জামায়াত নেতা ও সাবেক এমপি মেজর (অব.) মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান রঞ্জনকে শুক্রবার (২ অক্টোবর) বিকেলে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালককে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করা ও মারধরের হুমকি এবং এক নিরাপত্তা সুপারভাইজারকে মারধরের অভিযোগে সেদিন সকালেই বিমানবন্দর থানায় তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার শুক্রবার এক বিবৃতিতে তাঁর নিঃশর্ত মুক্তি চেয়েছেন এবং শাহজালাল বিমানবন্দরে যাত্রীদের হয়রানি ও অব্যবস্থাপনা নিয়ে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তও দাবি করেছেন।

কিশোরগঞ্জ-২ আসনের দুবারের সাবেক এই সংসদ সদস্য কটিয়াদী আসনে বিএনপির টিকিটে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ (জুন) সালের নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন এবং একসময় কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতিও ছিলেন। দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে ২০২২ সালে বিএনপি তাঁকে বহিষ্কার করে; পরে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে তিনি জামায়াতে যোগ দেন।

বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) সকালে মদিনা থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের যে ফ্লাইটে ওমরাহ যাত্রীরা ঢাকায় ফেরেন, তাতে আখতারুজ্জামানও ছিলেন। যাত্রীদের জমজমের পানি পেতে দেরি হওয়ায় বিমানবন্দরে নেমে তিনি কর্মকর্তাদের সঙ্গে চড়া গলায় কথা বলেন এবং বিমানমন্ত্রীর নাম ধরে আপত্তিকর মন্তব্য করেন বলে অভিযোগ ওঠে। এর একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যাতে তাঁকে নির্বাহী পরিচালক (ইডি) গ্রুপ ক্যাপ্টেন এসএম রাগীব সামাদের উদ্দেশে বারবার ঘাড় ধরে বের করে দেওয়ার কথা বলতে এবং ‘মার খাইতে চান?’ বলে প্রশ্ন করতে শোনা যায়; ইডিকে অবশ্য শান্ত থেকে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করতে দেখা যায়।

ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়লে বিমানবন্দরের মতো স্থানে একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তির এমন আচরণ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। শুক্রবার বিমানবন্দর থানায় মামলাটি করেন নিরাপত্তা কর্মকর্তা শাহরিয়ার আলম সজীব, যিনি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষে (বেবিচক) কর্মরত; এতে সরকারি কাজে বাধা ও হুমকির অভিযোগ আনা হয়। শুক্রবার বিকেলে শফিকুল ইসলাম, ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা), জানান ওই মামলার আসামি আখতারুজ্জামানকে তাঁর বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা ৫৫ মিনিটে বিমানের বিজি-৩৩৮ ফ্লাইটে মদিনা থেকে জামায়াতের ৩৪ জন প্রতিনিধি পরিবার নিয়ে শাহজালালে নামেন। আগত যাত্রীর চাপে ট্রলির জন্য লম্বা সারি পড়ে, কয়েকজন প্রটোকল সহকারী সারি ভেঙে ট্রলি নেওয়ার চেষ্টা করেন, আর লাগেজ দেরিতে আসা ও জমজমের পানি না পাওয়ায় কেউ কেউ উত্তেজিত হয়ে পড়েন। এরপর ঢাকা-৫ আসনের এমপি মোহাম্মদ কামাল হোসেন পৌনে ১১টার দিকে নির্বাহী পরিচালককে সেখানে ডেকে আনেন।

এজাহারের অভিযোগ, নির্বাহী পরিচালক কথা বলার সময় আখতারুজ্জামান আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে এগিয়ে গিয়ে অশালীন ভাষায় গালাগাল করেন, ভিড় ও ট্রলি ব্যবস্থাপনার বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টার মধ্যেও পেটানো ও বের করে দেওয়ার হুমকি দেন; পরিস্থিতি খারাপের আশঙ্কায় এমপি কামাল হোসেন ইডিকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেন। এরপর তারেক রহমান যাতে দেখেন, সে জন্য উপস্থিত সবাইকে বেঁধে পিটিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়ার হুমকি এবং মন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতকে (বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী) নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্যের অভিযোগও আনা হয়েছে। কেপিআই এলাকায় ভিডিও করতে বাধা দেওয়ায় নিরাপত্তা সুপারভাইজার ওয়ারেন্ট অফিসার মোহাম্মদ কামাল উদ্দিনকে গালাগাল ও শারীরিক আঘাত, বিমানের এক প্রতিনিধির সঙ্গে মারমুখী আচরণ এবং যাত্রীদের জমজমের পানির বোতল ট্রলি থেকে ছুড়ে ফেলার কথাও এজাহারে রয়েছে।

এদিকে জমজমের পানি দিতে দেরির ঘটনায় দুই কর্মকর্তা—ফ্লাইট সুপারভাইজার সাদ্দাম হোসেন ও ব্যাগেজ ইনচার্জ মনিরুল ইসলাম প্রধানকে—সাময়িক বরখাস্ত করে দায়িত্বে অবহেলার ব্যাখ্যা চেয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থাটি জানায়, কনটেইনার নামানো ও পরিচালনায় গাফিলতির কারণে বেল্টে সময়মতো পানি পৌঁছায়নি; বিষয়টি নজরে আসার পর নিজস্ব মজুত থেকে দ্রুত পানি বিতরণ করা হয় এবং পরে অন্য কনটেইনারটি খুঁজে সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়।