ঢাকার সড়কে উল্টো পথে গাড়ি চালানো, অনবরত হর্ন বাজানো, পথচারীকে বিপদে ফেলা কিংবা অন্য গাড়িকে ধাক্কা দেওয়ার দৃশ্য অনেকের কাছেই পরিচিত। সড়কের এই বিশৃঙ্খল অভিজ্ঞতাই একটি ভিন্ন ধরনের অনলাইন গেমে তুলে ধরা হয়েছে; গেমটির নাম ‘বাপের রাস্তা’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গেমটি ছড়িয়ে পড়ার পর বাংলাদেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে বলে জাগো নিউজের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গেমটিতে খেলোয়াড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকের ভূমিকায় নামতে হয়। ঢাকার পরিচিত পরিবেশে গাড়ি চালানো, নানা বাধার মুখোমুখি হওয়া এবং বিশৃঙ্খলার পরিণতি দেখার মধ্য দিয়ে খেলা এগিয়ে চলে। সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি কেবল বিনোদনের জন্য তৈরি নয়; দেশের সড়কে নিয়ম না মানার প্রবণতাকেও ব্যঙ্গাত্মকভাবে তুলে ধরেছে গেমটি।
কে তৈরি করেছেন গেমটি
‘বাপের রাস্তা’র নির্মাতা সফটওয়্যার প্রকৌশলী ওমর ফারুক রিয়াদ। তিনি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। বর্তমানে তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করছেন।
গেমটি তৈরির প্রেরণা এসেছে তাঁর দৈনন্দিন যাতায়াতের অভিজ্ঞতা থেকে। মহাখালীতে বাসা থেকে মিরপুরে অফিসে যাওয়ার পথে তিনি প্রায়ই অটোরিকশার উল্টো পথে চলা, অপ্রয়োজনে হর্ন বাজানো এবং পথচারীদের ঝুঁকিতে ফেলার মতো ঘটনা দেখতেন। এসব অভিজ্ঞতা থেকেই পরিচিত সমস্যাগুলো গেমের মাধ্যমে তুলে ধরার ভাবনা আসে তাঁর।
নির্মাতার বক্তব্য অনুযায়ী, অটোরিকশাচালকদের প্রতি ব্যক্তিগত বিরূপ মনোভাব থেকে গেমটি তৈরি করা হয়নি। বরং তাঁর উদ্দেশ্য সড়কে নিয়মকানুন মেনে চলা এবং অনিয়মের জবাবদিহির বিষয়টি সামনে আনা।
কীভাবে তৈরি হলো গেমটি
গেমটি তৈরি করতে ওমর ফারুক রিয়াদের প্রায় দুই সপ্তাহ সময় লেগেছে। প্রচলিত কোনো তৈরি গেম ইঞ্জিন ব্যবহার না করে তিনি এটি তৈরি করেছেন HTML, CSS ও JavaScript দিয়ে। ত্রিমাত্রিক দৃশ্য তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে Three.js প্রযুক্তি।
গেমটির বিশেষত্ব হলো, ঢাকার পরিবেশকে চেনা কিছু উপাদানের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এতে রয়েছে রিকশাচিত্র, ফ্লাইওভার, মেট্রোরেলের পিলারে আঁকা ছবি, শহীদ মিনার, শাহবাগের ফুলের দোকান এবং আনন্দ সিনেমা হলের মতো পরিচিত স্থাপনা। ফলে সাধারণ কোনো গাড়ি চালানোর গেমের বদলে এখানে স্থানীয় শহুরে জীবনের পরিচিত দৃশ্য দেখা যায়।
কীভাবে খেলবেন ‘বাপের রাস্তা’
- গেমের ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতে ব্রাউজারে baperrasta.com খুলুন। এটি ওয়েবভিত্তিক গেম, তাই খেলার জন্য আলাদা অ্যাপ ইনস্টল করার প্রয়োজন নেই।
- গেমের শুরুর পর্দায় ‘রাস্তায় নামুন’ লেখা অপশনে চাপ দিলে খেলা শুরু হবে। এরপর অটোরিকশাচালকের ভূমিকায় ঢাকার সড়কে চলতে হবে।
- গেমে অন্য যানবাহন ও পথচারীর সঙ্গে সংঘর্ষ, হর্ন এবং ‘শব্দ বোমা’ নামের মজার একটি অপশন রয়েছে। সংঘর্ষের পর ক্ষয়ক্ষতির হিসাব দেখানো হয়। গাড়ি কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, তা পর্দায় দেওয়া নির্দেশনা দেখে অনুসরণ করতে হবে।
- গেমে বিশৃঙ্খলা বাড়লে ‘জাতীয় ক্ষতি’র পয়েন্টও বাড়ে। ক্ষুব্ধ লোকজন অটোরিকশাচালককে ধরে ফেললে খেলা শেষ হয়ে যায়। এরপর ‘দৈনিক যানজট’ নামে কাল্পনিক পত্রিকার শিরোনামে খেলার কীর্তি তুলে ধরা হয়।
মোবাইলে খেলার উপায়
‘বাপের রাস্তা’ মূলত ব্রাউজারে খেলার জন্য তৈরি। তাই এটি খেলতে গুগল প্লে স্টোর বা অ্যাপল অ্যাপ স্টোর থেকে অ্যাপ ডাউনলোড করার প্রয়োজন নেই। ভবিষ্যতে গেমটি আরও সহজে ব্যবহারের জন্য হোম স্ক্রিনে যুক্ত করার সুবিধা পাওয়া গেলে ব্রাউজারের ‘Add to Home Screen’ অপশন ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে এটি আলাদা অ্যাপ ডাউনলোড করার সমান নয়। ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতে সমস্যা হলে পরে আবার চেষ্টা করার কথা বলা হয়েছে প্রতিবেদনে।
ব্যঙ্গে ভরা গেমের ভেতরটা
ঢাকার সড়ক নিয়ে এই ব্যঙ্গগেমে শুধু যানবাহন চালানোর বিষয়টিই নেই, সড়কের বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে রয়েছে হাস্যরসও। হর্ন বাজানোর পাশাপাশি ‘শব্দ বোমা’ অপশনে চাপ দিলে শোনা যায় ‘খাইছি তোরে’ কিংবা ‘সানডে মানডে ক্লোজ কইরা দিমু’-এর মতো সংলাপ। আবার কিছু পরিস্থিতিতে পুলিশকে ‘চা-পানি’ দেওয়ার মতো বিষয়ও ব্যঙ্গের ছলে তুলে ধরা হয়েছে।
গেমটি প্রথমে বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেন নির্মাতা। পরে এটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গুগল অ্যানালিটিকসের তথ্যে দেখা গেছে, দুই দিনে গেমটি এক লাখের বেশি বার খেলা হয়েছে।
যে প্রশ্নটি থেকেই যায়
তবে গেমটির উপস্থাপনা নিয়ে একটি প্রশ্নও তুলেছে জাগো নিউজের প্রতিবেদন। সেখানে বলা হয়েছে, সড়কের বিশৃঙ্খলাকে ব্যঙ্গ করা এক বিষয়, আর চালককে ধরে মারধরকে পরিণতি হিসেবে দেখানো আরেক বিষয়। তাই গেমটিকে নিছক হাস্যরস হিসেবে দেখার পাশাপাশি প্রতিবেদনে মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে, বাস্তবে সড়কের অনিয়মের সমাধান হওয়া উচিত আইন প্রয়োগ, নিরাপদ যানবাহন, চালকদের প্রশিক্ষণ এবং জবাবদিহির মাধ্যমে—সহিংসতার মাধ্যমে নয়।
Source: জাগো নিউজ২৪






