‘জুলাই এখনো শেষ হয়নি’ প্রদর্শনীতে ৭ মার্চে শেখ মুজিবুর রহমানের দেওয়া ভাষণ রাখা হলেও ২৬ মার্চ শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের দেওয়া স্বাধীনতার ঘোষণা কেন নেই, তার কারণ জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। শনিবার (৮ আগস্ট) বিরোধীদলীয় নেতার রাজধানীর সরকারি বাসভবনে প্রদর্শনীটি ঘুরে দেখার পর সাংবাদিকদের তিনি বলেন, কর্তৃত্ববাদী ও ফ্যাসিবাদী শাসনের ধারাবাহিকতা দেখানোই এ আয়োজনের লক্ষ্য; জিয়াউর রহমান সে ধরনের শাসক ছিলেন না বলে তাঁর ভাষণ সেখানে রাখা হয়নি।
জামায়াত আমির বলেন, ইতিহাসে যাঁর যে কল্যাণকর ভূমিকা আছে, তার প্রতি তাঁরা শ্রদ্ধাশীল এবং এ বিষয়ে নির্মোহ ও বাস্তবসম্মত থাকার চেষ্টা করেছেন। স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘উনি তো অটোক্রেট শাসক ছিলেন না।’ তাঁর ব্যাখ্যা, প্রদর্শনীতে কর্তৃত্ববাদী ও আগ্রাসী শাসকদের যেমন দেখানো হয়েছে, তেমনি যাঁরা মুক্তি এনে দিয়েছেন ও যাঁদের ন্যায্য অবদান আছে, তাঁদের কথাও তথ্যচিত্রে এসেছে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সাড়ে ১৫ বছর নানাভাবে মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছে; আন্দোলনে তাঁরা বারবার প্রাণ দিয়েছেন, পঙ্গু হয়েছেন, কারাগারে গেছেন, মামলার বোঝা বয়েছেন, তবু সেই শাসনের অবসান হয়নি। তাঁর বর্ণনায়, ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের ওপর হামলার পর মায়েরাও রাস্তায় নামেন এবং আন্দোলন আরও ছড়িয়ে পড়ে; রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ ১৬ জুলাই নিহত হলে নতুন করে প্রাণহানি শুরু হয়। ওই সময় ঢাকায় দুজন ও চট্টগ্রামে তিনজনের মৃত্যু হয় এবং ১৮ জুলাই থেকে একের পর এক হত্যাকাণ্ড চলতে থাকে বলে জানান তিনি।
জামায়াত আমিরের দাবি, ৩ আগস্ট সেনাবাহিনীর সাধারণ কর্মকর্তা ও জওয়ানেরা জনগণের ওপর আর অস্ত্র না তোলার অবস্থান নিলেও শেখ হাসিনা পিছু হটেননি; বাহিনীপ্রধানদের তিনি ধমক দিয়েছেন, গালাগাল করেছেন। তাঁর ভাষ্য, যত লাশই পড়ুক আন্দোলনকারীদের ঘরে ফেরাতে শেখ হাসিনা নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে শোনা যায়, কিন্তু বাহিনীপ্রধানেরা তাতে সায় দেননি। ৩ ও ৪ আগস্ট ব্যাপক হত্যাকাণ্ড চলেছে এবং ইন্টারনেট বন্ধ রেখে লাশ গুম করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
পরে সাময়িক শূন্যতা পূরণে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হলেও এর অনেক উপদেষ্টা নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেননি বলে মন্তব্য করেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ঐকমত্য কমিশনে কয়েক মাস ধরে আলোচনার পর একটি সনদ তৈরি হয়; ছোটখাটো বিষয়ে ৩১টি দল একমত হলেও স্বার্থের প্রশ্নে মতভেদ দেখা দেয়, যার বড় অংশ বর্তমান সরকারি দলের দিক থেকে এসেছে বলে তাঁর দাবি। বিচারপতি নিয়োগ ও নির্বাচন কমিশন গঠন দলীয় কর্তৃত্বের বাইরে নির্দলীয় কমিশনের মাধ্যমে হওয়া উচিত, এমন অবস্থানসহ জামায়াতের ভিন্নমতগুলো দলের নয়, জনগণের সুরক্ষার জন্য ছিল বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, সংস্কার প্রস্তাবের বৈধতা দিতে সংস্কার পরিষদ বা গণপরিষদ দরকার, এ নিয়ে দলগুলো একমত হয়েছিল; এনসিপি চেয়েছিল গণপরিষদ, বিএনপি দিয়েছিল গণভোটের প্রস্তাব, আর গণভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ হ্যাঁ বললে সবাই সেই রায় মানতে বাধ্য থাকবে বলেও জানানো হয়েছিল। তাঁর অভিযোগ, নির্বাচনের পর সরকার গঠন করে তারা আগের অবস্থান থেকে সরে এসেছে, দুটি শপথ নেওয়ার কথা থাকলেও নেওয়া হয়েছে একটি, আর পুরোনো বন্দোবস্তের মতোই দুর্নীতি ও দলীয়করণ চলছে। এত মানুষের আহত ও পঙ্গু হওয়ার পর একই ধাঁচের এক দলের জায়গায় আরেক দলকে বসানোই কি উদ্দেশ্য ছিল, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সংসদে সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি তুলেও প্রতিকার মেলেনি, তাই তাঁরা রাজপথে নেমে জনগণের মুখোমুখি হয়েছেন এবং জনগণকে সঙ্গে নিয়ে অধিকার আদায়ের আন্দোলন চলবে। প্রদর্শনীটি কোনো সরকারের সাফল্য দেখানোর আয়োজন নয় জানিয়ে তিনি বলেন, যুগে যুগে ফ্যাসিবাদী, স্বৈরাচারী ও কর্তৃত্ববাদী শাসনে মানুষ কীভাবে নিপীড়িত হয়েছে এবং শহীদ ও শহীদ পরিবারের প্রত্যাশা কী, তা এখানে তুলে ধরা হয়েছে। তাঁর মতে, জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা এখনো পূরণ হয়নি; জনগণের অধিকার নিশ্চিত হলেই প্রকৃত অর্থে জুলাই শেষ হবে।






