জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্য আরও তিন বিভাগে লংমার্চ কর্মসূচি নিচ্ছে। জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে এবার ঘোষিত চার বিভাগের কর্মসূচির সঙ্গে বরিশাল, রাজশাহী ও ময়মনসিংহ বিভাগ যুক্ত হচ্ছে; শরিক দলগুলোর মধ্যে এ নিয়ে আলোচনা চলছে এবং শিগগির দিনক্ষণ চূড়ান্ত করে জানানো হবে।

জোটের ঘোষিত ছয় দফা দাবির মধ্যে রয়েছে বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সারের সংকট দূর করা, জুলাই গণহত্যার বিচার, গণভোটে আসা গণরায়ের বাস্তবায়ন, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি, নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ। এসব দাবিতে ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চ এরই মধ্যে হয়ে গেছে; ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে রংপুর, ১০ অক্টোবর ঢাকা থেকে খুলনা ও ২৪ অক্টোবর ঢাকা থেকে সিলেট অভিমুখে লংমার্চের পর ১৪ নভেম্বর ঢাকায় মহাসমাবেশ হওয়ার কথা ছিল। জোট সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, দেশজুড়ে লংমার্চের সিদ্ধান্তের কারণে মহাসমাবেশের তারিখ বদলানোর সম্ভাবনাই বেশি; লংমার্চ শেষে ডিসেম্বরে ঢাকার মহাসমাবেশ থেকে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

জানা গেছে, প্রতিটি বিভাগে লংমার্চ শেষে দাবি মানতে সরকারকে নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেবে জোট; এর মধ্যে দাবি পূরণ না হলে চূড়ান্ত আন্দোলনে নামবে তারা, তখন কঠোর কর্মসূচিও আসতে পারে, যদিও পরিস্থিতি বিবেচনা করেই শেষ সিদ্ধান্ত হবে। চলতি বছরের শেষে বা আগামী বছরের শুরুতে কঠোর কর্মসূচি আসতে পারে, তবে তার আগে জুলাই সনদ নিয়ে সরকারের পদক্ষেপ ও অবস্থান বুঝে নিতে চায় জোট।

১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ অভিযোগ করেন, সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সরকার অগণতান্ত্রিকভাবে নানা বিল ও আইন পাস করিয়ে নিচ্ছে এবং বিরোধী দলের আপত্তি ও দাবি উপেক্ষা করছে; এভাবে চলতে থাকলে যেকোনো সময় যেকোনো সিদ্ধান্ত আসতে পারে। তিনি বলেন, বিরোধী দল নিয়মের মধ্যে থেকে ওয়াকআউট করছে, আর গণভোটের রায় বাস্তবায়ন সারা দেশের মানুষের দাবি; সরকার দাবি মানলে লংমার্চ থেমে যাবে, না মানলে বিকল্প পথের কথা ভাবতে হবে।

জোটের শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালালুদ্দীন আহমদ জানান, শুরুতে চার বিভাগে লংমার্চ শেষে ঢাকায় মহাসমাবেশের পরিকল্পনা থাকলেও আরও কয়েকটি বিভাগ বাদ পড়ে যাচ্ছে বলে মহাসমাবেশসহ লংমার্চের দিনক্ষণ নতুন করে ঠিক করা হবে। তিনি বলেন, তাঁরা রাজপথে আন্দোলনের পাশাপাশি সংসদেও কথা বলছেন; জুলাই সনদ ও গণভোট বাস্তবায়নে সরকারকে সময় বেঁধে দেওয়া হবে এবং এর মধ্যে দাবি না মানলে ১১ দলীয় ঐক্য চূড়ান্ত আন্দোলনে যাবে।

এর আগে ৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের লালদীঘি মাঠে লংমার্চ শেষের বক্তব্যে এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম সরকারকে সতর্ক করে বলেছিলেন, তাঁরা এখনো সংসদে থাকলেও আগামী অধিবেশনে যোগ দেবেন কি না নিশ্চিত নন; জনগণের সমস্যার সমাধান না এলে সংসদ সচল রেখে লাভ কী, সে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, তাঁরা ১৬ বছর অপেক্ষা করবেন না। এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার অভিযোগ করেন, সরকার সংসদে এককভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, গণবিরোধী গুম প্রতিরোধ ও মানবাধিকার আইন পাস করেছে এবং সাইবার আইন পাসের তোড়জোড় চালাচ্ছে, অথচ বিরোধী দলের যৌক্তিক দাবি আমলে নিচ্ছে না। তাঁর মতে, আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের কথা বলাটা সরকারের এক ধরনের ‘ট্র্যাপ’, যাতে বিরোধী দল মাঠে আন্দোলনে না নামে; অধিবেশন বর্জনের কথা উঠলেও এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি, পরিস্থিতি বুঝে তা নেওয়া হবে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৭৭টি আসন পেয়ে বিরোধী দলের আসনে বসেছে জামায়াত জোট, সংরক্ষিত আসনে তাদের আরও ১২ জন নারী সংসদ সদস্য রয়েছেন। সংসদে নজরদারি, প্রশ্ন তোলা ও সংসদীয় কমিটিতে সক্রিয় থাকার পাশাপাশি রাজপথের কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার কৌশল নিয়ে জোটে আলোচনা চলছে; তবে সংসদের ভেতরে থেকে চাপ তৈরি করা হবে, নাকি সংসদ ছেড়ে বাইরে থেকে চাপ বাড়ানো হবে—তা নিয়ে জোটের ভেতরে মতভেদ আছে।