কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতার বাস্তব কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না ডা. জাহেদ উর রহমান। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা হিসেবে মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলনকক্ষে সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, দলটির নেতারা অপরাধ স্বীকার করে ক্ষমা চাইলেও আলোচনা শুরু হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা নিয়ে সরকার উদ্বিগ্ন নয় এবং যুক্তরাষ্ট্রে সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে হেনস্তাসহ জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্তদের ওপর প্রতিশোধমূলক আচরণে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে বলেও জানান তিনি।

গত সপ্তাহে সমঝোতা প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য সংবাদমাধ্যমে যেভাবে এসেছে, তাতে কিছু ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হওয়ায় বিষয়টি পরিষ্কার করছেন বলে জানান উপদেষ্টা। তাঁর ব্যাখ্যা, গুরুতর ফৌজদারি বা মানবতাবিরোধী অপরাধ যাঁরা করেছেন, তাঁদের বিচার হতেই হবে এবং সমঝোতার আলোচনা কখনো সেই বিচারের বিকল্প হতে পারে না; অপরাধের ধরন ও পরিস্থিতি বুঝে কোনো কোনো ক্ষেত্রে কেবল আলোচনা হতে পারে। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের বিষয়ে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার ও রায় হয়েছে এবং বাকি বিচারিক প্রক্রিয়াও চলবে বলে জানান তিনি।

আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গে জাহেদ উর রহমান বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের পর ক্ষমতা ছাড়লেও দলটির পক্ষ থেকে এখনো অপরাধ স্বীকার বা অনুশোচনার কোনো চিহ্ন নেই; বরং তাদের কর্মকাণ্ডে উসকানি ও সংঘাতের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। দেশে ও বিদেশে সন্ত্রাস-সহিংসতা উসকে দিতে চাওয়া এমন দলের সঙ্গে আলোচনার প্রশ্নে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট এবং সরকারের দিক থেকে উদ্যোগ নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না বলে মন্তব্য করেন তিনি। দলটি রাজনীতি করতে পারবে কি না, সেটিও আদালতের প্রক্রিয়া ও এ-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে বলে জানান তিনি।

ক্ষমা চাইলে সমঝোতার পথ খুলবে কি না, এ প্রশ্নে আগের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়ে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, কোনো দল অতীতের দায় স্বীকার করে ক্ষমা চাইবে, এটি প্রত্যাশিত হতে পারে, তবে সরকার এমন কোনো শর্ত দেয়নি যে ক্ষমা চাইলেই আলোচনা শুরু হবে। ভবিষ্যতে কেউ যদি জানান যে আওয়ামী লীগ দায় স্বীকার করে ক্ষমা চেয়েছে, সেই বদলে যাওয়া পরিস্থিতিতে আদৌ আলোচনা করা যায় কি না, সে প্রশ্ন উঠতে পারে; কিন্তু সেটি নিছক তাত্ত্বিক আলোচনা এবং সরকার এখনই কোনো সমঝোতার প্রক্রিয়ায় যেতে চাইছে না বলে স্পষ্ট করেন তিনি। ব্যক্তিগতভাবে এমন সম্ভাবনা তিনি একেবারেই দেখেন না জানিয়ে উপদেষ্টা বলেন, দলটি ভবিষ্যতে অপরাধ স্বীকার করলে তখন কী করা হবে, সেটি ভবিষ্যতেরই প্রশ্ন।

আওয়ামী লীগের অতীত টেনে জাহেদ উর রহমান অভিযোগ করেন, শেখ হাসিনার শাসনামলে শুধু জুলাই অভ্যুত্থানের সময় নয়, তার বহু বছর আগে থেকেই গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, হেফাজতে নির্যাতন এবং বিরোধীদের হয়রানির উদ্দেশ্যে মামলা দেওয়ার মতো গুরুতর ঘটনা ঘটেছে। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, বিএনপির নেতা হাবিব-উন-নবী খান সোহেলের নামে ৪৫০টির বেশি মামলা হয়েছিল, যা নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনেও উঠে আসে; এত মামলা একজন মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও রাজনৈতিক জীবনে কেমন প্রভাব ফেলে, তা ভেবে দেখার আহ্বান জানান তিনি। সমঝোতার কথা যাঁরা বলছেন, তাঁদেরও এসব বিবেচনায় নিতে হবে বলে মন্তব্য করেন উপদেষ্টা।

তাঁর মতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরও সমঝোতার আলোচনা উঠেছিল এবং তখনো অপরাধ স্বীকার ও অনুশোচনার প্রশ্নটি জরুরি ছিল; কিন্তু দুই বছরের বেশি সময় পেরোলেও দলটির নেতৃত্বের আচরণে ইতিবাচক কোনো বদল তিনি দেখছেন না। জাহেদ উর রহমানের অভিযোগ, ক্ষমা চাওয়া বা অনুতাপ তো দূরের কথা, দলটির নেতারা হুমকি দিচ্ছেন, নানাভাবে সহিংসতা উসকে দিতে চাইছেন, এমনকি প্রচারিত বক্তব্য ও অডিওতে কোথাও কোথাও প্রতিপক্ষের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার উসকানিও এসেছে। তিনি বলেন, ‘দুই বছরে কী কী করেছেন, সেটার আমলনামা তো আমাদের কাছে আছে।’

শেখ হাসিনা ভারতে থেকে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। এ নিয়ে সরকার চাপে আছে কি না, জানতে চাইলে উপদেষ্টা বলেন, সরকার শুরু থেকেই তাঁকে ফিরিয়ে এনে বিচার নিশ্চিত করতে চায়; মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তাঁর বিচার ও রায় হয়েছে, ভারতকে তাঁকে হস্তান্তরের অনুরোধ জানানো হয়েছে, তাই তিনি নিজে ফিরে এলে সরকারের কোনো সমস্যা নেই এবং দেশের বিচারব্যবস্থাতেই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার প্রস্তুতি সরকারের আছে; এমন গুরুতর অপরাধের বিচার দেশে করা না গেলে সেটি হবে দুঃখজনক। প্রত্যর্পণ প্রসঙ্গে তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরেও বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে তোলা হয়েছে এবং আদালতের রায়ের কথা ভারতকে জানানো হয়েছে; তবে দাবি জানালেই ভারত হস্তান্তর করবে বিষয়টি এমন নয়, কারণ দেশটির নিজস্ব অবস্থান আছে, যদিও সরকারের উদ্যোগে কোনো ঘাটতি নেই বলে দাবি করেন তিনি।