এলডিসি তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের সময়সীমা আরও তিন বছর বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে কেবল সুবিধা পাওয়ার ব্যাপার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। তাঁর মতে, এই সময়কালে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা জোরদার ও নীতিগত সংস্কারে অগ্রগতি না হলে বাড়তি সময়ও অর্থহীন হয়ে পড়বে।

গত বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণে অতিরিক্ত তিন বছর সময় দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এতে আগের নির্ধারিত ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বরের বদলে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর উত্তরণ কার্যকর হবে। এই সিদ্ধান্তে কী বার্তা আসছে, বাড়তি সময় কতটা কাজে লাগানো যাবে এবং উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জের প্রস্তুতি কেমন হওয়া উচিত—এসব বিষয়ে জাগো নিউজের সঙ্গে কথা বলেন জাহিদ হোসেন। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন বিশেষ সংবাদদাতা ইব্রাহীম হুসাইন অভি।

‘কার্যত ছয় বছরের সুযোগ’

জাহিদ হোসেন বলেন, বর্তমানে এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ যে সুবিধাগুলো পাচ্ছে, সেগুলো আরও তিন বছর বহাল থাকবে। এরপর মসৃণ উত্তরণের জন্য যে অতিরিক্ত তিন বছরের কথা বলা হয়েছে, সেটিও বহাল থাকার আশা করা যায়। তাঁর হিসাবে, আগে নভেম্বরে উত্তরণ হলে তিন বছরের যে সময় পাওয়া যেত, এখন কার্যত মোট ছয় বছরের সুযোগ তৈরি হলো।

তাৎক্ষণিক উদ্বেগের একটি বড় জায়গা ছিল ওষুধশিল্প—বিশেষ করে মেধাস্বত্ব বা ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটসের ক্ষেত্রে এলডিসিভিত্তিক ছাড় উঠে গেলে ওষুধের দাম বাড়ার আশঙ্কা ছিল। এইডসের চিকিৎসায় ব্যবহৃত কয়েকটি ওষুধ এবং ইনসুলিনের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারত। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) আওতায় এলডিসি দেশগুলোর জন্য মেধাস্বত্বসংক্রান্ত যে বিশেষ সুবিধা আছে, তা ২০২৯ সাল পর্যন্ত বহাল থাকার পথ তৈরি হওয়ায় তিনি এটিকে ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখছেন। অন্তত আগামী ছয় বছর বাংলাদেশ এলডিসি হিসেবে পাওয়া বাজারসুবিধা ও অন্যান্য বিশেষ সুবিধা ধরে রাখতে পারবে বলে তাঁর আশা। তবে তাঁর সতর্কবার্তা, এরপর আর সময় বাড়ানো হবে—এমন ধরে নেওয়া উচিত নয়।

‘সংস্কারের চাপ কমে যাওয়ার শঙ্কা’

বাড়তি সময় পাওয়ার ফলে এলডিসি-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রস্তুতি কিছুটা শিথিল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে কি না—এমন প্রশ্নে জাহিদ হোসেন বলেন, এটিই তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, একদিকে বিদ্যমান সুবিধা বহাল থাকছে, অন্যদিকে সংস্কারের চাপও কিছুটা কমে যেতে পারে; তা হলে অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা থাকে।

তিনি জানান, এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জ ও করণীয় নিয়ে ২০১৮ সাল থেকেই ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। সরকার বিভিন্ন বিশ্লেষণ ও প্রতিবেদন তৈরি করেছে এবং মসৃণ উত্তরণ কৌশল (স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি) প্রণয়ন করেছে। অর্থাৎ কী করতে হবে, সে সম্পর্কে ধারণার ঘাটতি নেই। কিন্তু এত বছর আলোচনার পরও বাস্তবে কাজ হয়েছে খুব সামান্য। ২০১৮ সালে প্রথম সুপারিশের পরই মোটামুটি পরিষ্কার ছিল যে বাংলাদেশ দ্বিতীয়বার সুপারিশ পাবে এবং ২০২৪ সালে উত্তরণের পথে এগোবে; পরে কোভিডের কারণে সময় আরও দুই বছর বাড়ে। প্রায় আট বছর সময় পাওয়ার পরও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ঠিকভাবে নেওয়া যায়নি বলে তিনি মন্তব্য করেন। এখন প্রশ্ন হলো, আগামী ছয় বছরে অতীতে না করা কাজগুলো করা যাবে কি না।

বাস্তবায়ন পরিকল্পনার তাগিদ

বাড়তি সময় কাজে লাগাতে সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত—ইতিমধ্যে প্রণীত মসৃণ উত্তরণ কৌশলকে সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়ন পরিকল্পনায় রূপ দেওয়া। জাহিদ হোসেনের পরামর্শ, কে কোন কাজ করবে, কখন করবে এবং কীভাবে করবে—এসব স্পষ্ট করতে হবে। প্রতিটি সংস্কারের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা ও অগ্রগতি পরিমাপের সূচক থাকতে হবে; পাশাপাশি নিয়মিত তদারকি ও মূল্যায়নের ব্যবস্থাও করতে হবে।

তিনি উল্লেখ করেন, উত্তরণ-প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কমিটি বা জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) কাছে নিয়মিত অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। কাগজে-কলমে পরিকল্পনা তৈরি করেই যেন দায়িত্ব শেষ না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

একসময় এলডিসি-সংক্রান্ত বিশেষ সুবিধা এবং বিশেষ ও পৃথক আচরণের (স্পেশাল অ্যান্ড ডিফারেনশিয়াল ট্রিটমেন্ট) সুযোগ উঠে যাবে। তখন শুল্কনীতি ও ভর্তুকি নীতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ বাজারে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকারের সুবিধা হারানোর ঝুঁকিও আছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার জন্য নিজেদের সক্ষমতার ওপরই নির্ভর করতে হবে। এ জন্য লজিস্টিকস, ব্যাংকিং খাত, দক্ষ জনশক্তি, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর উন্নয়ন জরুরি বলে তিনি মনে করেন। গত আট বছরে যে কাজগুলো হওয়া উচিত ছিল, আগামী ছয় বছরে সেগুলো করতেই হবে; তবে অতীত অভিজ্ঞতা খুব বেশি আশাবাদী হওয়ার সুযোগ দেয় না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

ব্যবসায়ীদেরও দায়িত্ব

এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিতে সরকারের দায়িত্ব নিয়ে বেশি আলোচনা হলেও বেসরকারি খাত ও ব্যবসায়ীদেরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব আছে বলে জানান জাহিদ হোসেন। নিজেদের সক্ষমতা না বাড়িয়ে সব সময় সরকারের ওপর নির্ভরশীল থাকলে চলবে না। সরকারকে সব করতে হবে, সরকারকেই সব সমস্যার সমাধান দিতে হবে—এমন মনোভাব থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

তিনি বলেন, তৈরি পোশাক শিল্পে বাংলাদেশে পরিবেশবান্ধব বা গ্রিন ফ্যাক্টরির সংখ্যা প্রত্যাশার চেয়েও বেশি—এটি ইতিবাচক অর্জন। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার ধরন বদলাচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজম (সিবিএএম) চালু হওয়ায় উৎপাদনে কার্বন নিঃসরণের মাত্রা রপ্তানি বাণিজ্যে প্রভাব ফেলবে। এটি শুধু পরিবেশের বিষয় নয়, ব্যবসার প্রতিযোগিতা সক্ষমতার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।

আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে চাইলে কারখানাকে পরিবেশগত মানদণ্ডের পাশাপাশি শ্রম অধিকার, মানবাধিকার, কর্মপরিবেশ ও কারখানার নিরাপত্তার বিষয়ও নিশ্চিত করতে হবে। মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং বর্জ্য পরিশোধনাগারের (ইটিপি) কার্যকারিতাও গুরুত্বপূর্ণ। কার্বন ক্রেডিটের সুযোগ নিতে চাইলে কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারে অবস্থান ধরে রাখতে চাইলে এসব মানদণ্ড মেনে চলার সক্ষমতা ব্যবসায়ীদের নিজেদেরই তৈরি করতে হবে। সরকার কারিগরি সহায়তা দেবে, নীতিগত সহযোগিতা করবে ও প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি করবে; কিন্তু সব দায়িত্ব সরকারের ওপর ছেড়ে দিলে হবে না। ব্যবসায়ীদের বুঝতে হবে, এসব সংস্কার শেষ পর্যন্ত তাদের নিজেদের ব্যবসার স্বার্থেই প্রয়োজন।

আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে হলে উৎপাদনব্যবস্থা ও ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনতে হবে কি না—এমন প্রশ্নে তাঁর উত্তর, অবশ্যই। এখন শুধু পণ্যের দাম বা উৎপাদন খরচ দিয়ে প্রতিযোগিতা করা সম্ভব নয়; উৎপাদনপ্রক্রিয়া কতটা পরিবেশবান্ধব, শ্রমিকদের অধিকার কতটা সুরক্ষিত ও কর্মপরিবেশ কতটা নিরাপদ—এসবও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ। তাই কারখানার সংস্কার, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা, শ্রমিকের নিরাপত্তা, পরিবেশগত মানদণ্ড ও বর্জ্য পরিশোধনব্যবস্থার উন্নয়নে বিনিয়োগ করতে হবে। শুধু আর্থিক সহায়তা বা নীতিগত সুবিধা চাইলেই হবে না; নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ ব্যবসায়ীদেরই নিতে হবে। অন্যথায় শেষ পর্যন্ত তারাই আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বেন।

‘সাফল্যের সংজ্ঞা বদলাতে হবে’

বাড়তি সময় পাওয়াকে অনেকে সাফল্য হিসেবে দেখছেন—এ বিষয়ে জাহিদ হোসেন বলেন, এটি নির্ভর করে সাফল্যকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করা হচ্ছে তার ওপর। একদিক থেকে বলা যায়, বাংলাদেশ আরও কিছুদিন বাজারসুবিধা ও এলডিসি হিসেবে পাওয়া বিশেষ সুবিধা ধরে রাখতে পারছে; সেই বিবেচনায় এটি ইতিবাচক। তবে বাংলাদেশ আরও কিছু বছর এলডিসি হিসেবে থাকছেই—এটিকে কতটা সাফল্য বলা যায়, তা প্রশ্নসাপেক্ষ।

উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, কাউকে দরিদ্র বলা হলে তিনি অস্বীকার করেন; পরে তাকে দরিদ্র হিসেবেই স্বীকৃতি দেওয়া হলে এই স্বীকৃতি তাঁর জন্য কতটা আনন্দের হতে পারে—এই তুলনার মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, এলডিসি পরিচয় বহাল থাকা নিজেই অর্জন নয়। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে সুকুক বা সার্বভৌম বন্ড ইস্যু করার মতো বিষয় নিয়েও আলোচনা চলছে; আন্তর্জাতিক রেটিং এজেন্সিগুলো যখন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও সম্ভাবনা মূল্যায়ন করবে, তখন উন্নয়ন-অগ্রগতির পাশাপাশি এলডিসি পরিচয়টিও বিবেচনায় আসবে। তাই শুধু এলডিসি সুবিধা ধরে রাখাকে সাফল্য হিসেবে দেখলে হবে না; জাতীয় লক্ষ্য হওয়া উচিত উন্নয়নের সিঁড়ি বেয়ে আরও ওপরে ওঠা। এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির যে লক্ষ্যের কথা বলা হচ্ছে, তা অর্জনে অর্থনীতির মৌলিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এলডিসি উত্তরণ হওয়া উচিত বৃহত্তর উন্নয়নযাত্রার প্রথম ধাপ, চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়।

বাংলাদেশের জন্য প্রকৃত সাফল্য কী হবে—এমন প্রশ্নে জাহিদ হোসেন বলেন, বাড়তি সময় কাজে লাগিয়ে অর্থনীতির কাঠামোগত রূপান্তর ঘটানোই প্রকৃত সাফল্য। শুধু বাজারসুবিধা ধরে রাখা নয়, উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা শক্তিশালী করা, নীতিগত সংস্কার ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা তৈরি করাই হবে সাফল্যের মাপকাঠি। আরও ছয় বছর পরও যদি একই ধরনের প্রস্তুতির ঘাটতির কথা বলতে হয় এবং আবার সময় বাড়ানোর প্রয়োজন অনুভূত হয়, তাহলে সেটিকে কোনোভাবেই সাফল্য বলা যাবে না। বাড়তি সময়কে প্রস্তুতির সুযোগ হিসেবে নিতে হবে, কঠিন সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দেওয়ার অজুহাত হিসেবে নয়।

নীতিনির্ধারক ও ব্যবসায়ীদের প্রতি পরামর্শ

নীতিনির্ধারক ও ব্যবসায়ী সমাজের প্রতি তাঁর পরামর্শ স্পষ্ট—সংস্কার পিছিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই এবং বাংলাদেশকে অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি করা যাবে না। এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জ নিয়ে বহু বছর আলোচনা হয়েছে; কৌশলপত্র, প্রতিবেদন ও বিশ্লেষণ আছে। এখন প্রয়োজন সেগুলোর বাস্তবায়ন। সরকারকে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব বণ্টন, সময়সীমা নির্ধারণ এবং নিয়মিত অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। ব্যবসায়ীদের নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে চলতে হবে এবং বৈশ্বিক বাজারের পরিবর্তিত বাস্তবতার জন্য প্রস্তুত হতে হবে।

জাহিদ হোসেন বলেন, আগামী ছয় বছরকে অর্থনৈতিক রূপান্তরের সময় হিসেবে দেখতে হবে। চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত যত দিন সম্ভব এলডিসি সুবিধা ধরে রাখা নয়; বরং এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তোলা, যা এসব বিশেষ সুবিধা ছাড়াই আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে এবং সমৃদ্ধি অর্জন করতে সক্ষম।

Source: জাগো নিউজ২৪