ঢাকাসহ দেশের নানা এলাকায় দখল ও চাঁদাবাজি থামাতে না পারাকে সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের জন্য অশনিসংকেত বলে মন্তব্য করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) দেওয়া এক বিবৃতিতে সংস্থাটি এসব ঘটনায় জড়িতদের কঠোর জবাবদিহির আওতায় আনা এবং দেশজুড়ে দলীয় আত্মশুদ্ধি অভিযান চালানোর আহ্বান জানিয়েছে।
বিবৃতিতে বিশেষভাবে তিনটি ঘটনার উল্লেখ করা হয়: মধ্যরাতে পুলিশের সামনে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের লুটপাট, ভাঙচুর ও দখল; কিশোরগঞ্জে জলমহাল দখল নিয়ে স্থানীয় বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষে অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হওয়া এবং এক কনটেন্ট ক্রিয়েটরের কার্যালয় ভাঙচুর। এসব ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ জানিয়ে টিআইবি বলেছে, এগুলো বিচ্ছিন্ন কিছু নয়।
সংস্থাটির ভাষ্য, নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী রাড্ডা এমসিএইচে লুটপাট-ভাঙচুর হয়েছে জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত আসনের এক সদস্যের পৃষ্ঠপোষকতায়, যা ক্ষমতাসীন দল ও সরকারের জন্য বিব্রতকর। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান প্রশ্ন তোলেন, অর্ধশতাব্দী ধরে দরিদ্র ও অসহায় মা-শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসা একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান পুলিশের উপস্থিতিতে শত শত মানুষের সামনে ধ্বংস করে ক্ষমতাসীন দল কোন দৃষ্টান্ত তৈরি করছে।
রক্তক্ষয়ী জুলাই অভ্যুত্থানে কর্তৃত্বপরায়ণ চোরতন্ত্রের পতনের পর ঐতিহাসিক নির্বাচনে জনরায় পেয়ে ক্ষমতায় আসা দলের নেতাকর্মীদের এমন আচরণ দেশবাসীকে কী বার্তা দিচ্ছে, সে প্রশ্নও রাখেন ইফতেখারুজ্জামান; তার ভাষায়, আগের কর্তৃত্ববাদী সরকারের স্বেচ্ছাচারের স্মৃতি মানুষের মনে এখনো তাজা। এ অবস্থায় বিএনপির নীতিনির্ধারকেরা নেতাকর্মীদের বড় একটি অংশের দখল-চাঁদাবাজির পরিণতি নিয়ে ভাবছেন কি না, তা-ও জানতে চান তিনি।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকেই নিজেদের বিজয়ী দাবি করে বিএনপির একাংশের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে দখল, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। তার দাবি, আওয়ামী সরকার পতনের পরপরই ঢাকার গাবতলী, মহাখালী ও সায়দাবাদসহ চট্টগ্রাম, সিলেট ও খুলনার বড় বাস টার্মিনাল, ফুটপাত, হাটবাজার, বালুমহাল, জলমহাল, ক্যাবল-ইন্টারনেট ও বর্জ্য সংগ্রহের ব্যবসায় দখল-চাঁদাবাজির হাতবদলকে দলটির একাংশ উৎসবে পরিণত করেছে, যা ঘিরে নিজেদের মধ্যে সহিংস প্রতিযোগিতাও দেখা দিচ্ছে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক আরও বলেন, চাঁদাবাজি দুর্নীতি নয় বরং সমঝোতার লেনদেন, সরকারের এক মন্ত্রী একাধিকবার এমন ঘোষণা দিলেও সরকার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি; ফলে দখল ও চাঁদাবাজি আরও স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। কিশোরগঞ্জের সংঘর্ষ ও ক্রিয়েটিভ স্টুডিও ভাঙচুরকে তিনি ২০২৪ সালের আগস্ট-পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের ধারাবাহিকতা বলে উল্লেখ করেন, যা তার মতে সরকারের ভালো উদ্যোগ ও সদিচ্ছাকে ম্লান করে দিচ্ছে।
ইফতেখারুজ্জামানের অভিযোগ, কোথাও কোথাও বহিষ্কারসহ সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও কঠোর প্রতিরোধমূলক কৌশলের অভাব এবং জড়িতদের সরকারি দলের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারছে না, বরং বিচারহীনতার সংস্কৃতি ফিরে আসছে। দুর্নীতিবিরোধী নির্বাচনী অঙ্গীকার মেনে ক্ষমতাসীন দল এখনই আত্মশুদ্ধির পদক্ষেপ না নিলে পরে চাইলেও নিয়ন্ত্রণ ফেরানো যাবে না বলে সতর্ক করে তিনি বলেন, ‘শক্ত হাতে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীকে দমন করতে না পারলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।’ প্রতিটি ঘটনার যথাযথ তদন্ত করে জড়িতদের দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছে টিআইবি।






