সাত মাস আগে দায়িত্ব নেওয়া বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দলের একাংশ নেতাকর্মীর বেপরোয়া আচরণ এবং চাঁদাবাজি ও দখলের অভিযোগে বিব্রত অবস্থায় পড়েছে; প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান এসব অভিযোগে কঠোর অবস্থান নিলেও লাগাম টানা যাচ্ছে না, পাশাপাশি একটি সুযোগসন্ধানী মহল পরিস্থিতি আরও উসকে দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন, এমন ঘোষণা আসার পর তাঁর দলের নেতাকর্মীরা রাস্তায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ আছে, আর আইনশৃঙ্খলার অবনতি নিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে ভাবমূর্তি রক্ষায় হার্ডলাইনে গেছে সরকার, নেতাকর্মীদের শৃঙ্খলায় বাঁধতে কড়া হয়েছে বিএনপিও। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, অপরাধ যেখানেই ঘটুক, তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে তৃণমূল পর্যন্ত কেউই ছাড় পাবেন না।
এর সবচেয়ে বড় নজির দেখা গেছে বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর): রাজধানীর মিরপুরে গত ২৫ সেপ্টেম্বর রাড্ডা মা ও শিশুকেন্দ্রে (রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার) হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের পর স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি গুঁড়িয়ে জায়গা দখলের ঘটনায় নাম আসা সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি ফেরদৌসী আহমেদ (মিষ্টি) প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ওই দিন দুপুরে স্পিকারের কাছে জমা দেন পদত্যাগপত্র। বিএনপির নীতিনির্ধারণী সূত্র জানায়, বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) মিষ্টিসহ কয়েকজনকে নিয়ে বৈঠকে তারেক রহমান তাঁকে পদত্যাগ করতে বলেন এবং দ্রুত সরে না দাঁড়ালে আরও কঠোর ব্যবস্থার কথা সেই রাতেই জানিয়ে দেন; তার আগে দুদিন ধরে প্রধানমন্ত্রী খোঁজ নেন হামলায় কারা ছিলেন, তাঁদের রাজনৈতিক পরিচয় কী এবং নেপথ্যে কারা, যাতে মিষ্টির ঘনিষ্ঠ মোহাম্মদ হানিফ মিয়া (ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক সদস্য) এবং মোস্তফা জগলুল পাশা, যিনি ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সাবেক সদস্য সচিব, তাঁদের সম্পৃক্ততার তথ্য উঠে আসে। সূত্রটির ভাষ্য, দলের চেয়ে ব্যক্তি বড় নয়—এ বার্তা তৃণমূলে পৌঁছে দিতেই এমন সিদ্ধান্ত; পাহাড়ের আন্দোলন ঘিরে এর আগে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশেই সরে দাঁড়িয়েছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক দীপেন দেওয়ান।
রাড্ডার ঘটনায় স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততাও মেলে; বিএনপি চেয়ারম্যানের নির্দেশে বুধবার রাতে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ঢাকা মহানগর উত্তরের ৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটিসহ সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলো ভেঙে দেওয়া হয় এবং দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে খলিল চৌধুরী (ঢাকা মহানগর উত্তরের শাহ আলী থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক) ছাড়াও বিএনপি, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের নেতা আনোয়ার হোসেন, নূর আলম, আকবর হোসেন, সাজ্জাদুর রহমান মিশু, কবির হোসেন, মো. সোহেল, হাফিজুর রহমান শুভ্র, ইকবাল দিপু, মো. আক্তার হোসেন মামুন, ওমর নাঈম, মো. হাফিজুর রহমান, শান্ত রহমান, সারোয়ার আলম পিয়াস ও মো. রফিকুল ইসলাম—এই নেতাদের সব দলীয় পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে শাহ আলী থানার ওসি জাহাঙ্গীর আলমকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, তদন্ত চলছে এবং এ পর্যন্ত ১০ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির বিদায়ী কমিটিতে যুগ্ম আহ্বায়ক থাকা এবিএম রাজ্জাক বলেন, কমিটি হঠাৎ ভাঙা হলেও এর মেয়াদ ফুরিয়ে গিয়েছিল; এটি দলের সিদ্ধান্ত, হয়তো হাইকমান্ড নেতাকর্মীদের জন্য আরও ভালো কিছু ভাবছে।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীসহ সারা দেশে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও জবরদখলচেষ্টার একাধিক ঘটনায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের নাম আসায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ নানা মহলে সমালোচনার ঝড় উঠেছে; কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের ইসিবি চত্বরের স্টুডিওতে ভাঙচুরের ঘটনায় মূল পরিকল্পনাকারী শাহরিয়ার ও মেজর (অব.) মুহিউদ্দিন চৌধুরীসহ ৬ জনকে আটক করা হয়েছে, আর ২৫ সেপ্টেম্বর আদাবরের শ্যামলী হাউজিংয়ে একটি আটতলা ভবনে চাপাতি নিয়ে হামলার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর ২৯ সেপ্টেম্বর গুলিবিদ্ধ দুজনসহ ১০ জন গ্রেপ্তার হন; এর আগে ১৩ এপ্রিল যুবদল নেতা মঈন উদ্দিন শ্যামলীর সিকেডি ইউরোলজি হাসপাতালের চিকিৎসক কামরুল ইসলামের কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা চেয়েছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে, দলের শীর্ষ দুই নেতা ওই চিকিৎসকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ব্যবস্থার আশ্বাস দেওয়ার পর মঈন উদ্দিনসহ সাতজনকে আটক করা হয়। কুমিল্লার দেবিদ্বারে ২৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় শ্রীপুর গ্রামের একটি মুরগির খামারে উপজেলা প্রশাসনের অভিযানে উপজেলা যুবদলের সহসভাপতি আব্দুল হাই কায়সার ও আরও দুজনকে মাদক সেবনের অভিযোগে ধরার পর ভ্রাম্যমাণ আদালতে প্রত্যেকের সাত দিনের কারাদণ্ড এবং ২০ হাজার টাকা করে জরিমানা হয়, পরদিনই কায়সারকে প্রাথমিক সদস্যপদসহ বহিষ্কার করে যুবদল, বিজ্ঞপ্তিতে সই করেন মিনহাজুল ইসলাম ভূঁইয়া, যিনি যুবদলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং দপ্তরের দায়িত্বে আছেন; তাতে বলা হয়, বহিষ্কৃত ব্যক্তির কোনো অপকর্মের দায় সংগঠন নেবে না; মানিকগঞ্জে উলাইল ইউনিয়নের দশচিড়া গ্রামে একটি পাকা সড়ক থেকে বৃহস্পতিবার রাত দেড়টার দিকে ইয়াবাসহ ধরা পড়েন শিবালয় উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক নাজমুল ইসলাম। এদিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষিকার ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যার পর সরকারের নির্দেশে জোরদার হওয়া কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানে গত সাত দিনে কুমিল্লায় এক হাজার ৬৭২ জনকে ধরা হয়েছে, আর চট্টগ্রামে এক দিনে ৪৪৫ জন, নোয়াখালীতে ১৬৩ জন, লক্ষ্মীপুরে ১৮৪ জন ও ফেনীতে ১০৬ জন আটক হয়েছেন।
দলীয় সূত্র জানায়, চাঁদাবাজি, দখল বা ভাঙচুরের মতো যেকোনো অভিযোগ যাচাই করে পদ-প্রভাব বিবেচনা না করেই বহিষ্কারসহ ব্যবস্থা নেবে বিএনপি, গুরুতর অপরাধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে আইনি পদক্ষেপ নেবে সরকার এবং দলের ভেতরে শুদ্ধি অভিযানও চলবে; নীতিনির্ধারকদের ভাষ্য, দলের নাম ভাঙিয়ে কেউ চাঁদা চাইলে বা দখল করতে এলে মানুষকে পুলিশের সাহায্য নিতে ও মামলা করতে বলা হবে, আর দ্রুত তদন্ত করে অপরাধীদের ধরতে নির্দেশ পাবে পুলিশ। বৃহস্পতিবার ফেনীর এক সমাবেশে তারেক রহমান বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জনগণ স্বৈরাচারকে বিদায় করেছে, চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি দেশ চালানোর দায়িত্ব দিয়েছে বিএনপিকে, তাই বিগত ১৭ বছরে ভূলুণ্ঠিত আইনের শাসন ধাপে ধাপে ফিরিয়ে এনে আইন যেন সবার জন্য সমান হয়, তা সর্বশক্তি দিয়ে নিশ্চিত করবে দলটি। একই দিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদক দমনে পুলিশ, বিজিবি, এসআরবি ও আনসারের নিয়মিত সমন্বিত অভিযান আরও জোরদার হবে, দায়িত্বে অবহেলা বা অপরাধে জড়ানোর প্রমাণ মিললে প্রত্যাহারের পাশাপাশি বিভাগীয় ব্যবস্থা ও ফৌজদারি মামলা হচ্ছে; তাঁর ভাষায়, ‘ডিসেম্বর আমাদের বিজয়ের মাস’, তাই এ মাসে কোনো অপশক্তি দেশে অস্থিরতা ছড়াতে পারবে না।
সূত্র আরও জানায়, এসব ঘটনায় দলের কয়েকজন এমপি ও প্রভাবশালী নেতার ইন্ধনের বিষয়টি কেউ কেউ বিএনপি চেয়ারম্যানের নজরে এনেছেন; তাঁদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ জমা পড়ায় এমপি পদ ও দলীয় পদ এখন ঝুঁকিতে, একজন প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে এবং দলের নাম ভাঙিয়ে দখল-চাঁদাবাজিতে জড়িতদের তালিকা তৈরির জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও কেন্দ্রীয় দপ্তরকে নির্দেশ দিয়েছেন তারেক রহমান। সূত্রের দাবি, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাসনামলে চাঁদাবাজি ও গুন্ডামির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া কয়েকজন প্রভাবশালী যুবদল ও ছাত্রদল নেতাকে বঙ্গভবনে ডেকে তিনি কারাগারে যাওয়া অথবা দেশ ছাড়ার কথা বলেছিলেন, এবার বাবার সেই পথেই হাঁটছেন তারেক রহমান। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, মিষ্টির বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হলে চার্জশিট দিয়ে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে, দলীয় ব্যবস্থাও থাকবে; দপ্তর সূত্রের হিসাবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর এ পর্যন্ত ৪ হাজারের বেশি নেতাকর্মী বহিষ্কৃত হয়েছেন, কারণ দর্শানোর নোটিশও পেয়েছেন অনেকে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমান সংবাদমাধ্যমকে বলেন, দলের সবাই নন, কেউ কেউ বিশৃঙ্খলা করছেন; প্রথমে সাংগঠনিক ব্যবস্থা, এরপর তদন্ত এবং অভিযোগ প্রমাণ হলে আইনি ব্যবস্থা—এ ধারায় এগোনো হচ্ছে, কাউকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, শুধু নেতাকর্মী নয়, প্রশাসন, রাজনৈতিক দল ও জনগণকেও বিএনপি বোঝাতে চায় যে দলীয় পরিচয় বা প্রভাব নয়, সবাইকেই আইনের মুখোমুখি হতে হবে; প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের স্কুলশিক্ষক গোলাম কিবরিয়া লালনকে সসম্মানে ছেড়ে দিয়ে পুলিশ বাসায় পৌঁছে দিয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ক্ষমতাধর হলেও কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নন—এ বার্তাই দিচ্ছে সরকার। তবে তৃণমূলের একাংশের অভিযোগ, ক্ষমতায় আসার পর কিছু এমপি ও নেতা দলকে নিজের সম্পত্তি ভাবছেন, একজনের হাতে তিন-চারটি পদ থাকলেও সৎ ও যোগ্যরা বঞ্চিত, আর হাইব্রিড বা নব্য বিএনপির দাপটে দুর্দিনের কর্মীরা পেছনে পড়ছেন—বিএনপির এক নেতার ভাষায়, মৌসুমি পাখিরা দলে ঢুকে বিশৃঙ্খলা করছে; তাই শুধু মিষ্টি নয়, রাড্ডার ঘটনায় জড়িত অন্যদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা এবং দলে শুদ্ধি অভিযানের দাবি তুলেছেন তাঁরা।






