গাজীপুরের টঙ্গীতে এক শিশুকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া মাদরাসাশিক্ষক ঘটনার পরদিন মিষ্টির ব্যাগ হাতে নিয়ে ওই শিশুর বাসায় গিয়েছিলেন। ভাড়া বাড়িটিতে লাগানো সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পর্যালোচনা করে এ দৃশ্য পাওয়া গেছে। তবে শেষ পর্যন্ত শিশুটির মায়ের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়নি।

অভিযুক্ত ওই শিক্ষকের নাম মুসলিম আহমেদ। তিনি টঙ্গীর আউচপাড়া এলাকার ক্বারীউল কোরআন ইন্টারন্যাশনাল মাদরাসার শিক্ষক। গত ১৯ অক্টোবর ওই মাদরাসায় এক শিশুকে যৌন নিপীড়নের (চুমু দেওয়া) অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। ঘটনার পরদিন দুপুরে শিশুটির মায়ের সঙ্গে দেখা করে বিষয়টির মীমাংসা করতেই তিনি ওই বাসায় গিয়েছিলেন, সঙ্গে মিষ্টিও নিয়েছিলেন।

সিসিটিভিতে যা দেখা গেছে

ফুটেজ অনুযায়ী, গত ২০ অক্টোবর দুপুর ১২টা ৩৮ মিনিটে হলুদ-লাল রঙের একটি ব্যাগ হাতে ভবনে ঢোকেন মুসলিম আহমেদ। তিনি পাঞ্জাবি ও টুপি পরা ছিলেন। এ ধরনের ব্যাগ সাধারণত মিষ্টিজাত দ্রব্য প্যাকেট করার কাজে ব্যবহৃত হয়। নিচতলায় নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলে তিনি লিফটের দিকে যান। এক মিনিট পর, অর্থাৎ ১২টা ৩৯ মিনিটে তাঁকে লিফটে ওপরে উঠতে দেখা যায়।

কিন্তু যে বাসায় তাঁর যাওয়ার কথা ছিল, সেই বাসার দরজা খোলেনি। প্রায় ১০ মিনিট পর একই ব্যাগ হাতে নিয়ে নিচে নেমে ভবন থেকে বেরিয়ে যান তিনি। পুরো সময়ই ব্যাগটি তাঁর হাতে ছিল। অন্য একটি ফুটেজে ওই ব্যাগের ভেতরে মিষ্টির প্যাকেট রাখা থাকতে দেখা গেছে।

শিশুটির মায়ের সঙ্গে দেখা করতে না পেরে দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিটে তাঁর হোয়াটসঅ্যাপে একটি বার্তাও পাঠান মুসলিম আহমেদ। বার্তায় লেখা ছিল, ‘আপু, আপনার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। আপনার সঙ্গে একটু দেখা করতে এসেছি।’ তবে শেষ পর্যন্ত শিশুটির মায়ের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়নি। দেখা না হওয়ায় তিনি মাদরাসায় ফিরে যান।

ঘটনার পরদিন কেন তিনি মিষ্টি নিয়ে শিশুটির পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন, সে বিষয়ে মুসলিম আহমেদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

পরিবারের হুমকির অভিযোগ

শিশুটির পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার পর থেকে তাঁরা নানা ধরনের হুমকি ও ধমকির মুখে পড়ছেন। পরিবারের সদস্যদের ফোন নম্বর ছড়িয়ে পড়ায় বিভিন্ন নম্বর থেকে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। অভিযোগ তুলে নিতে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা ভিডিও সরিয়ে ফেলতে চাপ দেওয়া হচ্ছে বলেও দাবি করেছেন শিশুটির বাবা শাহজালাল রুমি।

সোমবার (২৬ অক্টোবর) বিকেলে এ বিষয়ে কথা বলেন তিনি। শাহজালাল রুমি বলেন, ‘আমার এবং আমার পরিবারের ফোন নম্বরগুলো সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে। এই সুযোগে আমাদের ফোনে নানাভাবে হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছে। তারা বলছেন, অভিযোগ যেন তুলে নিই। যেসব ভিডিও আপলোড করা হয়েছে, সেগুলো যেন ফেলে দিই। সারাক্ষণ একটা আতঙ্কের মধ্যে কাটছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, আমার এই প্রতিবাদ আলেম সমাজের বিরুদ্ধে নয়। আমার এই প্রতিবাদ লেবাসধারীদের বিরুদ্ধে।’

কী ঘটেছিল ১৯ অক্টোবর

গত ১৯ অক্টোবর টঙ্গীর আউচপাড়া এলাকার ক্বারীউল কোরআন ইন্টারন্যাশনাল মাদরাসায় এক শিশুকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠে শিক্ষক মুসলিম আহমেদের বিরুদ্ধে। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর শিশুটির পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় অভিযোগ করা হয়। এ নিয়ে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে অভিযুক্ত শিক্ষককে মারধর করে পুলিশের হাতে তুলে দেন শিশুটির বাবা ও স্থানীয় লোকজন।

ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। শাহজালাল রুমি অভিযোগ করেন, সন্তানের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিচার চাইতেই তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে গিয়েছেন। তাঁর দাবি, বিচার চাওয়ার কারণে এখন উল্টো তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে।

গ্রেফতার ও জামিন নামঞ্জুর

এ ঘটনায় করা মামলায় পুলিশ গত ২১ অক্টোবর শিক্ষক মুসলিম আহমেদকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠায়। রোববার (২৫ অক্টোবর) তাঁর জামিন শুনানির দিন ধার্য ছিল। আদালতের বিচারক তাঁর জামিন নামঞ্জুর করেন।

টঙ্গী পশ্চিমপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান বলেন, শিশুকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে মাদরাসার এক শিক্ষককে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ ঘটনায় মাদরাসার পক্ষ থেকেও আরও একটি মামলা করা হয়েছে। দুটি ঘটনায় তদন্ত চলছে এবং তদন্ত এখনো চলমান।

হুমকির বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি বলেন, দুই পক্ষই মৌখিকভাবে অভিযোগ করেছেন যে তাঁদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। তবে হুমকির বিষয়ে এখন পর্যন্ত লিখিত কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি।

Source: জাগো নিউজ২৪