দেশের পোশাকশিল্পে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লে শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা কমবে, দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়বে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। তবে এই সবুজ রূপান্তরের সুফল পুরোপুরি পেতে হলে শ্রমিকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রস্তুত করা জরুরি। একই সঙ্গে তাঁদের স্বাস্থ্যসুরক্ষা, উন্নত কর্মপরিবেশ ও বাসযোগ্য আবাসন নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে।

এসব বিষয়ে মতামত দিয়েছেন স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্য�়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার। জাগো নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক সাইফুল হক মিঠু।

সৌরবিদ্যুৎ হতে পারে বড় বিকল্প

নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সবুজ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লে শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা সাশ্রয় হবে বলে মনে করেন অধ্যাপক কামরুজ্জামান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এতে শ্রমিকদের দক্ষতা ও উৎপাদন বাড়বে। এ ক্ষেত্রে সৌরবিদ্যুৎ ভালো বিকল্প হতে পারে।

সৌরবিদ্যুতের সুফল ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, এর মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত হবে, জ্বালানি নিরাপত্তা তৈরি হবে এবং পরিবেশ ভালো থাকবে। এর মাধ্যমেই সবুজ রূপান্তরের পথে এগোনো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে নতুন কাজের অনেক ক্ষেত্রও তৈরি হতে পারে।

তিনি উল্লেখ করেন, দেশের পোশাক খাতে লিড ও প্লাটিনাম সনদপ্রাপ্ত শিল্পকারখানা রয়েছে। বিশ্বের লিড ও প্লাটিনাম সনদপ্রাপ্ত শিল্পকারখানার বড় একটি অংশ বাংলাদেশে অবস্থিত। এসব কারখানার সূত্রে সবুজ অর্থনীতি ও সবুজ কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে। তবে এজন্য শ্রমিকদের প্রস্তুত করাই বড় চ্যালেঞ্জ। শ্রমিকদের সবুজ বা পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার। পাশাপাশি সবুজ অর্থায়নে তাঁদের অন্তর্ভুক্ত করাও প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

চাকরি হারানোর ঝুঁকি নেই

সবুজ রূপান্তরে শ্রমিকদের চাকরি হারানোর কোনো ঝুঁকি আছে কি না—এমন প্রশ্নে অধ্যাপক কামরুজ্জামান বলেন, শ্রমিকদের দক্ষতার পাশাপাশি মালিকপক্ষের আগ্রহ ও দূরদর্শিতাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কারখানা কতটা সবুজ হবে, তা শ্রমিকের ওপর নির্ভর করে না; এটি নির্ভর করে মালিকের বিনিয়োগের ওপর।

তাঁর মতে, সবুজ প্রযুক্তিতে যে ধরনের বিনিয়োগ দরকার, তা বেশ উল্লেখযোগ্য। তবে এই বিনিয়োগের সুফল পাওয়ার সময়সীমা ভালো। একটি নির্দিষ্ট সময় পর কারখানার ব্যয় কমে আসে এবং পাঁচ বছরের মধ্যে বিনিয়োগের সুফল পাওয়া সম্ভব।

তিনি আরও জানান, সবুজ রূপান্তরে শ্রমিকদের ক্ষতি হবে—বিষয়টি এমন নয়। তাঁরা মোটামুটিভাবে নিরাপদ। এখানে চাকরি হারানোর ঝুঁকি নেই, উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকিও নেই। যে কারখানাগুলো সবুজ বিপ্লবে গেছে, সেগুলোর কোনোটিই বন্ধ হয়নি। বরং ওই কারখানাগুলোর ব্যবসা খারাপ হয়নি, ব্যবসার উন্নতি হয়েছে।

ন্যায্য রূপান্তরের শর্ত

পোশাক খাতে ন্যায্য রূপান্তর বা ‘জাস্ট ট্রানজিশন’ নিশ্চিত করতে কী করা প্রয়োজন—এমন প্রশ্নে অধ্যাপক কামরুজ্জামান বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা দরকার এবং তা অবশ্যই নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক হতে হবে। বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করতে হবে। শ্রমিকদের স্বাস্থ্যকে বিবেচনায় রাখতে হবে এবং শিল্পকারখানায় নেট জিরো নিঃসরণ নিশ্চিত করার দিকে যেতে হবে।

শ্রমিকের কারখানা সৌরবিদ্যুতে চললেও তাঁর বাসায় বিদ্যুৎ সংকট থাকলে বিষয়টি কীভাবে দেখা উচিত—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শ্রমিকেরা তাঁদের দৈনন্দিন জীবনের এক-তৃতীয়াংশ কারখানায় কাটান। কারখানায় সবুজ বিপ্লব থাকলে এবং তা কর্মীবান্ধব হলে শ্রমিকেরা এর সুফল পাবেন।

তিনি তুলনা করে বলেন, স্টিল রোলিং মিলে শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি পোশাকশ্রমিকদের তুলনায় অনেক বেশি। তীব্র তাপপ্রবাহে শ্রমিকেরা অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। পেটের পীড়া ও ডেঙ্গুসহ নানা রোগে তাঁরা আক্রান্ত হচ্ছেন। তাঁদের পরিবারের সদস্যরাও রোগাক্রান্ত হচ্ছেন। এসব কারণে শ্রমিকেরা কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকছেন। ফলে তাঁদের আয় কমছে এবং ঋণ বাড়ছে। এতে শ্রমিকেরা বিপদে পড়ছেন।

এ অবস্থা থেকে উত্তরণে শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করেন অধ্যাপক কামরুজ্জামান। তাঁদের কর্মপরিবেশ ও ঘরের পরিবেশ উন্নত করতে এবং তা বাসযোগ্য করতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে কাজ করতে হবে।

Source: জাগো নিউজ২৪