তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে জীবনযাত্রার ব্যয়, পুষ্টি, স্বাস্থ্য, সন্তানদের শিক্ষা ও পরিবারের মৌলিক চাহিদাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির (বিজিডব্লিউএস) সভাপতি তাসলিমা আখতার।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মজুরি নির্ধারণে শিল্পের উৎপাদনশীলতা ও বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় রাখা জরুরি হলেও শ্রমিকদের জীবনমানের প্রশ্নটি প্রায়ই উপেক্ষিত থেকে যায়। নতুন মজুরি বোর্ড গঠন, শ্রমিকদের মাসিক ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবি, মালিক ও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের দায়িত্ব এবং শ্রমিক আন্দোলনের ধরন নিয়ে জাগো নিউজের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ইব্রাহীম হুসাইন অভি।

বোর্ড গঠন ও প্রতিনিধিত্ব

ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে কোন বিষয়গুলোকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত—এ প্রশ্নের উত্তরে তাসলিমা আখতার প্রথমেই মজুরি বোর্ড গঠন ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার কথা বলেন। অতীতের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, বোর্ডে শ্রমিক, মালিক ও নিরপেক্ষ সদস্য থাকলেও অনেক সময় শ্রমিকদের স্বার্থ যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না। এ কারণে বোর্ডের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।

তিনি আশা প্রকাশ করেন, এবার প্রকৃত শ্রমিক প্রতিনিধি ও নিরপক্ষ সদস্যরা স্বাধীনভাবে তাদের ভূমিকা পালন করতে পারবেন। তাঁর মতে, শ্রমিক অপুষ্টিতে থাকবেন, সন্তানদের শিক্ষা ও পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে পারবেন না—এমন পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক ধরে নিয়ে মজুরি নির্ধারণ করা উচিত নয়। শ্রমিকের মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত মজুরি নির্ধারণের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

মজুরি নির্ধারণে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়, পুষ্টি, স্বাস্থ্য, সন্তানদের শিক্ষা ও পরিবারের মৌলিক চাহিদা বিবেচনা করতে হবে। একই সঙ্গে শিল্পের উৎপাদনশীলতা ও দেশের বাজার পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তিনি। তবে বাস্তবে উৎপাদনশীলতা ও শিল্পের সক্ষমতা নিয়ে বেশি আলোচনা হয়, আর শ্রমিক কতটা ভালোভাবে বাঁচতে পারছেন—সেই প্রশ্নটি তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পায়।

অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও ক্রয়ক্ষমতা

শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান বিবেচনায় দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তাসলিমা আখতার বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সামগ্রিক পরিস্থিতির পরিবর্তন হচ্ছে। এ অবস্থায় শ্রমিকেরা কী অবস্থায় আছেন এবং তাঁদের আয় দিয়ে কতটা মৌলিক চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে, তা বিবেচনা করা জরুরি।

বাজারে পণ্যমূল্য বাড়লে শ্রমিকের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, শুধু শিল্পের সক্ষমতা বা উৎপাদন ব্যয় বিবেচনা করে মজুরি নির্ধারণ করলে হবে না; শ্রমিকের জীবনযাত্রার বাস্তব চিত্রও দেখতে হবে। নতুন মজুরি বোর্ড শ্রমিকদের স্বার্থকে যথাযথ গুরুত্ব দেবে বলে তিনি আশাবাদী। তাঁর মতে, শিল্পের স্বার্থ থাকবেই, কিন্তু শ্রমিকের স্বার্থকেও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

৩০ হাজার টাকার দাবি

শ্রমিকদের বিভিন্ন সংগঠন থেকে মাসিক ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবি তোলা হচ্ছে—এটি কতটা যৌক্তিক, এমন প্রশ্নে তাসলিমা আখতার বলেন, বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় ৩০ হাজার টাকার নিচে একজন শ্রমিকের পক্ষে কোনোমতে বেঁচে থাকাও কঠিন। বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের এ দাবির পেছনে যৌক্তিক কারণ রয়েছে।

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, পরিবারের ব্যয় ও শ্রমিকদের জীবনযাত্রার বাস্তবতা বিবেচনা করেই এ দাবি তোলা হচ্ছে। তবে দাবি উত্থাপন করলেই সেই অঙ্ক চূড়ান্ত হয়ে যাবে—বিষয়টি এমন নয়। মজুরি নির্ধারণ একটি আলোচনাভিত্তিক প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়ায় শ্রমিকপক্ষ তাদের প্রস্তাব দেবে, মালিকপক্ষ তাদের অবস্থান তুলে ধরবে এবং সরকার সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে।

তবে আলোচনার শুরুতেই শ্রমিকের চাহিদাকে অযৌক্তিক ধরে নেওয়া উচিত নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। একজন শ্রমিককে কীভাবে দেখা হয় এবং তাঁর জীবন ও মর্যাদাকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়, তার ওপরও মজুরি দাবির অবস্থান নির্ভর করে।

মালিকপক্ষের সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা

মালিকপক্ষ বলছে, মজুরি নির্ধারণে শিল্পের সক্ষমতা ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা বিবেচনা করতে হবে। এ বিষয়ে তাসলিমা আখতার বলেন, শিল্পের সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার বিষয়গুলো অবশ্যই বিবেচনায় থাকবে; কিন্তু সেগুলোকে শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নির্ধারণের পথে বাধা হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।

মজুরি বোর্ডে শ্রমিক ও মালিকপক্ষের মধ্যে দর-কষাকষি হবে—এটাই স্বাভাবিক। দুই পক্ষের প্রস্তাবের মধ্যে আলোচনা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে। শ্রমিকদের চাহিদা বিবেচনা না করে শুধু মালিকপক্ষের সক্ষমতাকে প্রাধান্য দিলে ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত হবে না। একইভাবে শিল্পের বাস্তবতাও আলোচনার বাইরে রাখা যাবে না। গুরুত্বপূর্ণ হলো, শ্রমিকের মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের অধিকারকে কেন্দ্র করে একটি গ্রহণযোগ্য মজুরি কাঠামো তৈরি করা।

ক্রেতাদের দায়িত্ব

ন্যায্য মজুরি নিশ্চিতে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন তাসলিমা আখতার। পোশাকের মূল্য নির্ধারণ ও মুনাফার বড় অংশের সঙ্গে তাদের স্বার্থ জড়িত; অথচ উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকেরা অনেক সময় ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত থাকেন।

দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা বলে আসছেন, ক্রেতাদের ন্যায্য পণ্যমূল্য দিতে হবে। উৎপাদনের প্রকৃত ব্যয় ও শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করা উচিত। অন্যদিকে, দেশের মালিকদেরও ক্রেতাদের সঙ্গে দর-কষাকষির সক্ষমতা বাড়াতে হবে। ক্রেতাদের কাছ থেকে যথাযথ মূল্য নিশ্চিত করা না গেলে উৎপাদন ব্যয়ের চাপ শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদের ওপর পড়ার ঝুঁকি থাকে।

ইতিবাচক পরিবর্তন

নতুন মজুরি বোর্ড গঠন ও শ্রমিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে কোন বিষয়গুলো ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে—এ প্রশ্নে তাসলিমা আখতার প্রথমে উল্লেখ করেন, মজুরি নির্ধারণের সময়সীমা কমিয়ে পাঁচ বছরের পরিবর্তে তিন বছর পরপর পর্যালোচনার ব্যবস্থা করা একটি ইতিবাচক পরিবর্তন।

এ ছাড়া ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের ক্ষেত্রে শ্রমিক সংখ্যাভিত্তিক শর্তে পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে নির্দিষ্ট অনুপাতে শ্রমিকের সমর্থন প্রয়োজন হতো; এখন ৩০০ জন পর্যন্ত শ্রমিক রয়েছে এমন কারখানায় ২০ জন শ্রমিকের মাধ্যমে ইউনিয়ন গঠনের সুযোগসহ বিভিন্ন শ্রমিকসংখ্যার জন্য আলাদা সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব পরিবর্তনের পেছনে শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের দাবি, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) চাপ এবং বিভিন্ন পর্যায়ের আন্দোলনের ভূমিকা রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে শ্রমিক অধিকারের ক্ষেত্রে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। তবে এসব অর্জন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে, যাতে শ্রমিকেরা তাঁদের অধিকার চর্চা করতে পারেন এবং মজুরি নিয়ে স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারেন।

আন্দোলন ও কর্মসূচির যৌক্তিকতা

নতুন মজুরি বোর্ড গঠন প্রক্রিয়া চলাকালে শ্রমিকদের আন্দোলন ও কর্মসূচি কতটা যৌক্তিক—এ প্রশ্নে তাসলিমা আখতার বলেন, মজুরির দাবি জানানো ও নিজেদের অধিকার আদায়ে গণতান্ত্রিকভাবে আন্দোলন করা স্বাভাবিক ও ন্যায্য অধিকার। কোনো কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে বা বেতন না দিয়ে মালিকপক্ষ চলে গেলে সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের প্রতিবাদ করাও অস্বাভাবিক নয়।

শ্রমিকদের উচিত নিজেদের ন্যায্য দাবি সংগঠিতভাবে ও গণতান্ত্রিক উপায়ে তুলে ধরা। একই সঙ্গে এমন কোনো পরিস্থিতি বা উসকানিতে জড়ানো উচিত নয়, যাতে তাদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন ক্ষতিগ্রস্ত হয় কিংবা অতীতের অর্জন নষ্ট হয়ে যায়। শ্রমিকদের দাবিকে কেউ যেন অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে না পারে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।

মজুরি নিয়ে শ্রমিকদের অসন্তোষ বা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বিভ্রান্তি ছড়ানো কিংবা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করার চেষ্টা হলে শেষ পর্যন্ত শ্রমিকেরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সরকারের কাছে প্রত্যাশা

শ্রমিকদের অধিকার ও মজুরি নিশ্চিত করতে সরকারের কাছে প্রত্যাশা জানিয়ে তাসলিমা আখতার বলেন, সরকারকে এমন একটি কার্যকর ও নিরপেক্ষ মজুরি বোর্ড নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে শ্রমিকদের প্রকৃত প্রতিনিধিরা স্বাধীনভাবে তাদের বক্তব্য তুলে ধরতে পারবেন।

মজুরি নির্ধারণের সময় শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়, পুষ্টি, স্বাস্থ্য, সন্তানদের শিক্ষা ও পরিবারের মৌলিক চাহিদাকে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার অধিকার ও গণতান্ত্রিকভাবে দাবি জানানোর সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।

শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবি যেন কোনোভাবে উপেক্ষিত না হয়, আবার এ দাবিকে কেন্দ্র করে তাদের অর্জিত অধিকারও যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়—সরকারকে এসব বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। নতুন মজুরি বোর্ড অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে শ্রমিকদের স্বার্থকে যথাযথ গুরুত্ব দেবে এবং এমন একটি মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করবে, যা শ্রমিকদের মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনে সহায়তা করবে—এমন আশা প্রকাশ করেন তিনি।

Source: জাগো নিউজ২৪