কওমি ধারার সাতটি ইসলামী দলকে এক প্ল্যাটফর্মে আনার প্রক্রিয়ায় দলগুলোর প্রস্তাব মেলানোর একটি ধাপ পার হয়েছে। হেফাজতে ইসলামের গড়া একটি উপকমিটি সাত দলের আলাদা আলাদা প্রস্তাব পর্যালোচনা করে একটি ‘সমন্বিত রূপরেখা’ দাঁড় করিয়েছে, যা এখন দলগুলোর নেতাদের সামনে তোলার অপেক্ষায়। তবে ঐক্যের ধরন, কাঠামো এবং রাজনৈতিক সমন্বয়ের মাত্রা নিয়ে চূড়ান্ত মীমাংসা এখনো হয়নি।

হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি বশিরুল্লাহ বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) জানান, গত ১ সেপ্টেম্বর হাটহাজারী মাদ্রাসায় উপকমিটির বৈঠকে সাত দলের প্রস্তাব সমন্বয় করে রূপরেখাটি তৈরি করা হয়। তিনি বলেন, হেফাজতের মহাসচিব মাওলানা সাজিদুর রহমান এখন চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ডে আছেন; তিনি দেশে ফিরলে সাত দলের নেতাদের ডেকে রূপরেখাটি উপস্থাপন করা হবে। এরপর সব দল একসঙ্গে বসে ঐক্য প্রক্রিয়া নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে বলে জানান তিনি।

তবে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি দলের নেতারা জানিয়েছেন, উপকমিটির সর্বশেষ বৈঠক ও তার ফল সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানেন না তারা, যদিও ঐক্যের প্রশ্নে সবাই ইতিবাচক। খেলাফত মজলিসের দিক থেকে দলের নায়েবে আমির মাওলানা আহমদ আলী কাসেমী সংবাদমাধ্যমকে বলেন, বৈঠকের ফল তাদের জানা নেই; তারা একটি সুন্দর ও স্বতন্ত্র ঐক্য চান এবং প্রয়োজনে হেফাজত তাদের ডাকবে বলে আশা করেন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের পক্ষে দলের মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান জানান, তারা পরবর্তী পদক্ষেপের অপেক্ষায় আছেন এবং সমন্বয়কারীরা ইসলামী দলগুলোকে কাছাকাছি এনে একটি কার্যকর ঐক্য গড়বেন—এ ভরসা তাদের আছে।

জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরে দলটির মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী বলেন, প্রস্তাব জমা দিয়ে তারা এখন পরবর্তী ধাপের অপেক্ষায়; আহলু সুন্নাত ওয়াল জামাতের আদর্শে বিশ্বাসী হিসেবে তারা সবসময় ঐক্যের পক্ষে ছিলেন এবং থাকবেন। ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন রাজী জানান, উপকমিটির বৈঠক নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে তারা অবগত নন, তবে মৌলিক বিষয়ে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সবাই জোটবদ্ধ হবে—এমনটাই তাদের চাওয়া। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের হয়ে কথা বলেন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আতাউল্লাহ আমিন; তিনি জানান, বৈঠকের কথা তারাও আনুষ্ঠানিকভাবে জানেন না, তবে তারা এ ঐক্যের পক্ষে এবং হেফাজত নেতারা তাদের প্রস্তাব গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করবেন বলে আশা করেন।

সাত দলের প্রস্তাবে ঐক্যের প্রয়োজন নিয়ে বড় কোনো বিরোধ নেই, তবে এর ধরন, রাজনৈতিক কৌশল ও সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ে মত আলাদা। প্রস্তাব অনুযায়ী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ চায় রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে ঐক্য, জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে একসঙ্গে অংশগ্রহণ এবং অন্য কোনো পক্ষের সঙ্গে আলাদা সমঝোতা না করা; জমিয়ত জোর দিয়েছে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের নীতিতে অটল থাকা, আদর্শিক বিতর্ক এড়ানো ও একটি বিশেষ ফোরামের মাধ্যমে কাজ চালানোর ওপর। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস কওমিপন্থি সমমনা দলগুলোর ঐক্যের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সিদ্ধান্তে প্রতিটি দলের নিজস্ব এখতিয়ার চায় এবং বর্তমান ১১ দলীয় জোটে থাকাকে এ ঐক্যের পরিপন্থী মনে করে না; আতাউল্লাহ আমিনের মতে, অন্য জোটে থেকেও সমমনা ইসলামী দলগুলো ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে একসঙ্গে কাজ করতে পারে।

খেলাফত মজলিস চায়, নতুন ঐক্যের শরিক দলগুলো অন্য কোনো জোটে একসঙ্গে না থাকুক, তবে প্রত্যেক দল নিজের রাজনৈতিক কৌশল নিজেই ঠিক করবে। সমমনা দলগুলোর ধাঁচে ঐক্যের কথা বলেছে বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, সঙ্গে জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার প্রস্তাব দিয়েছে; আর বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন হেফাজতের তত্ত্বাবধানে কওমি স্বাতন্ত্র্য রেখে নতুন জোট, অন্য বড় দল বা জোটের সংস্রব ত্যাগ এবং পালাক্রমে নেতৃত্বের প্রস্তাব দিয়েছে, যেখানে সিদ্ধান্ত হবে সমন্বয় কমিটি বা মজলিসে শূরায়। আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকিদাকে ঐক্যের মূল ভিত্তি করতে চায় ইসলামী ঐক্যজোট, এবং এ আকিদা লঙ্ঘনকারীকে ঐক্যে না রাখার পক্ষে দলটি।

উদ্যোগটির সূচনা গত ১৬ জুলাই; সেদিন হেফাজতের আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সভাপতিত্বে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির জামেয়া আজিজুল উলুম বাবুনগরে সাত দলের শীর্ষ নেতাদের মতবিনিময় সভায় দলগুলো একসঙ্গে পথ চলতে নীতিগতভাবে একমত হয়। সাধারণ জোটের বাইরে ইসলামপন্থিদের একটি আলাদা প্ল্যাটফর্ম গড়াই ছিল মূল লক্ষ্য; দলগুলোকে ৩ আগস্টের মধ্যে রূপরেখা জমা দিতে বলা হয়, প্রায় সময়মতোই সাত দল প্রস্তাব দেয় এবং সেগুলো যাচাইয়ে সাত সদস্যের উপকমিটি গঠিত হয়। এখন যৌথ বৈঠকে ঐক্যের ধরন, সাংগঠনিক কাঠামো ও রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে দলগুলোর ভিন্ন অবস্থান কীভাবে মেলানো হয়, সেটিই মূল প্রশ্ন।