দলের গঠনতন্ত্রে প্রতি তিন বছর অন্তর জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি নির্বাচনের বিধান থাকলেও বিএনপিতে এক দশক ধরে কাউন্সিল হয়নি; সর্বশেষ ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল হয়েছিল ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ। চলতি বছর কাউন্সিল হওয়ার যে সম্ভাবনা ছিল, তা-ও পিছিয়ে যাচ্ছে; আগামী বছরের শুরুতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ব্যস্ততা আর সারা দেশের ৮২টি সাংগঠনিক ইউনিটের কমিটি পুনর্গঠনের কারণে ২০২৭ সালের মাঝামাঝি কাউন্সিল হতে পারে বলে দলীয় সূত্রের ধারণা। এ অবস্থায় স্থায়ী কমিটি থেকে শুরু করে ভাইস চেয়ারম্যান, উপদেষ্টা পরিষদ ও নির্বাহী কমিটিতে মৃত্যু, পদত্যাগসহ নানা কারণে খালি হওয়া শতাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদ পূরণের প্রক্রিয়া শুরু করেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান, চলছে যোগ্য ও পরীক্ষিত নেতাদের যাচাই-বাছাই।

নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, কাউন্সিল না হওয়ায় দীর্ঘদিন রাজপথের আন্দোলনে সক্রিয় থেকেও অনেকে কেন্দ্রীয় কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদ পাচ্ছেন না; তাই শূন্য পদে কারা আসবেন, তা নিয়ে দলে আলোচনা চলছে এবং পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির, সাংগঠনিকভাবে দক্ষ ও আন্দোলনে ভূমিকা রাখা নবীন-প্রবীণ নেতাদের তালিকা তৈরি হচ্ছে। তাঁদের ভাষ্য, যেকোনো সময় এ বিষয়ে ঘোষণা আসতে পারে, যদিও গত ১৩ সেপ্টেম্বর স্থায়ী কমিটির বৈঠকে উদ্যোগ নেওয়ার পর প্রায় এক মাসেও কারও পদোন্নতি হয়নি। তবে মধ্যম সারির নেতাদের অনেকের ধারণা, যাচাই-বাছাই যা-ই হোক, প্রভাবশালী নেতারা নিজেদের বলয়ের লোকদেরই পদে আনতে চান এবং আন্দোলনে ভূমিকা, ত্যাগ বা যোগ্যতার মূল্যায়ন তেমন গুরুত্ব পায় না।

দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী সংবাদমাধ্যমকে বলেন, শূন্য পদ পূরণের কাজ চলছে এবং ধাপে ধাপে সব পদই পূরণ হবে, তবে কবে ঘোষণা আসবে তা আগাম বলা কঠিন; সংশ্লিষ্ট কমিটির নিচের সারির পদধারীদের পদোন্নতি দেওয়া যায় কি না, গঠনতন্ত্র মেনে তা বিবেচনা করা হচ্ছে। চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল জানান, কিছুদিন আগে স্থায়ী কমিটিতে নতুন চারজনকে নেওয়া হয়েছে এবং শূন্য সম্পাদক, সহসম্পাদক ও নির্বাহী সদস্য পদ পূরণেরও সিদ্ধান্ত হয়েছে; তবে দায়িত্বশীল ও নিচের সারির কেউ কেউ নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে জড়ানোয় তাঁরা পদোন্নতি পাবেন না, আর এই বাছবিচারেই সময় বেশি লাগছে। ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদুর ভাষ্য, অস্থির ও বিক্ষুব্ধ পরিস্থিতিতে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর সরকারপ্রধান ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দেওয়ায় ব্যস্ত থাকায় কাউন্সিলে দেরি হচ্ছে, তবে একটি সাংগঠনিক দল কাজ করছে এবং শিগগিরই পদগুলো পূরণ হবে।

সর্বশেষ কাউন্সিলে গঠিত ১৯ সদস্যের জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে শুরু থেকেই দুটি পদ ফাঁকা ছিল; পরে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, এম কে আনোয়ার, তরিকুল ইসলাম, জমির উদ্দিন সরকার ও অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আ স ম হান্নান শাহ মারা যান এবং অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাহবুবুর রহমান রাজনীতি ছেড়ে দেন। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি হওয়ায় গত ১৩ আগস্ট দলীয় পদ ছাড়েন, স্পিকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর ১২ মার্চ পদত্যাগ করেন অবসরপ্রাপ্ত মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম; এরপর ১৫ আগস্ট ইসমাইল জবিউল্লাহ, অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার, আমান উল্লাহ আমান ও রুহুল কবির রিজভীকে স্থায়ী কমিটিতে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এখন কমিটির সদস্য ১৬ জন, অর্থাৎ তিনটি পদ শূন্য, অসুস্থতার কারণে ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া দলীয় কর্মকাণ্ডে নেই, আর এসব পদের আলোচনায় আছেন নুরুল ইসলাম মনি, আব্দুল আউয়াল মিন্টু, জয়নুল আবেদিন ও শামসুজ্জামান দুদু (ভাইস চেয়ারম্যান) এবং জয়নুল আবদিন ফারুক ও সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল (চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা)।

সর্বশেষ কাউন্সিলে ৩৭ সদস্যের ভাইস চেয়ারম্যান প্যানেল গঠিত হলেও এখন সেখানে আছেন ১৮ জন, ফাঁকা ১৮টি পদ; নির্বাচনের আগে কয়েকজনকে পদোন্নতি দেওয়া হলেও ঘাটতি পূরণ হয়নি, অসুস্থতায় নিষ্ক্রিয় আছেন কয়েকজন। এই প্যানেলের সদস্য ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট হারুন আল রশিদের মৃত্যু হয় গত ১৮ জুন, আর মেজর জেনারেল (অব.) মাহমুদুল হাসান মারা যান ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর। চেয়ারম্যানের ৮৫ সদস্যের উপদেষ্টা পরিষদেও শূন্য ১৭টি পদ—রোজী কবির, গাজী মাজহারুল আনোয়ার, হারুনার রশীদ খান মুন্নু, অধ্যাপক ড. শাহিদা রফিকসহ কয়েকজনের মৃত্যু এবং স্থায়ী কমিটিতে তিনজনের পদোন্নতিতে এসব পদ খালি হয়েছে; পরিষদের তিন-চারজন বহিষ্কৃত হয়েছেন, গুরুতর অসুস্থ হয়ে দূরে আছেন অ্যাডভোকেট সৈয়দ মো. শামছুল আলমও।

৫০২ সদস্যের জাতীয় নির্বাহী কমিটিতে সম্পাদক ও সহসম্পাদক পর্যায়ের ২২টি পদ খালি, যার মধ্যে আছে গুরুত্বপূর্ণ সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদও; ১০ বছরের বেশি সময় এ দায়িত্বে ছিলেন রুহুল কবির রিজভী, আর এ পদে সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বা হাবিব-উন-নবী খান সোহেলকে আনার আলোচনা আছে বলে দলীয় সূত্র জানায়। দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় সহদপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপুকে বহিষ্কার করা হয়েছে, এখন এ পদে আছেন কেবল মুনির হোসেন; আইনবিষয়ক সম্পাদকসহ সব দলীয় পদ ছেড়ে ব্যারিস্টার কায়সার কামাল ডেপুটি স্পিকার হওয়ায় তাঁর জায়গায় এসেছেন ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল, তবে সহআইনবিষয়ক সম্পাদকের পদ এখনো খালি। আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক পরিষদে একটি সম্পাদক ও দুটি সহসম্পাদক পদ ফাঁকা, বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় সেখান থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন রুমিন ফারহানা; এ ছাড়া যুববিষয়ক, ত্রাণ ও পুনর্বাসন, জলবায়ু পরিবর্তন ও সমবায়বিষয়ক সম্পাদক এবং প্রবাসী কল্যাণ, ছাত্রবিষয়ক, কৃষিসহ বেশ কয়েকটি সহসম্পাদক পদেও কেউ নেই।

দলীয় সূত্র জানায়, জাতীয় নির্বাহী কমিটির ৩০০ সদস্য পদের মধ্যে ৪১টি এখন শূন্য; এর মধ্যে ৩৮ জন মারা গেছেন, যদিও দলের ওয়েবসাইটে মাত্র চার-পাঁচজনের নামের পাশে মৃত্যুজনিত শূন্যতার কথা লেখা আছে। বগুড়ার ব্যবসায়ী মোহাম্মদ শোকরানা ও রবীন্দ্র লাল চাকমা স্বেচ্ছায় দল ছেড়েছেন—পরে আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়া রবীন্দ্র লাল চাকমার নাম অবশ্য এখনো ওয়েবসাইটে রয়ে গেছে; সদস্য আব্দুল কাদির ভূঁইয়া জুয়েলকে সহস্বেচ্ছাসেবকবিষয়ক সম্পাদক করা হয়েছে, আর সংসদ নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়াসহ নানা কারণে অন্তত ১৫-১৬ জন সদস্য বহিষ্কৃত হয়েছেন। একসঙ্গে এত পদ খালি থাকায় হাইকমান্ড সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাসের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তবে কাকে কোন পদে বসানো হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব।