অধ্যাপক ওমর ফারুক।
রাষ্ট্রপতি পদে তাকে প্রার্থী করার পেছনে কয়েকটি কারণের কথা বলছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো। তাদের ভাষ্য, মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা নিয়ে সংসদে ও বাইরে বারবার প্রশ্নের মুখে পড়া জামায়াত রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা অলি আহমদকে সামনে রেখে সমালোচকদের জবাব দেওয়ার চেষ্টা করছে, কারণ অতীতে দলটিতে কোনো মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না; তা ছাড়া জোটের শুরুর দিকেই এলডিপি দাবি তুলেছিল, ক্ষমতায় গেলে কর্নেল অলিকে রাষ্ট্রপতি বানাতে হবে, আর তাতে জামায়াতসহ সব দলই সায় দিয়েছিল। অন্যদিকে এলডিপির দাবি, বিএনপি জোট ছাড়ার দায় বিএনপির শীর্ষ নেতাদের: লন্ডনে থাকাকালে বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রতি মাসে অলি আহমদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন, হোয়াটসঅ্যাপে ভয়েস বার্তার জবাব দিতেন এবং আর ভোটে না দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তও অলি তাকে আগেই জানিয়েছিলেন, কিন্তু তপশিল ঘোষণার পর প্রায় দুই মাস তারেক রহমান, মির্জা ফখরুল (তখন মহাসচিব) এবং স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ কেউই তার সঙ্গে যোগাযোগ করেননি, ফোন করলেও ধরেননি।
দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মো. বিল্লাল হোসেন মিয়াজি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, বিএনপি জোটে কর্নেল অলিকে প্রাপ্য মর্যাদা না দেওয়ায় তারা অন্য জোটে গেছেন, কোনো লোভ-লালসা থেকে নয়, আর যোগাযোগ রাখা হলে তিনি হয়তো কোথাও যেতেন না। মিয়াজির ভাষ্য, অলি আহমদ ২০০৬ সালে জামায়াতের কারণে নয়, দুর্নীতির কারণে বিএনপি ছেড়েছিলেন; ২০১২ সালে জোটে ফিরে প্রতিটি আন্দোলনে ভূমিকা রেখেছেন, ২০১৩-১৪ সালে কারাগারে ছিলেন, মুক্তির পর খালেদা জিয়া ও জিয়াউর রহমানকে নিয়ে বই লিখেছেন, আর খালেদা জিয়া কারাবন্দি হলে এলডিপির নেতাকর্মীরাও আন্দোলনে নেমেছিলেন। সাম্প্রতিক প্রসঙ্গে অসুস্থতার কথা জানিয়ে কথা বলতে রাজি হননি অলি আহমদ; তবে গত জুনে সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের রাজনীতি হলো খাওয়া-পাওয়ার রাজনীতি’, আদর্শভিত্তিক রাজনীতি করে কেবল ইসলামী দলগুলো, দল আগের চেয়ে শক্তিশালী হলেও তার সঙ্গে থাকা সাবেক রাষ্ট্রপতি, মন্ত্রী ও এমপি মিলিয়ে ৩২ জনের প্রায় ২৭ জন মারা যাওয়ায় সেই শূন্যতা পূরণ হয়নি, কারণ এখন দলে যোগ দেওয়ার আগেই মনোনয়নের শর্ত আসে।






