দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হচ্ছেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দলের উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। তাদের ভাষ্য, বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সিদ্ধান্তটি চূড়ান্ত করে ফেলেছেন এবং বুধবার (১২ আগস্ট) বিকেলে নয়াপল্টন বা গুলশান কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন ডেকে নামটি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে। ইসির তপশিল অনুযায়ী বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার কথা।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, মনোনয়নপত্রে প্রার্থীর যে সম্মতিসূচক সই লাগে, মির্জা ফখরুল তা এরই মধ্যে দিয়েছেন এবং ইসি থেকে দলের পক্ষে দুটি মনোনয়নপত্রও তোলা হয়েছে; যদিও বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলেনি, মির্জা ফখরুল নিজেও মন্তব্য করতে রাজি হননি। চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, দুটি ফরম সংগ্রহের পর প্রস্তুতি ধাপে ধাপে এগোচ্ছে; বুধবার প্রার্থী ঘোষণার পর বাকি আনুষ্ঠানিকতা সেরে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই কমিশনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হবে। প্রার্থী ঘিরে বিএনপিতে এখন শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা, রাজনৈতিক অঙ্গনেও চলছে জোর আলোচনা।

এদিকে ইসি সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) জানান, ২০ আগস্ট বেলা ২টা থেকে ৫টা পর্যন্ত বিরতি ছাড়াই সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে ভোট নেওয়া হবে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন-১৯৯১ অনুযায়ী স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে সেদিন ওই সময়ে সংসদ কক্ষে সংসদ সদস্যদের বৈঠক ডেকে প্রজ্ঞাপন জারি করেছেন এ নির্বাচনের নির্বাচনি কর্তা, প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন; ভোট দেবেন ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য। সরকারি দল ও ১১ দলীয় ঐক্য, দুই পক্ষই এরই মধ্যে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছে।

প্রেক্ষাপট হলো, দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে ২৪ জুলাই পদত্যাগ করেন এবং ৬ আগস্ট ইসি তপশিল ঘোষণা করে। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য তাদের জোটের প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত করেছে এলডিপি চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে; ফলে বৈধ প্রার্থী একজনের বেশি থাকলে ৩৫ বছরের মাথায় দ্বিতীয়বারের মতো রাষ্ট্রপতি পদে ভোটাভুটি হবে। সাধারণত সংসদ সদস্যদের ভোটে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী জয়ী হন এবং বিরোধী দল প্রার্থী না দেওয়ায় ভোটের দরকার পড়ে না; ইসি সূত্রের তথ্য, একটিতে ভুল থাকলে অন্যটি বিবেচনার সুযোগ রাখতে একই ব্যক্তির নামে দুটি মনোনয়নপত্র জমার বিধান আছে, বিদায়ী রাষ্ট্রপতির নির্বাচনেও তা-ই করা হয়েছিল।

মির্জা ফখরুল বর্তমানে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের সংসদ সদস্য; দলের মহাসচিবের পাশাপাশি তিনি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রীর দায়িত্বেও আছেন। তাই তিনি রাষ্ট্রপতি হলে মহাসচিব পদ, মন্ত্রণালয় এবং সংসদীয় আসন, তিনটিই শূন্য হবে, আর উত্তরসূরি কে হবেন, তা নিয়ে চলছে নানা আলোচনা। দলীয় নেতা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চার দশকের বেশি সময় রাজপথের আন্দোলনে ভূমিকা এবং ২০১১ সালে ভারপ্রাপ্ত ও ২০১৬ সালে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব হয়ে প্রতিকূল সময়ে দল সামলানোর স্বীকৃতি হিসেবেই তাঁকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মানের পদে আনা হচ্ছে; সরকারি কলেজে বিসিএস ক্যাডারের শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন তিনি।

আলোচনা আছে, এমন পরিস্থিতিতে স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্তে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হতে পারেন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, যিনি এখন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা। ডিসেম্বরের মধ্যে দলের সপ্তম জাতীয় কাউন্সিল করার পরিকল্পনা বিএনপি আগেই জানিয়েছে, ফলে কাউন্সিল পর্যন্ত তিনিই ওই দায়িত্ব সামলাবেন বলে ধারণা। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে সাধারণত দলের মহাসচিবকেই বসানোর রেওয়াজ থাকায় রিজভী মন্ত্রীর দায়িত্বও পেতে পারেন বলে অনেকে মনে করছেন, যদিও নতুন মুখ আসার সম্ভাবনাও আলোচনায় আছে।

মঙ্গলবার ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে সংসদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রস্তুতি সভা শেষে চিফ হুইপ জানিয়েছিলেন, প্রার্থী তখনো চূড়ান্ত হয়নি, প্রধানমন্ত্রীই নাম ঘোষণা করবেন; সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধিত না হওয়ায় দলের সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিলে সদস্যপদ বাতিল হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি। বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় মেনে ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কারের পর এ নির্বাচন হলে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি আরও সম্মানিত ও গ্রহণযোগ্য হতেন, তবু ভোট যাতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় না যায়, সে জন্যই তাঁরা প্রার্থী দিয়েছেন। এদিকে সংসদ সচিবালয় জানিয়েছে, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ ২৭ আগস্ট বিকেল ৩টায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন ডেকেছেন, যাতে কয়েকটি বিল পাসের কথা রয়েছে।