গবেষণার ফল যেন গবেষণাগার বা প্রকাশনায় আটকে না থেকে শিল্প, বাজার ও জনসেবায় কাজে লাগে, সে লক্ষ্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ১০টি কৌশলগত প্রকল্প ও কর্মসূচির একটি ধারণাপত্র প্রস্তুত করেছে। সম্প্রতি মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠকে এটি উপস্থাপন করা হয়; দক্ষ জনবল তৈরি, আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা অবকাঠামো গড়া এবং বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি শিল্পের মধ্যে কার্যকর যোগসূত্র স্থাপনও এর উদ্দেশ্য। সংসদ সচিবালয়ের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, কমিটি স্কুল ও কলেজে জাঁকজমকপূর্ণ বিজ্ঞান মেলা আয়োজন এবং নতুন উদ্ভাবন রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করেছে।

প্রস্তাবিত উদ্যোগগুলোর মধ্যে আছে এসটিইএম শিক্ষা ও মেধা বিকাশ, গবেষণা থেকে বাজার এবং উদ্ভাবন থেকে বাজার নামের তিনটি কর্মসূচি; সেই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ফ্রন্টিয়ার প্রযুক্তি ইনস্টিটিউট, বায়োটেকনোলজি-জিনোমিক্স-প্রিসিশন মেডিসিন পার্ক এবং পারমাণবিক চিকিৎসা, ক্যানসার গবেষণা ও থেরানোস্টিক্স নেটওয়ার্ক স্থাপনের প্রকল্প। স্মার্ট কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা, ভূ-বিজ্ঞান ও ভূমিকম্প গবেষণা, সবুজ শিল্প ও পরিচ্ছন্ন উৎপাদন এবং নীল অর্থনীতি ও সমুদ্র গবেষণা নিয়েও আলাদা কর্মসূচি রাখা হয়েছে। ২০২৭ সাল থেকে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের লক্ষ্য ধরা হলেও সম্ভাব্য ব্যয়, অর্থের উৎস ও চূড়ান্ত কাঠামো এখনো ঠিক হয়নি।

এসটিইএম শিক্ষা প্রকল্পে ৬৪টি জেলা বিজ্ঞান ক্লাব ও আটটি উদ্ভাবনকেন্দ্র গড়া, ৫০ হাজার শিক্ষক ও দুই লাখ শিক্ষার্থীকে প্রশিক্ষণ এবং ১০ হাজার শিক্ষাবৃত্তি ও এক হাজার গবেষণা ফেলোশিপ দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে; আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণ, শুরুর স্তর থেকে মেধা শনাক্ত করা এবং বিজ্ঞানে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোও গুরুত্ব পেয়েছে। গবেষণা থেকে বাজার কর্মসূচিতে ১৫টি প্রযুক্তি হস্তান্তর কার্যালয়, ২০০টি প্রোটোটাইপ, ৫০০ পেটেন্ট আবেদনে সহায়তা ও ১০০টি প্রযুক্তি লাইসেন্সিং চুক্তির লক্ষ্য ধরা হয়েছে। আর উদ্ভাবন থেকে বাজার কর্মসূচির আওতায় উদ্যোক্তা তৈরি, শুরুর মূলধন, প্রশিক্ষণ, ইনকিউবেশন ও বিনিয়োগকারীর সঙ্গে সংযোগের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবনকে পণ্য ও সেবা হিসেবে বাজারে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ইনস্টিটিউটে উচ্চক্ষমতার কম্পিউটিং অবকাঠামোর পাশাপাশি এআই নিরাপত্তা ও নৈতিকতা, রোবোটিকস, সেমিকন্ডাক্টর নকশা, বাংলা ভাষার এআই মডেল ও তথ্যভান্ডার নিয়ে গবেষণার পরিকল্পনা আছে; সেমিকন্ডাক্টরে দেশীয় সক্ষমতা, বিশ্ববিদ্যালয়ে মাইক্রো ইলেকট্রনিকস শিক্ষা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সঙ্গে তাল মেলাতে এসব খাতে দক্ষ জনবল ও অবকাঠামো জরুরি বলে ধারণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। জীবপ্রযুক্তি পার্কটি হবে সাভারে, যেখানে জিনোম নিয়ে গবেষণা ও জাতীয় জিনোম তথ্যভান্ডারের পাশাপাশি ব্যক্তিভিত্তিক চিকিৎসা, টিকা ও জৈব ওষুধ উদ্ভাবন এবং পরীক্ষামূলক উৎপাদনের সুবিধা রাখার প্রস্তাব রয়েছে।

স্মার্ট কৃষি কর্মসূচিতে ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, দূর অনুধাবন, ন্যানো ও জীবপ্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে আটটি আঞ্চলিক কৃষিপ্রযুক্তি কেন্দ্র, পাঁচ লাখ কৃষকের হাতে স্মার্ট প্রযুক্তি তুলে দেওয়া এবং ১০০টি কৃষিভিত্তিক নতুন উদ্যোগকে সহায়তার প্রস্তাব রয়েছে; পানি ও সারের সাশ্রয়ী ব্যবহার, খাদ্য নিরাপদ কি না তা যাচাই এবং জলবায়ু-সহনশীল ফসল উদ্ভাবনও এর অংশ। পারমাণবিক চিকিৎসা নেটওয়ার্কে থাকবে একটি জাতীয় থেরানোস্টিকস কেন্দ্র, রেডিওফার্মাসিউটিক্যাল উৎপাদনের অবকাঠামো ও বাড়তি আঞ্চলিক সাইক্লোট্রন সুবিধা। পিইটি-সিটিসহ আধুনিক ইমেজিংয়ের মাধ্যমে রোগ নির্ণয়, লক্ষ্যভিত্তিক চিকিৎসা ও গবেষণার সক্ষমতা বাড়ানোই এর উদ্দেশ্য।

সবুজ শিল্প কর্মসূচিতে পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন, উন্নত উপকরণ, শিল্পবর্জ্য পুনর্ব্যবহার ও কার্বন নিঃসরণ পরিমাপের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি ১০০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সবুজ প্রযুক্তি স্থানান্তর ও ৫০টি পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তির উদ্যোগে সহায়তার লক্ষ্য রয়েছে, যাতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে রপ্তানি শিল্প প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে। বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক নীল অর্থনীতি কর্মসূচিতে গভীর সমুদ্র জরিপ, সামুদ্রিক জীবপ্রযুক্তি ও খনিজ, সমুদ্র পর্যবেক্ষণ ও সমুদ্রভিত্তিক জ্বালানি নিয়ে কাজের পাশাপাশি বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটকে কেন্দ্র করে ১০০টি গবেষণা প্রকল্প ও ৫০টি নতুন উদ্যোগে সহায়তার লক্ষ্য ধরা হয়েছে। দক্ষ জনবলের ঘাটতি, যন্ত্রপাতির উচ্চ ব্যয়, বাণিজ্যিকীকরণে দুর্বলতা, শিল্পের সীমিত অংশগ্রহণ ও আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের অভাবকে ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করে প্রশিক্ষণ, যৌথ অর্থায়ন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

শিল্পের সঙ্গে গবেষণার যোগাযোগ বাড়াতে ২০২৬ সালের ২৫-২৬ জুলাই ঢাকায় হওয়া জাতীয় সেমিকন্ডাক্টর সিম্পোজিয়াম ও বিয়ার সম্মেলনে ৩ হাজার ৮৮১ জন নিবন্ধন করেন এবং ১৫টির বেশি প্রতিষ্ঠানের ৩৮টি উদ্ভাবন বাছাই হয়, যার ১০টি যুক্তরাষ্ট্রের কনজিউমার ইলেকট্রনিকস শো ২০২৭-এর জন্য এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে; ১২-১৪ সেপ্টেম্বরের বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ারে জমা পড়ে ৬০০টির বেশি আবেদন। চলমান কাজের মধ্যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে কমিশনিং লাইসেন্সের একটি ধাপ শেষ হওয়া ও প্রথম দফার জ্বালানি লোডিংকে বড় অর্জন হিসেবে দেখানো হয়েছে; প্রাক্কলিত ১,৩৮,৬৮৫ কোটি ৭৭ লাখ টাকার এ প্রকল্পে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ভৌত ও আর্থিক অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে ৮৫ দশমিক ৪৮ শতাংশে। এ ছাড়া ১৮০ দিনের বিশেষ কর্মসূচিতে ২৩টি নিউক্লিয়ার মেডিসিন কেন্দ্রে ৪ লাখ ১ হাজার ১৬৯ জন রোগী সেবা পেয়েছেন, বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের উদ্ভাবিত পণ্য ১ হাজার ৫০টির বেশি ও পেটেন্ট ৩৭৫টি এবং ২২ জেলায় ৭ হাজার ৮০০টি বায়োগ্যাস প্লান্টের মাধ্যমে জৈব সার উৎপাদনের কাজ চলছে বলে বৈঠকে জানানো হয়।