বিএনপি সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাস পূর্ণ হলো সোমবার (১৭ আগস্ট)। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বড় জয়ের পর গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিকেলে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় দলটির মন্ত্রিসভা শপথ নেয়, তখন অর্থনীতির পুনর্গঠন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও জ্বালানি সংকট সামাল দেওয়া ছিল সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। রাজনৈতিক উত্তেজনা ও প্রশাসনিক জটিলতা সত্ত্বেও এ সময়ে ইশতেহারের সিংহভাগ প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়েছে এবং সার্বিক বিচারে সাফল্যের পাল্লাই ভারী বলে দাবি করছেন সরকারসংশ্লিষ্টরা।

দীর্ঘ ১৭ বছর পর গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে বিএনপি এককভাবে ২১৩টি আসনে জয় পায়, আর ৬৮টি আসন নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী; বাকি আসন যায় বিভিন্ন জোট, দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর ঘরে। প্রধানমন্ত্রীসহ ৫০ সদস্যের মন্ত্রিসভায় ২৪ জন প্রতিমন্ত্রীর সবাই এবং পূর্ণ মন্ত্রীদের মধ্যে ১৬ জন একেবারে নতুন মুখ, আর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে দুই দশক পর ক্ষমতায় ফিরেছে দলটি। রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপি সম্প্রতি মনোনয়ন দিয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে; তিনি নির্বাচিত হলে মন্ত্রণালয় ছাড়তে হবে বলে নতুন মুখ যুক্ত হয়ে মন্ত্রিসভার আকার আবার বাড়তে পারে বলে আলোচনা রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করে নিরাপদ, মানবিক ও সাম্যের এক অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়তে সরকার বদ্ধপরিকর। রোববার (১৬ আগস্ট) সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন পর জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার দেশ চালাচ্ছে এবং প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সর্বোচ্চ জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতের চেষ্টা চলছে। তার দাবি, প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকেই সুদসহ সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফের সিদ্ধান্ত হয়, যার সুফল পেয়েছেন প্রায় ১৩ লাখ প্রান্তিক কৃষক, আর প্রথম বাজেটে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি নির্দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় ৬০টির বেশি পণ্যে ভ্যাট-ট্যাক্স কমানো হয়েছে।

জ্বালানি পরিস্থিতি প্রসঙ্গে মাহদী আমিন বলেন, বৈশ্বিক যুদ্ধের চাপ সত্ত্বেও তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং সর্বশেষ মূল্যবৃদ্ধিও ছিল পরিমিত, তবে সম্প্রতি একটি এফএসআরইউ বিকল হওয়ায় জ্বালানির গভীর সংকট দেখা দিয়েছে, যার জন্য প্রধানমন্ত্রীসহ সবাই দুঃখিত। তিনি জানান, পেট্রোনাসের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ২৫টি শীর্ষ কোম্পানির ৫০ জন শীর্ষ কর্মকর্তা দেশে এসে বিদ্যুৎ-গ্যাস খাতে দ্রুত কাজ শুরুর বিষয়ে আলোচনা করেছেন এবং দেশের ভেতরের খনিজ উত্তোলন নিয়েও আলোচনা চলছে। চ্যালেঞ্জ যে অনেক তা স্বীকার করে তিনি বলেন, প্রথম সংসদ অধিবেশনে স্বল্প সময়ে শতাধিক অধ্যাদেশকে আইনে রূপ দেওয়া হয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফর আর তিস্তা মহাপরিকল্পনার চুক্তি সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে।

সরকারের দায়িত্বশীল সূত্রগুলোর দাবি, প্রধানমন্ত্রীর ২১-২২ জুনের মালয়েশিয়া ও ২৪-২৬ জুনের চীন সফর এ সময়ের বড় অর্জন; চীন সফরে ২০টির বেশি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে এবং মালয়েশিয়া চলতি আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য শ্রমবাজার আবার খুলে দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে সভাপতি পদে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্বাচিত হওয়া, যা প্রায় চার দশক পর ঘটল, সেটিকেও তারা আন্তর্জাতিক মর্যাদা বাড়ার উদাহরণ হিসেবে দেখাচ্ছেন। তাদের হিসাবে সরকারি গুদামে এখন ২৪ লাখ টনের বেশি খাদ্যশস্য মজুত, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ এবং যার মধ্যে প্রায় ১৯ লাখ ৬০ হাজার ৭৪৬ টন চাল ও প্রায় ২ লাখ ৯৫ হাজার ৬৮৯ টন গম; পাশাপাশি প্রায় ১ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য ধরে ২০২৬-২০৩১ মেয়াদের জন্য পাঁচ বছরের কৌশলগত পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ হিসেবে প্রবীণ, প্রবাসী, শিক্ষার্থী, নারী, কৃষক, ক্রীড়াবিদ ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ডসহ বিশেষ কার্ড ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, ১৫ টাকা কেজি দরে খাদ্য সহায়তা, ধর্মীয় ব্যক্তিদের ভাতা এবং তরুণ ও নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও স্টার্টআপ তহবিলের কথা বলা হচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দরে স্বয়ংক্রিয় কার্গো রিলিজ, ঢাকায় বৈদ্যুতিক বাস ও এআই-নির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর কর্মসূচি ও রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের কথাও জানানো হয়েছে; নতুন ব্যবসা চালুর প্রক্রিয়া এক বছরের বদলে ১৪ দিনে নামিয়ে আনা হয়েছে এবং ত্রয়োদশ সংসদ ৫২টি কার্যদিবসে মোট ১০৫টি বিল পাস করেছে। কৃচ্ছ্রসাধনের অংশ হিসেবে সরকারি অনুষ্ঠানে নেতাদের ছবি টানানো, ভিআইপি চেয়ার ও ব্যক্তিবন্দনার রীতি বাদ দেওয়া হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী সরকারি গাড়ির বদলে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করে জ্বালানি, চালক ও বাসভবনের কর্মীদের খরচ নিজে বহন করছেন এবং ১ লাখ ১৫ হাজার টাকার মাসিক মূল বেতনের ১০ শতাংশ, অর্থাৎ ১১ হাজার ৫০০ টাকা, প্রতি মাসে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিচ্ছেন।

নিরাপত্তা খাতে সংশ্লিষ্টরা ৪৫ বছর পলাতক থাকা মোজাফফর হোসেনের গ্রেপ্তারকে বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছেন, যাকে তারা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকারী হিসেবে বর্ণনা করেন; জঙ্গল সলিমপুরে নিয়ন্ত্রণ নেওয়া ও সীমান্তে পুশইন ঠেকাতে বিজিবির নজরদারি জোরদারের কথাও বলা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর ছবি সরকারি অনুষ্ঠানের ব্যানার-ফেস্টুনে ব্যবহার না করার সিদ্ধান্তকে বড় রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখছেন প্রকৌশলী আশরাফ উদ্দিন বকুল, যিনি নরসিংদী-৫ আসনের সংসদ সদস্য; তার মতে, এতে ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রচারের বদলে রাষ্ট্রের কাজ ও জনস্বার্থ সামনে আসছে। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং জানিয়েছে, ছয় মাসের কার্যক্রম তুলে ধরতে সোমবার দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন হবে এবং প্রেস উইংয়ের একটি ওয়েবসাইট উদ্বোধন করে সেখানে ই-বুক দেওয়া হবে, আর পিআইডির উদ্যোগে একটি পুস্তিকা তৈরির কথা জানিয়েছেন সরকারের প্রধান তথ্য অফিসার সৈয়দ আবদাল আহমদ।