আগামী প্রজন্মের নিরাপদ ও টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে বিশ্বনেতাদের একযোগে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুধবার বিকেলে (নিউইয়র্ক সময়) জাতিসংঘ সদর দপ্তরের ট্রাস্টিশিপ কাউন্সিলে মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের উদ্যোগে আয়োজিত ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন অ্যান্ড দ্য জাস্ট ট্রানজিশন’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের সভায় তিনি এ আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের ভাগ শূন্য দশমিক ৫ শতাংশেরও কম হলেও জলবায়ু পরিবর্তনে দেশটি বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি, আর এতে ক্ষতির পরিমাণ জিডিপির প্রায় ১ শতাংশের সমান।

চলতি বছরের বাজেটে অভিযোজন খাতে প্রায় ৩ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার রাখা হলেও আন্তর্জাতিক সহায়তা ছাড়া বড় ক্ষতির ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব নয় বলে জানান তিনি। এ প্রেক্ষাপটে তিনি পাঁচটি জরুরি পদক্ষেপের প্রস্তাব দেন: প্যারিস চুক্তির ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস সীমা ধরে রাখতে বিশ্বজুড়ে নিঃসরণ কমানো, ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অভিযোজনে পূর্বানুমেয় ও সুলভ অর্থের জোগান, জলবায়ু-স্মার্ট প্রযুক্তিতে বাড়তি প্রবেশাধিকারের মাধ্যমে ন্যায্য ও সমতাভিত্তিক উত্তরণ, সুলভ অর্থ, সক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার এবং ক্ষয়ক্ষতি ও লোকসান তহবিলের পূর্ণ বাস্তবায়নসহ এর নিয়মিত পুনঃপূরণ। জলবায়ু পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহায়ক অংশীদারত্বের প্রত্যাশার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী।

বৃহস্পতিবার সকালে কনফারেন্স রুম-৪-এ, জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিজনিত অস্তিত্বের সংকট নিয়ে আরেকটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী উপকূলীয় ও দ্বীপরাষ্ট্রসহ ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর বহুমাত্রিক হুমকির কথা তুলে ধরেন এবং সমন্বিত আন্তর্জাতিক উদ্যোগ, ন্যায়সংগত অর্থায়ন ও অভিযোজন সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন। বাংলাদেশকে সক্রিয় বদ্বীপ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠ ২৫ সেন্টিমিটার উঁচু হলে দেশের প্রায় ৪ শতাংশ ভূমি তলিয়ে যেতে পারে এবং প্রায় ১ কোটি মানুষের বসতি, জীবিকা ও মর্যাদা ঝুঁকিতে পড়বে। এ ঝুঁকি মোকাবিলায় আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা, ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি ও উপকূল সুরক্ষায় বিনিয়োগের পাশাপাশি আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী-খাল খনন, পদ্মা ব্যারাজ উদ্যোগ, মাস্টার প্ল্যানের আওতায় তিস্তা ব্যারাজ আধুনিকায়ন, ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ এবং নবায়নযোগ্য উৎস থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে অন্তত ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যের কথা জানান তিনি।

ইউএনজিএর ৮১তম অধিবেশনের ফাঁকে বুধবার দুপুরে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেই প্লেনকোভিচের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন তারেক রহমান। এ কে এম নাজমুল হক (প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব) জানান, বৈঠকে বাণিজ্য-বিনিয়োগ বাড়ানো, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও মজবুত করা এবং পারস্পরিক স্বার্থের নানা ক্ষেত্রে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়; প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তার কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিনের ভাষ্য অনুযায়ী অভিবাসনের বিষয়টিও আলোচনায় ছিল। একই দিন সকালে নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রীর আবাসস্থলে তার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন মার্ক সুজম্যান, যিনি গেটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও)।

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং জানায়, ওই বৈঠকে জনস্বাস্থ্য, শিশুস্বাস্থ্য, টিকাদান, সাশ্রয়ী টিকা, প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার আধুনিকায়ন নিয়ে বিস্তারিত কথা হয়। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে সেবার পরিধি বাড়ানো, এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ, প্রশিক্ষিত কর্মীদের বিদেশে কাজের সুযোগ তৈরি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর ডিজিটাল পাবলিক হেলথ কেয়ার সিস্টেম গড়ার পরিকল্পনাও আলোচনায় আসে। মাহদী আমিন জানান, কৃষি খাতে সহযোগিতা, কৃষকদের জন্য প্রযুক্তি, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং দেশে টিকা উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ার বিষয়েও কথা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলায় ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী; সাধারণ পরিষদে এটিই তার প্রথম ভাষণ, এবং এর মধ্য দিয়ে বাবা-মায়ের পর পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘের মঞ্চে বক্তব্য দিলেন তিনি। সাধারণ পরিষদ হলে বিকেলের অধিবেশনের ১৮ বক্তার মধ্যে ১১তম হিসেবে, নিউইয়র্ক সময় বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে বক্তব্য দেন তিনি। ভাষণে রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা, মানবিক বিষয় ও অর্থনৈতিক সহযোগিতাসহ বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গি ও অগ্রাধিকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরেন তিনি।

হায়াত গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল নিউইয়র্ক হোটেলের লবিতে বুধবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মাহদী আমিন জানান, সফরের দ্বিতীয় দিনে রোহিঙ্গা সংকট, স্বাস্থ্য, কৃষি, জলবায়ু পরিবর্তন, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী একাধিক বৈঠক করেন এবং ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গেও তার বৈঠক হয়। জাতিসংঘের সাইডলাইনে বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত রোহিঙ্গা বিষয়ক অনুষ্ঠানে মিয়ানমারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ও রোহিঙ্গা নিপীড়নের জবাবদিহির ওপর জোর দেওয়া হয় জানিয়ে তিনি বলেন, দেশে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা থাকলেও আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের ওপর চাপ বাড়ছে। প্রত্যাবাসনে চীন ও ভারতের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় দুই পর্যায়েই যোগাযোগ চলছে, গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন অংশীদার চীনের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে এবং মিয়ানমারসহ সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনার দরজা খোলা রাখা হয়েছে।