প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমানের জাতিসংঘে নিয়োগ নিয়ে বিতর্কের মধ্যে তার শিক্ষা, ব্যক্তিগত অর্জন ও পেশাগত যোগ্যতার দিকগুলো সামনে এনেছেন মেক্সিকোতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মুশফিকুল ফজল আনসারী। সোমবার (১২ অক্টোবর) রাতে ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, বর্ণাঢ্য পারিবারিক ঐতিহ্যের বাইরেও জাইমার একটি নিজস্ব পরিচয় আছে, আর পারিবারিক পরিচয়কে যোগ্যতা বা অযোগ্যতার চূড়ান্ত মাপকাঠি বানালে কারও প্রতি সুবিচার হয় না।

পোস্টে জাইমার পারিবারিক পটভূমি তুলে ধরে রাষ্ট্রদূত লেখেন, তার দাদা দেশের প্রেসিডেন্ট ছিলেন, দাদি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী, নানা ছিলেন নৌবাহিনীর সাবেক প্রধান ও মন্ত্রী, বাবা জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে এখন প্রধানমন্ত্রী আর মা একজন খ্যাতিমান চিকিৎসক। এমন পরিবারের কাউকে ঘিরে সাধারণ মানুষ, আন্তর্জাতিক মহল ও গণমাধ্যমের কৌতূহল থাকা এবং তার কর্মস্থল, কাজের ধরন ও পেশাগত ভূমিকা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হওয়া স্বাভাবিক বলে মনে করেন তিনি; তবে তার মতে, সেই আলোচনায় জাইমার নিজের অর্জনও যথাযথভাবে আসা দরকার।

রাষ্ট্রদূতের ভাষ্যমতে, জাইমা রহমান আইন ও রাজনীতিতে স্নাতক করেছেন লন্ডনের কুইন মেরি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, আর ইনার টেম্পল থেকে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের ব্যারিস্টার হিসেবে যোগ্যতা অর্জন করেছেন। পড়াশোনা, আইনি প্রশিক্ষণ, ব্যারিস্টার হওয়ার যাত্রা, কাজের অভিজ্ঞতা ও সংগ্রাম মিলিয়ে জীবনের এই অধ্যায় একান্তই তার নিজের, যা কেবল পারিবারিক পরিচয়ের আড়ালে ঢেকে দেওয়া ন্যায্য নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। পি-৩ পর্যায়ের একটি পদে জাইমার জাতিসংঘে কাজ করার প্রত্যাশাকেও তিনি অস্বাভাবিক মনে করেন না।

জাইমা আইন কর্মকর্তা হিসেবে যে পদে যোগ দিয়েছেন, সেটি পি-৩ গ্রেডের এবং জাতিসংঘের নিয়মিত বাজেট থেকে এর অর্থায়ন হয় বলে জানান রাষ্ট্রদূত; ফলে পদটি বাংলাদেশ সরকারের খরচে প্রেষণে দেওয়া পদের তালিকায় নেই। জাতিসংঘের নিয়োগে প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া আছে উল্লেখ করে তিনি নিজের উদাহরণ দেন: জাতিসংঘে স্থায়ী সংবাদদাতা হিসেবে কাজের পাশাপাশি এক পর্যায়ে একটি অধিভুক্ত সংস্থায় পরামর্শক ছিলেন তিনি, আর তখন ব্যক্তিগত যোগাযোগ কাজে লাগিয়েছিলেন। তিনি লেখেন, ‘কানেকশন থাকাটা অযোগ্যতা নয়, বরং যোগ্যতার মাপকাঠি হিসেবেই ধরা হয়।’

সাধারণ পরিষদের সভাপতির দপ্তরের জনবল ও অর্থায়ন কাঠামোও ব্যাখ্যা করেন মুশফিকুল ফজল আনসারী। তার হিসাবে, ওই দপ্তরের ৪০ জন কর্মীর ৮ জনের বেতন আসে জাতিসংঘের নিয়মিত বাজেট থেকে, জাতিসংঘের অন্য কোনো সংস্থা বা বিভাগ থেকে প্রেষণে আছেন ৪ জন, সদস্য রাষ্ট্র ও পর্যবেক্ষকদের পাঠানো কর্মী ২০ জন এবং দপ্তরের ট্রাস্ট ফান্ডের অর্থে কাজ করছেন বাকি ৮ জন। এ ছাড়া সভাপতির নিজস্ব বেতন, বাসস্থান, গাড়িসহ অন্যান্য সুবিধার খরচ জাতিসংঘের তহবিল থেকে দেওয়া হয় না, সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে তা বাংলাদেশ সরকারকেই বহন করতে হবে; তবে দায়িত্বসংক্রান্ত সফর ও কার্যক্রমের ব্যয় মেটে দপ্তরের বাজেট ও ট্রাস্ট ফান্ড থেকে।

বেতন-ভাতা প্রসঙ্গে রাষ্ট্রদূত লেখেন, পেশাগত পদে জাতিসংঘের বেতন গ্রেড ও ধাপ একটি নির্দিষ্ট কাঠামো মেনে ঠিক হয়, আর মূল বেতনের সঙ্গে যোগ হয় কর্মস্থলের জীবনযাত্রার ব্যয়ভিত্তিক সমন্বয়; তাই বেতনের অঙ্ক নিয়ে আলোচনায় সংশ্লিষ্ট গ্রেড, কর্মস্থল ও প্রযোজ্য সুবিধার নিয়মও মাথায় রাখতে হয়। পোস্টের শেষ অংশে তিনি জাইমাকে নিয়ে আগ্রহ ও প্রশ্নের পাশাপাশি তার কাজের যথাযথ মূল্যায়নের আহ্বান জানান, যেখানে তার প্রস্তুতি, পরিশ্রম, মেধা ও পেশাগত পরিচয় গুরুত্ব পাবে। নিজ যোগ্যতায় পাওয়া সুযোগ যেন অযৌক্তিক বিতর্ক বা একপেশে মূল্যায়নের শিকার না হয়, সেই প্রত্যাশা জানিয়ে জাইমার জন্য শুভকামনাও করেন তিনি।

জাইমা রহমানের এই নিয়োগ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন ও গণমাধ্যমে এখন আলোচনা চলছে। ড. খলিলুর রহমান সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার আগে, অর্থাৎ জুনে নির্বাচিত হওয়ার পর ১৫ জুলাই জাইমার নিয়োগের প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কিছু গণমাধ্যম ও বিশ্লেষক। পি-৩ পদের জন্য সাধারণত পাঁচ বছরের পেশাগত অভিজ্ঞতা দরকার হয় উল্লেখ করে কোনো কোনো বিশ্লেষক জাইমার অভিজ্ঞতার মেয়াদ নিয়েও প্রশ্ন রেখেছেন।