প্রতিষ্ঠার পর ৪৮ বছরে বিএনপি তিন প্রজন্মের নেতৃত্ব দেখেছে: শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দল গড়েন, তার মৃত্যুর পর ৪১ বছরের বেশি সময় চেয়ারপারসন হিসেবে দল চালান বেগম খালেদা জিয়া, আর এখন নেতৃত্বে তাদের ছেলে তারেক রহমান। ক্ষমতায় আসার পর এটিই প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী; এই মুহূর্তে নতুন নেতৃত্ব তৈরি, তরুণদের রাজনীতিতে যুক্ত করা, সংগঠনে গতি আনা এবং সরকারের নানা সংকট সামলে মানুষের আস্থা ধরে রাখাই তার সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ। বাবা-মায়ের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ধরে রেখে তিনি কতটা নতুন বিএনপি গড়তে পারবেন, তা নিয়েই এখন রাজনৈতিক মহলে আলোচনা।

দলের একাধিক নীতিনির্ধারক বলছেন, ৪৮ বছরে বহু সংকটে পড়েও বারবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে বিএনপি, আর নেতাকর্মীদের জন্য এটাই সবচেয়ে ভালো সময়। ২০০১ সালের পর এবার চতুর্থবারের মতো রাষ্ট্র পরিচালনায় এসেছে দলটি, চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে জিতেছে বিপুল আসনে; ক্ষমতা গ্রহণের ছয় মাস পর প্রথম বার্ষিকী ঘিরে তাই বাড়তি উচ্ছ্বাসও আছে। তবে এই সুসময় যেন দুঃসময়ে না গড়ায় এবং জনপ্রিয়তা আরও বাড়ে, সেটিই এখন প্রধান লক্ষ্য বলে জানান তারা, কারণ সরকারের সামনে বেশ কিছু কঠিন পরীক্ষা অপেক্ষা করছে।

খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর এটিই দলের প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। নেতাকর্মীরা বলছেন, এমন দিবসে নেত্রীকে সঙ্গে নিয়ে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও জিয়ার মাজারে ফাতেহা পাঠ ছিল তাদের প্রেরণার উৎস, এবার তার অনুপস্থিতি বেদনাদায়ক; তবে উত্তরসূরি তারেক রহমানও জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার মতো সাধারণ জীবন যাপন করায় তার জনপ্রিয়তা বাড়ছে এবং তরুণেরা দলের দিকে ঝুঁকছেন বলে তাদের দাবি। স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, জিয়াউর রহমানের আমলের মতো এখনো অনেক মেধাবী তরুণ রাজনীতিতে আসছেন, আর তারেক রহমানের হাত ধরে সামনে এ ধারা আরও বাড়বে বলে তিনি আশা করেন।

সরকার গঠনের ছয় মাসের মধ্যেই কঠিন সংকটে পড়েছে বিএনপি এবং দলটির নেতৃত্বাধীন সরকার। তেল-গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, আইনশৃঙ্খলা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আওয়ামী লীগ আমলের গুম-খুনের অভিযোগ ও চব্বিশের হত্যাকাণ্ডের বিচার, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, সংবিধান সংশোধন এবং বিরোধী দলের আন্দোলন এখন দলটির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। এগুলো সামলে দলের ভাবমূর্তি ও জনপ্রিয়তা অটুট রাখা বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রীর জন্য আরেক বড় পরীক্ষা।

১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর জিয়াউর রহমানের হাতে বিএনপির যাত্রা শুরু; জিয়া হত্যাকাণ্ড, এরশাদবিরোধী আন্দোলন, কয়েক দফা ক্ষমতায় যাওয়া ও ওয়ান-ইলেভেনের মতো পর্ব পেরিয়ে দলকে এগিয়ে নেন খালেদা জিয়া, যিনি ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিয়ে ১৯৮৪ সালে চেয়ারপারসন হন এবং ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর মারা যান। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়ার কারাগারে যাওয়ার দিনই তারেক রহমানকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করা হয়, লন্ডন থেকে ভার্চুয়াল সভায় তিনি দলের বেশির ভাগ সিদ্ধান্ত দেন; চলতি বছরের ৯ জানুয়ারি ভারপ্রাপ্ত পদ থেকে মুক্ত হলে স্থায়ী কমিটির বৈঠকে তাকে চেয়ারম্যান ঘোষণা করা হয়। ২০০৭ সালে সেনা-সমর্থিত ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময় গ্রেপ্তার হওয়া তারেক রহমান ২০০৮ সালে চিকিৎসার জন্য সপরিবারে লন্ডনে যান এবং ১৭ বছর পর ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন।

বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, দলের ৩১ দফা, জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা আর খালেদা জিয়ার ভিশন-২০৩০ মিলিয়েই আগামী দিনের কর্মপরিকল্পনা সাজানো হয়েছে এবং নির্বাচনি ইশতেহারের মধ্য দিয়ে তা বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। তার মতে, আগের সরকারের ব্যর্থতার কিছু জের এখনো থাকায় প্রত্যাশামতো গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ সব সময় সম্ভব হচ্ছে না, তাই এসব দিকে আরও নজর দিতে হবে।

আলালের ভাষ্য, গণতন্ত্রের প্রশ্নে আপস না করা খালেদা জিয়ার দৃঢ়তা এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাহসী নেতৃত্ব ও পরিশ্রমকে সামনে রেখে বিএনপিকে এগোতে হবে, শুধু স্লোগান নয়, কাজ দিয়ে তা প্রমাণ করতে হবে। তরুণদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তারেক রহমান কেবল দলকে ব্যবহার না করে সরকারের অগ্রাধিকারের মধ্য দিয়েও মেধাবী তরুণদের খুঁজছেন, যার একটি উদাহরণ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় চালু হওয়া নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস। তবে দলের সাংগঠনিক কাঠামোর ভেতর দিয়ে তরুণদের টানার উদ্যোগ এখনো সেভাবে শুরু হয়নি বলে স্বীকার করেন তিনি।