ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার প্রথম ছয় মাসে মোটাদাগে ব্যর্থ হয়েছে এবং ফ্যাসিস্ট সরকারের দেখানো পথেই হাঁটছে বলে অভিযোগ তুলেছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) বিকেল ৪টায় রাজধানীর মগবাজারের আল-ফালাহ মিলনায়তনে সরকারের ছয় মাসের কাজের মূল্যায়ন তুলে ধরতে ডাকা সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, পুরো মেয়াদ না গেলে পূর্ণ মূল্যায়ন হয় না, তবে ছয় মাসও কম সময় নয়। তার ভাষায়, ‘এই ছয় মাসের মূল্যায়নে আমরা বলতে পারি, সরকার মোটাদাগে ব্যর্থ।’
ভোটের আগে বিভিন্ন জনসভায় বিএনপি প্রচলিত কাঠামোর সংস্কার ও জুলাই সনদভিত্তিক গণভোটের রায় কার্যকরের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু ক্ষমতায় এসে তা বাস্তবায়ন না করে বরং নেতিবাচক অবস্থান নিয়েছে বলে অভিযোগ করেন গোলাম পরওয়ার; সংসদের প্রথম অধিবেশনে দলটির ভূমিকা দেশবাসীকে বিস্মিত করেছে বলেও মত দেন তিনি। তার ভাষ্য, ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের দিনেই গণভোট হয়েছে, কিন্তু বিএনপি কেবল সংসদ সদস্যের শপথ নিয়েছে, সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেয়নি; অথচ জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দল দুটি শপথই নিয়েছে। সংস্কার পরিষদ সংবিধানে নেই—বিএনপির এমন যুক্তির জবাবে তিনি প্রশ্ন রাখেন, গণভোট অবৈধ হলে গণভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারের শপথ বৈধ হয় কীভাবে; গণরায় না মানাকে সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা ও জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসভঙ্গ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
প্রশাসনে দলীয়করণের অভিযোগ তুলে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, সরকারের নিজেদের লোক মনে না হওয়া সৎ কর্মকর্তাদের বদলি ও ওএসডি করা হচ্ছে, জেলা-উপজেলা থেকে শুরু করে বিএনপি নেতাদের বসানো হচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে এবং উপাচার্য নিয়োগেও দলীয় বিবেচনা প্রাধান্য পাচ্ছে; ক্ষমতায় থাকলে নিজেদের লোকই থাকবে—বিএনপি মহাসচিবের এমন বক্তব্যের উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, ১১ দলকে যারা যত বেশি গালাগাল করছে, তাদেরই পদোন্নতি হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির প্রসঙ্গে তিনি জানান, ১৮০ দিনের প্রথম ১১০ দিনেই ৬০৫টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, আর চুরি, ডাকাতি, অপহরণ, ধর্ষণ এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাও বাড়ছে। ক্যাম্পাস প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জুলাইয়ের পর বিশ্ববিদ্যালয়ে আর রক্ত ঝরবে না বলে তাদের আশা ছিল, কিন্তু জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও আলিয়া মাদরাসাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ছাত্রদলের হামলা হয়েছে এবং কোথাও কোথাও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও প্রকাশ্যে ছাত্রদল ও বিএনপিকে সহযোগিতা করছে।
জ্বালানি খাতে ব্যর্থতার উদাহরণ টেনে গোলাম পরওয়ার জানান, চট্টগ্রামের মহেশখালী ও পটুয়াখালীর পায়রায় টার্মিনাল নির্মাণের অগ্রগতি সম্পর্কে মানুষ স্পষ্ট কিছু জানে না, আর খুলনার খালিশপুরে নির্মিত রূপসা ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র এখনো বাণিজ্যিক উৎপাদনে আসেনি এবং গ্যাসের দৈনিক ঘাটতি প্রায় এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। এ সমস্যা সমাধানে জামায়াতের দেওয়া সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবও সরকার ঠিকমতো কার্যকর করেনি বলে অভিযোগ করেন তিনি। পররাষ্ট্রনীতিতেও সরকার ব্যর্থ উল্লেখ করে তিনি বলেন, শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত আনা, ওসমান হাদি হত্যায় জড়িতদের ফিরিয়ে আনা কিংবা রোহিঙ্গা সংকট সামলানো—কোনো ক্ষেত্রেই সরকার প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখেনি, উপরন্তু সীমান্তে হত্যা ও পুশইনও ঘটেছে।
দ্রব্যমূল্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাজারে এখনো স্বস্তি ফেরেনি এবং অনেক নিত্যপণ্য নিম্ন ও মধ্যবিত্তের সাধ্যের বাইরে চলে গেছে; খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের পরিস্থিতি এবং ইসলামী ব্যাংকসহ ব্যাংক খাতে সরকারি হস্তক্ষেপ নিয়েও উদ্বেগ জানান তিনি। গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল এবং গুম কমিশনের কাজ নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, জুলাই-পরবর্তী সময়ে এমন গুরুতর মানবাধিকার ইস্যুতে কার্যকর পদক্ষেপ দরকার ছিল। কৃষকেরা ধানের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না, অথচ সার ও কৃষি উপকরণের দাম বেড়েছে উল্লেখ করে তিনি সতর্ক করেন, সার সংকট দেখা দিলে অস্থিরতা বাড়তে পারে; পাশাপাশি ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের সুবিধা দলীয় লোকজন ও সিন্ডিকেট লুটে নিচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের নির্বাচনে অংশ নিতে না দেওয়ার প্রস্তাব এবং এনটিআরসির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের বিপক্ষে অবস্থান জানিয়ে তার দাবি, শিক্ষকদের রাজনৈতিক অধিকার হরণের এ চেষ্টা সরাসরি সংবিধানবিরোধী; নবম পে-স্কেল নিয়ে সরকারের দীর্ঘসূত্রতারও সমালোচনা করেন তিনি। স্বাস্থ্য খাতে নৈরাজ্য চলছে অভিযোগ করে তিনি মন্ত্রণালয়ের অসংগতিপূর্ণ সিদ্ধান্ত এবং চিকিৎসক ও সরঞ্জামের ঘাটতির কথা তোলেন, আর হামসহ নানা রোগে মৃত্যুর দায় আগের সরকারের ওপর চাপিয়ে বর্তমান সরকার দায় এড়াতে চাইছে বলে দাবি করেন। বিরোধী এমপিদের এলাকায় উন্নয়নকাজে হস্তক্ষেপ, সংরক্ষিত নারী আসনের এক অনির্বাচিত সদস্যকে দিয়ে তাদের ওপর প্রভাব খাটানোর চেষ্টা, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বাতিল করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করা, বিচারপতি নিয়োগে অস্বচ্ছতা এবং আওয়ামী লীগ আমলের কর্মকর্তাদের প্রশ্রয় দিয়ে দলটির রাজনীতি পুনর্বাসনের ষড়যন্ত্রের অভিযোগও তোলেন জামায়াতের এই নেতা।
তবে সরকারের কিছু পদক্ষেপকে ইতিবাচকভাবেও দেখছে জামায়াত। গোলাম পরওয়ার বলেন, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের কারণেই বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিছুটা ভালো অবস্থায় আছে, তাই এর কৃতিত্ব সরকারের নয়, রেমিট্যান্সযোদ্ধা প্রবাসীদের; জ্বালানি সংকট সামলাতে সরকারের কমিটি গঠনকে তিনি ইতিবাচক বললেও এতে বিরোধী দলের প্রস্তাবের ভূমিকা ছিল বলে দাবি করেন। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, দলীয়করণ বন্ধ, ব্যাংক খাতের সংকট সমাধান, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষি ও জ্বালানিতে স্থিতিশীলতা ফেরানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, তারা সরকারের ব্যর্থতা চান না, ভালো কাজে সহযোগিতা ও মন্দ কাজের বিরোধিতা করবেন; হরতাল বা ভাঙচুরের পথে না গিয়ে সংসদে ও সংসদের বাইরে প্রস্তাব, পরামর্শ ও গঠনমূলক সমালোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন বলেও জানান তিনি।






