নিজেদের মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধ থাকলেও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের চেষ্টা ঠেকাতে একই সঙ্গে মাঠে থাকার প্রস্তুতি নিচ্ছে ক্ষমতাসীন বিএনপি ও বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী, আর সে লক্ষ্যে রাজধানীসহ সারা দেশে দুই দলই তৎপরতা বাড়াচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরে রাজপথের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখাই এখন দল দুটির প্রধান লক্ষ্য। তবে দুই দলেরই ধারণা, রাজনীতির আলোচনায় টিকে থাকতেই শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন।

দলগুলোর একাধিক সূত্রের মতে, বিএনপির সঙ্গে জামায়াত কিংবা ১১ দলীয় ঐক্যে থাকা জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দ্বন্দ্ব যত প্রকাশ্যই হোক, আওয়ামী লীগ প্রশ্নে সবাই এক অবস্থানে, কারণ আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে ফিরলে তিন দলেরই বিপদ হতে পারে বলে তারা মনে করে। নেতাকর্মীদের অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় প্রায়ই উঠে আসে, এমন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি বেকায়দায় পড়বে এনসিপি, তারপর জামায়াত, আর বিএনপিকেও আওয়ামী লীগ কোনো ছাড় দেবে না। ফলে চব্বিশের মতো এক অলিখিত সমীকরণে পুরো ডিসেম্বর রাজপথে সক্রিয় থাকার প্রস্তুতি নিচ্ছেন দলগুলোর নেতাকর্মীরা।

বিএনপির একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে দেশকে অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা ও ‘পরিকল্পিত সন্ত্রাস’-এর অভিযোগ এনে তা মোকাবিলায় রাজপথের কর্মসূচি জোরদারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলের হাইকমান্ড; ডিসেম্বর পর্যন্ত মিছিল, সভা-সমাবেশ, মানববন্ধন ও গণসংযোগ চালানো এবং কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সাংগঠনিক কাজ বাড়ানোর বার্তাও দেওয়া হয়েছে। নীতিনির্ধারণী ফোরামের কয়েকজন নেতার ভাষ্য, ঢাকার প্রতিটি এলাকা ছাড়াও সারা দেশের জেলা, থানা, উপজেলা ও ইউনিয়নে, সম্ভব হলে ওয়ার্ডেও, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোকে নিয়ে এ কর্মসূচি চলবে, তবে বিরোধী দলের গণতান্ত্রিক কোনো কর্মসূচিতে বাধা না দিতে হাইকমান্ডের নির্দেশ রয়েছে। ইতোমধ্যে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপি, দুই মহানগরের যুবদল এবং জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল রাজধানীতে অগ্নিসন্ত্রাসের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করেছে, সতর্কতা হিসেবে এলাকায় এলাকায় পাহারার মহড়াও শুরু হয়েছে, আর ছাত্রদল ও মহিলা দলসহ অন্য সংগঠনগুলো আলাদা সাংগঠনিক টিম গড়ে আগামী দুই-তিন মাসের জন্য বড় শোডাউনসহ নানা কর্মসূচি সাজাচ্ছে।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী সংবাদমাধ্যমকে বলেন, দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা আর পরিকল্পিত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অঙ্গসংগঠনগুলো প্রতিবাদ সমাবেশ করছে; এটি নির্দিষ্ট কোনো কর্মসূচি নয়, রাজনৈতিক কার্যক্রমেরই অংশ, আর তা ধারাবাহিকভাবে চলবে কি না, পরিস্থিতি দেখে ঠিক হবে। শেখ হাসিনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানে মানুষ হত্যার দায়ে আদালতের রায়ে তাঁর বিচার হয়েছে, দেশে ফিরলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিরোধী দল লংমার্চ করতেই পারে মন্তব্য করে রিজভী অভিযোগ করেন, অপপ্রচার ও উসকানিমূলক বক্তব্যের মাধ্যমে অরাজকতা তৈরি হলে পলাতক ফ্যাসিবাদীরা উৎসাহ পাবে এবং ‘স্বৈরাচারের ফিরে আসার পথ আরও সুগম হবে’।

কাজী আবুল বাশার, যিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সমাজকল্যাণবিষয়ক সহসম্পাদক, জানান যে যেকোনো অরাজকতার বিরুদ্ধে সতর্ক থাকতে কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের বলা হয়েছে, তাই মানুষকে সচেতন করতে মিছিল-সমাবেশের পাশাপাশি সাংগঠনিক কাজও চলছে। দলটির ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিন বলেন, ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগ ফিরছে এমন কিছু তিনি দেখছেন না, এলে জনগণকে নিয়ে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করা হবে; সরকার গঠনের পর কিছুটা ঝিমিয়ে পড়া দলীয় কর্মকাণ্ড আবার জোরদার করে প্রতিটি থানা ও ওয়ার্ডে প্রতিবাদ মিছিল-সমাবেশের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, অথচ সংসদের বিরোধী দলের কোনো ভূমিকা তিনি দেখছেন না। অন্যদিকে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সদস্য সচিব মোস্তফা জামানের ভাষ্য, তাঁরা রাজনীতিকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে চান, দেশে আর কোনো ধ্বংসযজ্ঞ চান না; ঢাকার সব থানা ও ওয়ার্ডে আগামী দুই-তিন সপ্তাহ টানা মিছিল-সমাবেশ চলবে এবং প্রয়োজন হলে তা ডিসেম্বর পর্যন্ত গড়াতে পারে।

অন্যদিকে গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ সাত দফা দাবিতে গত আগস্ট থেকে জামায়াত ও এনসিপি সারা দেশে যে লংমার্চ করছে, তার ধারাবাহিকতায় জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট আরও তিনটি বিভাগে লংমার্চ করবে, যা ডিসেম্বর পর্যন্ত গড়াতে পারে। জোটের একাধিক সূত্রের ভাষ্যমতে, বিএনপির ওপর চাপ বজায় রেখে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করানো এবং শেখ হাসিনার ফেরার ঘোষণার প্রেক্ষাপটে নেতাকর্মীদের চাঙা করে পতিত ফ্যাসিবাদকে একটি বার্তা দেওয়া, এই দুই লক্ষ্য একসঙ্গে পূরণ করতে চায় জোট। জোটের নেতাদের দাবি, জুলাইয়ে শেখ হাসিনার ফেরার ঘোষণার পর থেকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি তাদের সফট বুদ্ধিজীবীরাও মাথাচাড়া দেওয়ার চেষ্টা করছেন; দলটি ফিরতে চাইলে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ ফ্যাসিবাদবিরোধী দলগুলো একসঙ্গে প্রতিহত করবে, আর বিচার নিশ্চিত করতে সরকারের আরও সদিচ্ছার পাশাপাশি বিএনপিরও এগিয়ে আসা প্রয়োজন।

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার ফেরার কথাটি মূলত রাজনৈতিক বক্তব্য, এর মাধ্যমে তিনি নেতাকর্মীদের মনোভাব যাচাই করতে চাইছেন, তবে ফেরা এত সহজ হবে না। পরওয়ারের দাবি, জুলাই অভ্যুত্থানে গণহত্যার দায়ে ছাত্র-জনতা তাঁকে ছাড় দেবে না; পলাতক আসামি হিসেবে তাঁর সাজা হয়েছে, দেশে এলে আইন অনুযায়ী সেই সাজা ভোগ করতে হবে এবং বিষয়টি রাজনৈতিক ও আইনিভাবে মোকাবিলা করা হবে। এনসিপির রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য ও মিডিয়া উপকমিটির প্রধান সারোয়ার তুষার অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ একটি অবৈধ রাজনৈতিক দল ও সন্ত্রাসীগোষ্ঠী, যারা চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে ১৪শর বেশি মানুষকে হত্যা করেছে; আইনগতভাবে তাদের বিচারের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ডিসেম্বর এখনো দূরে, বিষয়টি তাঁরা এখনই খুব গুরুত্ব দিচ্ছেন না, তবে বিরোধী দল হিসেবে রাজনৈতিক ও আইনগতভাবে মোকাবিলা করবেন।