প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নিউইয়র্ক সফরে হোটেল গ্র্যান্ড হায়াতের লবিতে আয়োজিত সাক্ষাৎ অনুষ্ঠানে বিশৃঙ্খলার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নানা অঙ্গরাজ্য থেকে আসা বিপুলসংখ্যক বিএনপি নেতাকর্মী দলীয় প্রধানের দেখা পাননি। শুক্রবার দুপুর দুইটা থেকে শুরু হওয়া ওই আয়োজনে হাতেগোনা কয়েকজন শীর্ষ নেতা সাক্ষাতের সুযোগ পেলেও শত শত মাইল পেরিয়ে আসা তৃণমূলের কর্মীদের ফিরতে হয়েছে ক্ষোভ আর হতাশা নিয়ে। আয়োজকদের বিরুদ্ধে অব্যবস্থাপনা ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ এনে দায়ীদের শনাক্ত করে দলীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তুলেছেন তারা।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে অংশ নিতে দীর্ঘ বিশ বছর পর গত ২১ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সময় বিকেলে নিউইয়র্কে পৌঁছান তারেক রহমান; স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানসহ ৩৫ সদস্যের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির ১৮ বছর ধরে কমিটি নেই, নেতাকর্মীদের মূল্যায়নও হয়নি, তবু এ সফর ঘিরে তাদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা দেখা দেয় এবং অনেকে প্রবাসজীবনের ব্যস্ততা সামলে প্রচুর অর্থ খরচ করে দূরের স্টেট থেকে নিউইয়র্কে আসেন কেবল দলীয় প্রধানকে একনজর দেখে একটি ছবি তোলার আশায়। সফর শেষে দুবাই হয়ে ঢাকার পথে তিনি জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ছাড়েন শুক্রবার রাত ১১টা ৩০ মিনিটে।
সফর উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীকে নাগরিক সংবর্ধনা দেওয়ার কথা ছিল, যেখানে অনেক প্রবাসী নিজেদের না বলা কথা তুলে ধরতে চেয়েছিলেন; বিভিন্ন স্টেট কমিটির নেতারা এ জন্য মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেনও করেন, কিন্তু শীর্ষ নেতারা একাধিক বৈঠকেও একমত হতে না পারায় শেষ পর্যন্ত সংবর্ধনাটি বাতিল হয়। নানা নাটকীয়তার পর শুক্রবার প্রধানমন্ত্রীর আবাসস্থল গ্র্যান্ড হায়াতের লবিতে সাক্ষাতের আয়োজন করা হলে সকাল থেকেই সেখানে ভিড় করেন টেক্সাস, মিশিগান, ফ্লোরিডা, ক্যালিফোর্নিয়া, বোস্টন ও পেনসিলভেনিয়াসহ নানা অঙ্গরাজ্যের হাজারো নেতাকর্মী। নির্ধারিত সময়ে অনুষ্ঠান শুরু হলেও ভিড় ও হোটেল কর্তৃপক্ষের কড়া নিরাপত্তার কারণে অল্প কয়েকজনকে ভেতরে যেতে দেওয়া হয়, এতে লবিতে হট্টগোল শুরু হলে দ্রুতই তারেক রহমানকে লবি থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়, আর স্লোগান ও হইচইয়ের মধ্যে সিক্রেট সার্ভিস ও নিউইয়র্ক সিটি পুলিশের সদস্যরা হোটেলের চারপাশে নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলেন।
বিভিন্ন স্টেট বিএনপির নেতারা এ অব্যবস্থাপনার দায় চাপান একজন আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক, একজন সহসম্পাদক ও আরও কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতার ওপর; তাদের মতে, এমন গুরুত্বপূর্ণ সফরে আয়োজকদের আরও শৃঙ্খলা ও দায়িত্বশীলতা দেখানো দরকার ছিল। ফ্লোরিডা বিএনপির সভাপতি বীরমুক্তিযোদ্ধা ইমরানুল হক চাকলাদার কমিটির ১৫ জনকে সঙ্গে নিয়ে এলেও তাদের কেউই সাক্ষাৎ পাননি; তিনি জানান, কেউ কেউ তিন-চার দিন একই হোটেলে থেকেছেন, যা বেশ ব্যয়বহুল, অথচ স্টেট সভাপতি হয়েও প্রধানমন্ত্রীকে একনজর দেখার সুযোগ তার মেলেনি। এ জন্য তিনি আনোয়ার হোসেন খোকন (কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক সম্পাদক), জিল্লুর রহমান জিল্লু (নির্বাহী কমিটির সদস্য), আব্দুল লতিফ সম্রাট ও নাহিদুল ইসলামকে দায়ী করেন এবং ভারাক্রান্ত মনে ফ্লোরিডায় ফিরে যাওয়ার কথা জানান।
হাবিবুর রহমান সেলিম রেজা, যিনি নিউইয়র্ক মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সভাপতি, দাবি করেন যে যুক্তরাষ্ট্রে ১৭ বছরের আন্দোলন এবং হাসিনা সরকারের পতনে তাদের অবদানের কথা প্রধানমন্ত্রী জানেন; অথচ সংবর্ধনা হয়নি, মাত্র ৫০ জনের মতো দেখা পেয়েছেন, আর সব স্টেটের সভাপতি-সম্পাদক ও সুপার ফাইভের নেতারা বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন, যদিও কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীলরা, বিশেষ করে ইউএনএ ও কনস্যুলেট অফিসে থাকা ব্যক্তিরা, সমন্বয় করলে ভালো আয়োজন সম্ভব ছিল। তার অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রীর পাশে কেন্দ্রীয় বিএনপির চারজন সদস্য ও নাহিদ খান (কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-আন্তর্জাতিক সম্পাদক) দাঁড়িয়ে থাকলেও আওয়ামী লীগের হুমকি প্রতিহত করতে সপ্তাহজুড়ে দিনরাত মিছিল-সমাবেশ করা নিউইয়র্কের তিন কমিটির সভাপতি-সম্পাদকদের ঢুকতে দেওয়া হয়নি; তবে দায়ীদের প্রধানমন্ত্রী চিহ্নিত করবেন বলে তিনি বিশ্বাস করেন। নিউইয়র্ক স্টেট বিএনপির সভাপতি মোহাম্মদ অলিউল্লা আতিকুর রহমানও হতাশা জানিয়ে বলেন, সেলিম রেজা ও মহানগর উত্তরের আহবাব চৌধুরীসহ প্রায় ৪০ নেতাকর্মী দুই সপ্তাহ ধরে কখনো হোটেল, কখনো বিমানবন্দর, কখনো জ্যাকসন হাইটসে কর্মসূচি পালন করেছেন, এখন কর্মীদের কাছে জবাব দেওয়ার কিছু নেই; তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের চিহ্নিত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি মন্তব্য করেন, এভাবে দল চলতে পারে না।
ফয়েজ চৌধুরী, নিউইয়র্ক মহানগর উত্তর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক, জানান যে তার কমিটির শত শত নেতাকর্মী দেখা না পাওয়ায় তিনি ও তার সভাপতিও সাক্ষাৎ করেননি; তার অভিযোগ, গত ১৭ বছর যাদের কোনো কর্মসূচিতে দেখা যায়নি তারাই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছেন, আর এর দায় তিনি দেন যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির কেন্দ্রীয় চার নেতা ও নতুন এক সহ-আন্তর্জাতিক সম্পাদককে। বোস্টন বিএনপির সভাপতি সৈয়দ বদরে আলম সাইফুলের ভাষ্য, ১৭ বছর ধরে জাতিসংঘ ও স্টেট ডিপার্টমেন্টের সামনে আন্দোলন করা নেতাকর্মীরা গণসংবর্ধনার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু নেতৃত্বের অযোগ্যতায় তা হয়নি; এ ধরনের চক্রান্তে এবং সংবর্ধনা বাতিলের পেছনে যারা জড়িত, তাদের চিহ্নিত করে শাস্তির দাবি জানান তিনি। ফ্লোরিডা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক মো. মাসুদের হিসাবে, ফ্লোরিডা থেকে আসা ২০-২৫ জনের প্রত্যেকের খরচ প্রায় ৩ হাজার ডলার, পাঁচ দিনে সব মিলিয়ে প্রায় ৫০ হাজার ডলার, তবু দেখা না মেলায় এমন দল করে কী লাভ, সে প্রশ্ন তোলেন তিনি; আর ফ্লোরিডা স্টেট বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ মহসিন জানান, দীর্ঘ ১৮ বছর ওয়াশিংটন ও নিউইয়র্কে আন্দোলন করেও দায়িত্বপ্রাপ্তদের অবহেলায় তারা নেতার সাক্ষাৎ পাননি।
ক্যালিফোর্নিয়া বিএনপির সভাপতি বদরুল আলম চৌধুরী শিপলু নিজে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ পেয়েছেন এবং দিনটিকে জীবনের শ্রেষ্ঠ দিন বললেও জানান, তার কর্মীরা দেখা না পেয়ে হতাশ হয়ে ক্যালিফোর্নিয়ায় ফিরে গেছেন; দেশে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ছাড়াই চলাফেরা করা প্রধানমন্ত্রীকে যুক্তরাষ্ট্রের মতো সুরক্ষিত দেশে কেন এসএসএফের বেষ্টনীতে চলতে হচ্ছে, সে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, অনেকের ধারণা কেউ তাকে ভুল পথে চালিত করে কর্মীদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছেন। ক্যালিফোর্নিয়া বিএনপির সেক্রেটারি এম ওয়াহিদ রহমানের ভাষ্য, কথা ছিল পরিচয় পর্ব আর ফটোসেশনের, কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আসা কর্মকর্তারা, বিশেষ করে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা, ঠিকমতো সমন্বয় করতে পারেননি; অনুষ্ঠান পণ্ড হওয়ার জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া এবং ভবিষ্যতে এমন অব্যবস্থাপনা ঠেকানোর দাবি জানান তিনি। টেক্সাস থেকে আসা এক কর্মীও আক্ষেপ করে বলেন, নেতাকে দেখতে বহু পথ পেরিয়ে এলেও আয়োজকদের বিশৃঙ্খলার কারণে তাদের ভেতরেই ঢুকতে দেওয়া হয়নি, যা খুবই দুঃখজনক।






