ইসরায়েলে ২৭ অক্টোবরের নির্বাচন সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছেন সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকট। সাম্প্রতিক কয়েকটি জনমত জরিপে তাঁর দল ইয়াশারের জন্য ২০ থেকে ২৩টি আসনের পূর্বাভাস এসেছে। কোনো কোনো জরিপে নেতানিয়াহুর লিকুদকে পেছনে ফেলার সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে।
জাগো নিউজ ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, একসময় জরিপে আইজেনকটের সমর্থন এক অঙ্কে সীমিত ছিল। সেখান থেকে তিনি এখন বিরোধী শিবিরের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে পৌঁছেছেন। তবে ১২০ আসনের ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটে সর্বোচ্চ আসন পেলেও তাঁর সরকার গঠন নিশ্চিত হবে না। সে জন্য অন্য দলগুলোর সমর্থন দরকার হবে; আরব দলগুলোও সেই সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সেনাজীবন থেকে রাজনীতিতে
আইজেনকটের বয়স ৬৬ বছর। মরক্কো থেকে আসা এক ইহুদি অভিবাসী পরিবারে তাঁর জন্ম। নয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয় এবং পাঁচ সন্তানের বাবা।
ইসরায়েলের উত্তরের তিবেরিয়াস ও দক্ষিণের ইলাত শহরে তাঁর শৈশব-কৈশোর কেটেছে। নেতানিয়াহুর মতো রাজনৈতিক ক্ষমতাকেন্দ্রের অভিজাত পরিমণ্ডলে তিনি বড় হননি।
১৯৭৮ সালে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর গোলানি ব্রিগেডে যোগ দেন আইজেনকট। প্রায় চার দশকের সামরিক কর্মজীবনে বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে তিনি বাহিনীর শীর্ষ পদে পৌঁছান। ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সেনাপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। তখনও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন নেতানিয়াহু।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাহিনীর শৃঙ্খলা ও নৈতিকতার বিষয়ে কঠোর অবস্থানের জন্য আইজেনকট পরিচিত। ২০১৬ সালে হেবরনে আহত এক ফিলিস্তিনি হামলাকারীকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় ইসরায়েলি সেনা এলর আজারিয়ার বিচারের পক্ষে ছিলেন তিনি। ডানপন্থি রাজনীতিকদের চাপ সত্ত্বেও ওই ঘটনায় সামরিক তদন্তকে সমর্থন দেন।
সামরিক বাহিনী থেকে অবসর নেওয়ার পর ২০২২ সালে রাজনীতিতে আসেন আইজেনকট। আরেক সাবেক সেনাপ্রধান বেনি গান্টজের সঙ্গে তিনি রাজনৈতিক জোট গড়েন।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে হামলার পর নেতানিয়াহুর জরুরি যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভায় যোগ দেন আইজেনকট ও গান্টজ। কিন্তু যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের স্পষ্ট পরিকল্পনা নেই—এমন অভিযোগে ২০২৪ সালের জুনে দুজনই মন্ত্রিসভা থেকে সরে দাঁড়ান।
যুদ্ধে পরিবারের ক্ষতি
গাজা যুদ্ধে আইজেনকটের পরিবারও স্বজন হারিয়েছে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে গাজায় যুদ্ধের সময় তাঁর ছোট ছেলে গাল নিহত হন। গালের বয়স ছিল ২৫ বছর। যুদ্ধে আইজেনকটের দুই ভাতিজাও প্রাণ হারান।
২০২৬ সালের এপ্রিলে ইসরায়েলি সংবাদপত্র ইয়েদিওত আহরোনোতে একটি নিবন্ধ লেখেন আইজেনকট। সেখানে ছেলের কবরের পাশে নিজের করা প্রতিজ্ঞার কথা তুলে ধরেন। তিনি লেখেন, ছেলে ও তাঁর সহযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ যেন বৃথা না যায়, তা নিশ্চিত করবেন।
ছেলেকে হারানো এবং যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এখন তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। নির্বাচনি প্রচারে নেতৃত্ব, জাতীয় ঐক্য ও জবাবদিহিকে সামনে আনছেন তিনি। তাঁর দল ইয়াশারের নামের হিব্রু অর্থ ‘সোজা’ অথবা ‘ন্যায়সংগত’।
জবাবদিহি ও সামরিক সেবা
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা ঠেকানো যায়নি কেন, তা খতিয়ে দেখতে রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন আইজেনকট। এ ধরনের তদন্তের বিরোধিতা দীর্ঘদিন ধরেই করে আসছেন নেতানিয়াহু।
সব নাগরিককে বাধ্যতামূলকভাবে সামরিক অথবা জাতীয় সেবায় যুক্ত করার পক্ষেও আইজেনকট। বিপরীতে, নেতানিয়াহুর বর্তমান জোটের অতি-ধর্মীয় ইহুদি দলগুলো চায়, তাদের সম্প্রদায়ের সদস্যরা এ বাধ্যবাধকতা থেকে ছাড় পান।
তবে নিরাপত্তা ও সামরিক কার্যক্রমের প্রশ্নে দুই নেতার অবস্থানে বড় ব্যবধান নেই। গাজা, লেবানন ও ইরানে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে সামগ্রিকভাবে সমর্থন করেছেন আইজেনকট। ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা এবং অঞ্চলজুড়ে দেশটির মিত্রগোষ্ঠীগুলোর শক্তি কমানোর লক্ষ্যেও নেতানিয়াহুর সঙ্গে তাঁর অবস্থানের মিল রয়েছে।
পার্থক্য হলো, আইজেনকট সামরিক অর্জনের সঙ্গে কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও জরুরি বলে মনে করেন। গাজা যুদ্ধ টেনে নিয়ে নেতানিয়াহু জিম্মিদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলছেন বলেও তিনি অভিযোগ করেছেন।
ফিলিস্তিন প্রশ্নে অবস্থান
ফিলিস্তিনিদের বিষয়ে আইজেনকটের নীতি কতটা আলাদা হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। তিনি দীর্ঘদিন ইসরায়েলের নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন। ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য তাঁর সম্ভাব্য জোটে ডানপন্থি দলও থাকতে পারে।
গাজায় হামাসের শাসন শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন আইজেনকট। এ লক্ষ্য পূরণে তিনি ১৮ মাসের সময়সীমা উল্লেখ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনা কার্যকর করে কিংবা সামরিক অভিযানের মধ্য দিয়ে সেই লক্ষ্য অর্জনের কথা বলেছেন তিনি।
অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণের পরিণতি নিয়ে অতীতে উদ্বেগ জানিয়েছিলেন আইজেনকট। তাঁর বক্তব্য ছিল, এভাবে নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকলে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের বদলে একই রাষ্ট্রে ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনিদের বসবাসের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
কিন্তু ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর ফিলিস্তিনিদের আলাদা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের বিরোধিতা করেছেন তিনি। সম্প্রতি এই সমাধানের সমর্থকদের ‘বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন’ বলেও মন্তব্য করেছেন।
অন্যদিকে, পশ্চিম তীরের ভূখণ্ড আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলের অন্তর্ভুক্ত করার বিরোধী আইজেনকট। অবৈধ বসতির বিস্তার এবং বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বন্ধ করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তিনি।
সরকার গঠনের সমীকরণ
ইসরায়েলের নির্বাচনি পদ্ধতিতে সর্বাধিক আসন জেতা দল স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরকার গঠনের দায়িত্ব পায় না। পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনা যাঁর বেশি, সেই আইনপ্রণেতাকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেন প্রেসিডেন্ট। নেসেটের ১২০ আসনের মধ্যে এ জন্য অন্তত ৬১টির সমর্থন প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে উল্লিখিত সাম্প্রতিক জরিপগুলোয় কোনো পক্ষই সেই অবস্থানে নেই। নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে ডানপন্থি ও অতি-ধর্মীয় দলগুলোর জোট কিংবা তাঁর বিরোধী শিবির—কেউই নিজেদের শক্তিতে ৬১ আসনে পৌঁছানোর পূর্বাভাস পায়নি।
ফলে আইজেনকটকে মধ্যপন্থি ও বামপন্থিদের পাশাপাশি কিছু ডানপন্থি দলের সমর্থনও সংগ্রহ করতে হতে পারে। আসনবিন্যাসের ওপর নির্ভর করে আরব দলগুলোর সমর্থন নেওয়ার প্রয়োজনও দেখা দিতে পারে।
আরব দলগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক সহযোগিতার বিরোধিতা দীর্ঘদিন ধরে করছেন নেতানিয়াহু। শুধু তাঁর শিবির নয়, বিরোধী পক্ষের কয়েকজন নেতাও আরব দলগুলোকে নিয়ে সরকার গঠনে অনাগ্রহ জানিয়েছেন।
আইজেনকট অবশ্য সরাসরি ৬১ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও সরকার গঠনের চেষ্টা করবেন বলে জানিয়েছেন। এতে আরব দলগুলোর বাইরের সমর্থন নিয়ে সংখ্যালঘু সরকার গড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু তাঁর সম্ভাব্য জোটের ডানপন্থি অংশীদারেরা এমন বন্দোবস্তে আপত্তি তুলতে পারেন।
ট্রাম্প ও আঞ্চলিক কূটনীতি
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে নেতানিয়াহুর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। সম্প্রতি তাঁকে ‘দারুণ লড়াকু প্রধানমন্ত্রী’ বলে প্রশংসাও করেছেন। দুই নেতার রাজনৈতিক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের।
জেরুজালেমে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস সরিয়ে নেওয়া, ইরানের পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে যাওয়া এবং আব্রাহাম চুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁদের অবস্থানের মিল ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে গাজা ও লেবাননে ইসরায়েলের কিছু সামরিক পদক্ষেপের সঙ্গে ট্রাম্পের আঞ্চলিক শান্তি প্রচেষ্টার সংঘাত দেখা দিয়েছে।
জাগো নিউজ ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন তুলে ধরে বলা হয়েছে, আইজেনকট ক্ষমতায় গেলে আঞ্চলিক কূটনীতি এগোনোর সুযোগ বাড়তে পারে। বিশেষত নেতানিয়াহুর কট্টর ডানপন্থি শরিকেরা সরকারে না থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এ ক্ষেত্রে অগ্রগতি সম্ভব হতে পারে বলে তাঁরা মনে করছেন।
এই কূটনৈতিক উদ্যোগের মধ্যে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টাও রয়েছে। তবে ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য বিশ্বাসযোগ্য পথ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে আসছে সৌদি আরব।
তাই আইজেনকটের সামনে পরীক্ষা শুধু ভোটে নেতানিয়াহুকে পেছনে ফেলা নয়। নির্বাচনের পরে বিভিন্ন দলের সমর্থন একত্র করে সরকার গঠনও তাঁর জন্য কঠিন হতে পারে। পাশাপাশি ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও ফিলিস্তিন নীতিতে পরিবর্তন আনার প্রশ্নেও তাঁকে কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
Source: জাগো নিউজ২৪






