চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আসছে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলটি আনুষ্ঠানিকভাবে নেই, তবু দলটির সমর্থক ভোটারদের অবস্থান আর তাদের সংরক্ষিত ভোটব্যাংক বহু জায়গায় জয়-পরাজয়ের বড় নিয়ামক হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে প্রার্থীর জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক শক্তি ও স্থানীয় সমীকরণের পাশাপাশি এই ভোট নিজেদের দিকে টানতে ব্যক্তিগতভাবে তৎপর হয়েছেন বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা। নির্বাচন কমিশন (ইসি) দেশের প্রায় ৪ হাজার ৩০০ ইউনিয়ন পরিষদে পাঁচ ধাপে ভোটের দিনক্ষণ ঘোষণা করেছে, যার প্রথম ধাপ ২০২৭ সালের ২১ জানুয়ারি এবং শেষ ধাপ ২৭ মে।

এই নির্বাচন নির্দলীয় ও প্রতীকহীন বলে কোনো দলের নেতাকর্মীকে ভোট থেকে দূরে রাখার আইনি এখতিয়ার কমিশনের নেই, তাই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ যেকোনো দলের কর্মী-সমর্থক চাইলে অংশ নিতে পারবেন। তৃণমূলের নেতারা বলছেন, প্রকাশ্য প্রচারে না থাকলেও মাঠপর্যায়ে বহু বছরে গড়ে ওঠা আওয়ামী লীগের ভোটার-সমর্থকেরা জাতীয় রাজনীতির পালাবদলে হারিয়ে যাননি; এই নীরব ভোটই এখন অনেক জায়গায় তুরুপের তাস, আর নিজের দলের ভোটের সঙ্গে যিনি কৌশলে এ ভোট যোগ করতে পারবেন, দৌড়ে তিনিই এগিয়ে থাকবেন বলে মনে করেন তাঁরা, তাই অনেক প্রার্থী গোপনে সমীকরণ মেলাচ্ছেন ও সমর্থকদের নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, যেমনটা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়ও দেখা গিয়েছিল। তবে তাঁদের মতে, এই ভোটের প্রভাব ইউনিয়ন, পৌরসভা বা উপজেলাভেদে আলাদা হবে—দলটির সমর্থন যেখানে বেশি, সেখানে প্রভাবও বেশি, আবার কোথাও প্রার্থীর নিজের জনপ্রিয়তা, পারিবারিক-সামাজিক যোগাযোগ ও এলাকার উন্নয়নকাজই দলীয় পরিচয়ের চেয়ে বড় হয়ে উঠবে।

অতীতের ফল বলছে, বিতর্কমুক্ত চারটি সংসদ নির্বাচনে দুই দলের ভোটের ব্যবধান কখনো সামান্য, কখনো উল্লেখযোগ্য ছিল: বিএনপি ১৯৯১ সালে ৩০ দশমিক ৮১, ১৯৯৬ সালে ৩৩ দশমিক ৬১, ২০০১ সালে ৪০ দশমিক ৮৬ এবং ২০০৮ সালে ৩৩ দশমিক ২০ শতাংশ ভোট পায়, আর একই চার নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভাগে যায় যথাক্রমে ৩০ দশমিক ০৮, ৩৭ দশমিক ৪৪, ৪০ দশমিক ২১ ও ৪৯ শতাংশ। আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে হওয়া ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক আছে—২০১৪ ও ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির ভোট বর্জন করে বিএনপি, আর ২০১৮ সালে অংশ নিলেও আগের রাতে ভোট নেওয়ার অভিযোগ তোলে বিএনপি ও বিরোধী দলগুলো, যা থেকে নির্বাচনটি ‘রাতের ভোট’ নামে বিতর্কিত হয়। ওই তিন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পায় যথাক্রমে ৭২, ৭৪ দশমিক ৬৩ ও ৬৫ দশমিক ১৫ শতাংশ ভোট, আর ২০১৮ সালে বিএনপির ভাগে যায় ১৩ দশমিক ০৬ শতাংশ।

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও নিষেধাজ্ঞার কারণে অংশ নেয়নি আওয়ামী লীগ। সেই ভোটে বিএনপি পায় ৪৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ, আর জামায়াতে ইসলামীর ঝুলিতে যায় ৩১ দশমিক ৭৬ শতাংশ, যেখানে এর আগে জাতীয় নির্বাচনে দলটির সর্বোচ্চ প্রাপ্তি ছিল ১৯৯১ সালের ১২ দশমিক ১৩ শতাংশ; তাই রাজনৈতিক মহলে ধারণা রয়েছে, জামায়াতের ভোট বাড়াতে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের একাংশের ভূমিকা ছিল এবং অনেক আসনে তাঁরা নীরবে ব্যবধান গড়ে দিয়েছেন। এ বিবেচনায় ইউপি নির্বাচনেও কোনো এলাকায় তাঁরা কেন্দ্রে গিয়ে নির্দিষ্ট প্রার্থীর পক্ষে দাঁড়ালে ফলাফলে তার ছাপ পড়তে পারে।

তবে বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল মনে করেন, এবার দলীয় প্রতীকে ভোট না হওয়ায় জাতীয় নির্বাচনের অঙ্ক স্থানীয় নির্বাচনে মেলানো ঠিক হবে না। তাঁর ভাষ্য, আওয়ামী লীগের পুরোপুরি দলীয়করণের সময়ও বিএনপি ভোটে অংশ নিয়ে বহু জায়গায় জিতেছে; এ প্রসঙ্গে তিনি দিনাজপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলমের উদাহরণ দেন, যিনি যতবার ভোটে দাঁড়িয়েছেন ততবারই জিতেছেন। আলালের দাবি, ১৭ বছর ধরে আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী কর্মকাণ্ড দেখে মানুষ দলটিকে অপছন্দ করেছে, তাই ভোটে তেমন প্রভাব পড়বে না, আর প্রার্থীর জনপ্রিয়তা, পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি ও জনসম্পৃক্ততা থাকলে দুশ্চিন্তারও কিছু নেই।

ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ, জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল, অবশ্য মনে করেন অতীত আর বর্তমান বাস্তবতা এক নয়। তাঁর দাবি, আগে আওয়ামী লীগের ভোট ছিল একতরফা, সুষ্ঠু নির্বাচনের ভোট নয়, যেখানে জামায়াত প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব পায়নি; জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশে দলটির সেই ভোটব্যাংক আর নেই, ফ্যাসিবাদী মনোভাবের কারণে অনেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন, আর দলীয় ভোট না হওয়ায় স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থীর যোগ্যতা, জনপ্রিয়তা, পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি ও জনসম্পৃক্ততাই কাজ করবে। এনসিপির মিডিয়া উপকমিটির প্রধান ও দলের নীতিনির্ধারণী ফোরাম রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য সারোয়ার তুষারও বলেন, দলীয় প্রতীক না থাকায় জাতীয় নির্বাচনের মতো দলগত অবস্থানের হিসাব এখানে খুব একটা খাটবে না; ভোটাররা স্থানীয় প্রার্থীর জনপ্রিয়তাকেই বেশি গুরুত্ব দেবেন এবং ভোট সব দিকেই যাবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান ও মেম্বার প্রার্থীদের সঙ্গে ভোটারদের ব্যক্তিগত চেনাজানা, এলাকার সমস্যায় তাঁদের অতীত ভূমিকা ও স্থানীয় বিরোধের মতো বিষয় অনেক সময় জাতীয় নির্বাচনের চেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে; পাশাপাশি ধর্মের ব্যবহার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারও ফল গড়তে ভূমিকা রাখবে, আর ভোট ঘনিয়ে এলে এলাকাভিত্তিক এআই-নির্মিত মিথ্যা খবর ও গুজব ছড়িয়ে সহিংসতা বাড়ার আশঙ্কাও করছেন অনেকে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক দিলারা চৌধুরী বলেন, জাতীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন এক নয়; জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াত আওয়ামী লীগের ভোটারদের টানার চেষ্টা করেছিল, স্থানীয় ভোটেও সে চেষ্টা থাকা স্বাভাবিক এবং কিছু এলাকায় তা জয়-পরাজয়ে প্রভাব ফেলতে পারে, তবে সবখানে নয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের এই অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপকের মতে, তৃণমূলে মানুষ একে অপরকে চেনে এবং কে কতটা কাজ করেছেন তা-ও জানে, তাই জাতীয় নির্বাচনের মতো এতটা প্রভাব আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক এখানে ফেলবে না।