প্রতিষ্ঠার পাঁচ বছর পূর্ণ করেছে গণঅধিকার পরিষদ। এ উপলক্ষে আজ সোমবার, ২৬ অক্টোবর সকালে রাজধানীর পল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন এবং কেক কাটার আয়োজন করে দলটি। আগামী ৩০ অক্টোবর ঢাকায় বড় শোভাযাত্রা করার পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে দলের সভাপতি ও প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর বলেন, ভবিষ্যতে দেশের যেকোনো সংকটে জাতিকে পথ দেখাবে গণঅধিকার পরিষদ। শোভাযাত্রার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন দলটির মুখপাত্র আবু হানিফ।
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দল গঠনের পটভূমি, বিভিন্ন আন্দোলনে অংশগ্রহণ এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম তুলে ধরা হয়েছে। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে রাষ্ট্র সংস্কারের দাবি, সরকারবিরোধী আন্দোলন ও জুলাই গণঅভ্যুত্থান পেরিয়ে নির্বাচনী রাজনীতি এবং সরকারে অংশগ্রহণের বিষয়গুলো সামনে এনেছে দলটি।
কোটা আন্দোলন থেকে দল গঠন
দলীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গণঅধিকার পরিষদের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ২০২১ সালের ২৬ অক্টোবর। এর ভিত্তি তৈরি করেন ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণেরা। গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, অধিকার ও জাতীয় স্বার্থকে চার মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করে দলটি।
প্রতিষ্ঠার সময় ২১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। দলের স্লোগান নির্ধারণ করা হয় ‘জনতার অধিকার, আমাদের অঙ্গীকার’।
দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গণঅধিকার পরিষদ গঠনের আগেই ছাত্র, যুব ও শ্রমিক অধিকার পরিষদের নেতাকর্মীরা জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন। নিরাপদ সড়কের দাবি, আবরার ফাহাদ হত্যার প্রতিবাদ, কৃষকদের ন্যায্য দাবি আদায় এবং দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির বিরুদ্ধে কর্মসূচিতে তাঁদের অংশগ্রহণ ছিল।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাংলাদেশ সফরের বিরোধিতা করেও তাঁরা আন্দোলন করেন বলে জানিয়েছে দলটি। গণঅধিকার পরিষদের দাবি, ওই আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে ছাত্র ও যুব অধিকার পরিষদের ৫৪ জন নেতাকর্মীকে কারাগারে যেতে হয়।
দলের বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে আবরার ফাহাদের মৃত্যুবার্ষিকীর কর্মসূচিতে ছাত্রলীগ হামলা করে। এরপর ছাত্র অধিকার পরিষদের ১৪ জন নেতাকর্মীকে আটক করা হয় বলে উল্লেখ করেছে দলটি।
জুলাই আন্দোলন ও নির্বাচনে অংশগ্রহণ
গণঅধিকার পরিষদের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে অভিযোগ করা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে দলটির নেতাকর্মীরা হামলা ও মামলার মুখে পড়েন। দলটি দাবি করেছে, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের প্রথম দিকে রাজনৈতিক দল হিসেবে কর্মসূচি ঘোষণা করে তারা সরাসরি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে যোগ দেয়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে গণঅধিকার পরিষদ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা সামনের সারিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন বলেও বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়। দলের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই আন্দোলনে তাদের অঙ্গসংগঠনের ১১ জন নেতাকর্মী নিহত এবং পাঁচ শতাধিক আহত হন। নিহত ব্যক্তিদের দলটি শহীদ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
দলটির বক্তব্য, ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন, রাষ্ট্র সংস্কারের দাবি এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান তাদের রাজনৈতিক যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এই ধারাবাহিকতাকেই বিশেষভাবে সামনে আনা হয়েছে।
মুখপাত্র আবু হানিফ জানান, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ট্রাক প্রতীক নিয়ে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন পায় গণঅধিকার পরিষদ। ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটি ৯৩টি আসনে প্রার্থী দেয়।
পটুয়াখালী-৩ আসনে নির্বাচিত হন দলের সভাপতি নুরুল হক নুর। বর্তমানে তিনি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে রয়েছেন।
গণঅধিকার পরিষদের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদ, বাংলাদেশ যুব অধিকার পরিষদ, বাংলাদেশ নারী অধিকার পরিষদ ও বাংলাদেশ প্রবাসী অধিকার পরিষদ। এ ছাড়া রয়েছে বাংলাদেশ শ্রমিক অধিকার পরিষদ, বাংলাদেশ পেশাজীবী অধিকার পরিষদ এবং বাংলাদেশ আইনজীবী অধিকার পরিষদ। এসব সংগঠনের মাধ্যমে সারা দেশে সাংগঠনিক কাজ চলছে বলে দাবি করেছে দলটি।
সংস্কার প্রস্তাব ও রাজনৈতিক অভিযোগ
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে নুরুল হক নুর বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে গণঅধিকার পরিষদ ও এর নেতাকর্মীদের ভূমিকা ছিল। তাঁর বক্তব্য, আন্দোলন, সংগ্রাম, ত্যাগ ও নির্যাতনের অভিজ্ঞতা পেরিয়ে দলটি আজকের অবস্থানে পৌঁছেছে।
প্রতিষ্ঠাকালে ঘোষিত ২১ দফার প্রসঙ্গ তুলে নুর জানান, শুরু থেকেই তাঁদের কর্মসূচিতে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠনের প্রস্তাব ছিল। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য এবং একই ব্যক্তির দুইবারের বেশি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ বন্ধ করার প্রস্তাবও তাঁরা দিয়েছিলেন।
জুলাই-পরবর্তী রাজনীতি নিয়ে নুর অভিযোগ করেন, গণঅধিকার পরিষদকে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে সেই চেষ্টা সফল হবে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।
কোনো দলের নাম উল্লেখ না করে নুর আরও অভিযোগ করেন, একটি দল জুলাইয়ের চেতনার কথা বললেও মুক্তিযোদ্ধার কবর খোঁড়ার কাজে বাধা দেওয়ার মতো কর্মকাণ্ড করছে। তাঁর অভিযোগ, নিজেদের স্বাধীনতাবিরোধী পরিচয়ের তকমা আড়াল করতেই তারা এসব করছে। কিছু গুপ্ত সংগঠন দেশের অগ্রগতি চায় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ভবিষ্যৎ পথচলা নিয়ে নেতাদের বক্তব্য
অনুষ্ঠানে গণঅধিকার পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হাসান আল মামুন বলেন, ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদের উদ্যোগ থেকেই ২০২১ সালে গণঅধিকার পরিষদ গড়ে ওঠে। তাঁর ভাষ্য, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন ও মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে দলটির দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।
ভবিষ্যতেও এই ধারায় কাজ চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় জানান মামুন। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দলের নেতাকর্মী, শুভাকাঙ্ক্ষী এবং দেশের মানুষকে শুভেচ্ছা জানান তিনি।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন দলের উচ্চতর পরিষদের সদস্য ও মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক শহিদুল ইসলাম ফাহিম। আরও বক্তব্য দেন সিনিয়র সহসভাপতি ফারুক হাসান, মুখপাত্র আবু হানিফ, মহানগর উত্তরের সভাপতি আব্দুর রহিম এবং মহানগর দক্ষিণের সাবেক সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সোহেল রানা।
বক্তাদের মধ্যে আরও ছিলেন বাংলাদেশ যুব অধিকার পরিষদের সভাপতি নাদিম হাসান, আইনজীবী অধিকার পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট সরকার নুরে এরশাদ সিদ্দিকী ও পেশাজীবী অধিকার পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট খালিদ হাসান। বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সানাউল্লাহ হকসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারাও বক্তব্য দেন।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আয়োজনে অংশ নেওয়া নেতাকর্মীদের বক্তব্যে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জও উঠে আসে। তাঁদের মতে, পাঁচ বছরে রাজপথের আন্দোলন থেকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং সরকারে যুক্ত হওয়ার পর্যায়ে এসেছে গণঅধিকার পরিষদ। এখন সাংগঠনিক ভিত্তি আরও বিস্তৃত করার পাশাপাশি নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান অটুট রাখাও দলটির জন্য চ্যালেঞ্জ।
Source: জাগো নিউজ২৪






