সংসদ সদস্য পদ থেকে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি সরে দাঁড়ানোয় শূন্য হয়েছে জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসন-২৩; এ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী হতে বিএনপির মনোনয়ন ফরম কিনেছেন ৭০ জন নারী নেত্রী, যাদের অন্তত এক ডজন দলে প্রভাবশালী ও আলোচিত মুখ। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) রাজধানীর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দিনভর ফরম বিক্রি হয়, আর পূরণ করা ফরম জমার শেষ দিন শনিবার (১৭ অক্টোবর)। বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও কেন্দ্রীয় দপ্তরে সংযুক্ত তারিকুল আলম তেনজিং সংবাদমাধ্যমকে বলেন, শনিবার সকাল থেকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ফরম গ্রহণের পর সংসদীয় বোর্ডের সভায় যাচাই-বাছাই হবে এবং দল যাকে যোগ্য বিবেচনা করবে, তিনিই চূড়ান্ত মনোনয়ন পাবেন।

দলীয় সূত্রগুলো জানায়, সংসদে যুক্তি সাজিয়ে গুছিয়ে বক্তব্য দিতে পারেন এবং প্রতিপক্ষের যুক্তি পাল্টা যুক্তিতে নাকচ করার সামর্থ্য রাখেন—এমন নারীকেই প্রার্থী হিসেবে চাইছে বিএনপি। অযথা কথা বলে সময় নষ্ট করা বা বিতর্ক তৈরি এড়ানোর বিষয়টিতে নীতিনির্ধারকেরা বিশেষ নজর দিচ্ছেন; অভিজ্ঞতা, রাজপথে ত্যাগ ও বিতর্কমুক্ত ভাবমূর্তিও অগ্রাধিকার পাবে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের ৩২৩ নম্বর আসনটিই সংরক্ষিত নারী আসন-২৩ নামে পরিচিত; দলীয় মনোনয়নে এই আসন থেকে নির্বাচিত মিষ্টি ছিলেন ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক। গত ২৪ সেপ্টেম্বর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার নামের মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর, লুটপাট এবং স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়; এতে মিষ্টি ও তার অনুসারীরা জড়িত বলে অভিযোগ ওঠার পর ১ অক্টোবর তিনি স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র দেন এবং সেদিনই সংসদ সচিবালয় আসনটি শূন্য ঘোষণা করে। নির্বাচন কমিশন ১২ অক্টোবর যে তফসিল দিয়েছে, তাতে ভোট হবে ১২ নভেম্বর; রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ সময় ২৬ অক্টোবর, বাছাই ২৭ অক্টোবর, বাছাইয়ের বিরুদ্ধে আপিল ২৮ অক্টোবর ও নিষ্পত্তি ২৯ অক্টোবর, প্রার্থিতা প্রত্যাহার ১ নভেম্বরের মধ্যে এবং প্রতীক বরাদ্দ ২ নভেম্বর।

মিষ্টির আসনে কে বসবেন, তা নিয়ে বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে এখন জোর আলোচনা চলছে। বিগত নির্বাচনে অনেকে তৎপর থেকেও সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন পাননি, কেউ কেউ সরাসরি ভোটে দলের প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন; তাদের চোখে মিষ্টির পদত্যাগ নতুন সুযোগ এনে দিয়েছে। দলের দায়িত্বশীল নেতাদের ভাষ্য, বিএনপি এখন ক্ষমতায় থাকায় সংসদ সদস্য হতে আগ্রহীর সংখ্যা বেশি হওয়াই স্বাভাবিক; সাবেক সংসদ সদস্য থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের নেত্রীরা কেন্দ্রীয় নেতাদের অফিস-বাসায় তদবির চালাচ্ছেন, যদিও শেষ পর্যন্ত কাকে বেছে নেওয়া হবে, সে সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।

দলীয় সূত্রমতে, ফরম কেনা ৭০ জনের মধ্যে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ঘুরেফিরে আসছে রাজপথের আন্দোলনে সক্রিয় ও সহযোগী সংগঠনে ভূমিকা রাখা ডজনখানেক নেত্রীর নাম, যাদের মধ্যে সাবেক ছাত্রদল নেত্রী, আইনজীবী, চিকিৎসক ও প্রকৌশলীসহ পেশাজীবীরাও আছেন। আলোচিতদের মধ্যে আছেন শাহিনুর নার্গিস (মহিলা দলের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক নেত্রী), অ্যাডভোকেট আসমা আজিজ (মহিলা দলের কেন্দ্রীয় স্বনির্ভরবিষয়ক সহসম্পাদক), মৌসুমী নাছরিন (কেন্দ্রীয় গ্রাম সরকারবিষয়ক সহসম্পাদক), রুনা লায়লা (ঢাকা মহানগর উত্তর মহিলা দলের সভাপতি), রেহানা আক্তার শিরিন (ইডেন কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি), হাসনা হেনা হীরা (দিনাজপুর জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক), সিরাজগঞ্জের অ্যাডভোকেট সিমকী ইমাম খান (বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য), জেলী চৌধুরী (চট্টগ্রাম মহানগর মহিলা দলের সেক্রেটারি), পাবনার খায়রুন্নাহার খানম মিরু (বদরুন্নেসা কলেজের প্রথম ভিপি), দেওয়ান মাহমুদা আক্তার রিটা, নিলোফার ইয়াসমিন নিলু ও সিলেটের সৈয়দা আদিবা হোসাইন।

ফরম নেওয়া নেত্রীদের একজন অ্যাডভোকেট আসমা আজিজ ছাত্রদলের রাজনীতি থেকে রাজপথের আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন। সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেন, ছাত্রজীবন থেকে দলের কর্মী হিসেবে কাজ করতে গিয়ে একাধিকবার হামলার শিকার হয়েছেন ও একাধিক বিস্ফোরক মামলার আসামি হয়েছেন; বিগত সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপ্রত্যাশী থাকলেও দলের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেছেন, আর তার নির্বাচনি এলাকা বরগুনার সংসদ সদস্য বিরোধী দলের হওয়ায় সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন পেলে এলাকার উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারবেন বলে আশা করেন। মহিলা দলের দপ্তর সম্পাদক শাহিনুর নার্গিস জানান, ৩১ বছরের রাজনৈতিক জীবনে তিনি ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও মহিলা দলে নানা দায়িত্ব পালন করেছেন; ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত সরকারের আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে হওয়া সব মামলায় তিনি আসামি ছিলেন এবং ৭ মার্চ তারেক রহমানের গ্রেপ্তারের প্রতিবাদকে ঘিরে ঢাবি ক্যাম্পাসে হওয়া মামলায় একমাত্র ছাত্রী আসামিও তিনি।

পাবনার সাঁথিয়া উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক খায়রুন্নাহার খানম মিরু বলেন, ছাত্রজীবন থেকেই দলের প্রতি অনুগত থেকে তিনি বদরুন্নেসা কলেজের প্রথম ভিপি হয়েছিলেন, পেশাগত জীবনে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গেও কাজ করেছেন; মনোনয়ন পেলে তার যথাযথ প্রতিদান দেওয়ার চেষ্টা করবেন। আর রেহানা আক্তার শিরিনের ভাষ্য, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনসহ দলের প্রতিটি কর্মসূচিতে তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজপথে ছিলেন; ত্যাগী ও পরীক্ষিত কর্মীদের মূল্যায়ন করা হলে সংসদ ও সংগঠনে নারী নেতৃত্ব আরও শক্তিশালী হবে বলে মনে করেন তিনি।