রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা দিয়ে বিরোধী দলের ওপর নজরদারির যে বার্তা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দিয়েছেন, তাকে অত্যন্ত বিপজ্জনক ও প্রমাণিত ফ্যাসিবাদী চরিত্রের প্রকাশ বলে মন্তব্য করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ। কুমিল্লা-৪ (দেবিদ্বার) আসনের এই সংসদ সদস্য মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টের পোস্টে সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন।

পোস্টে তিনি প্রশ্ন তোলেন, একজন প্রধানমন্ত্রী কি প্রকাশ্যে রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাকে বিরোধী দলের পেছনে লাগানোর ঘোষণা দিতে পারেন, আর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দায় কি কোনো দলের প্রতি, নাকি দেশের প্রতি। তার মতে, এই সংস্কৃতি শেখ হাসিনার শাসনামলের কথা মনে করিয়ে দেয়; রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে মৌলিক দায়িত্ব থেকে সরিয়ে বিরোধী দলকে নিশানা করে নজরদারি প্রযুক্তির অপব্যবহারকে তিনি নিন্দনীয় বলে উল্লেখ করেন।

একই পোস্টে হাসনাত অভিযোগ করেন, উন্মুক্ত দরপত্র এড়িয়ে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম) ফ্যামিলি কার্ড ও ফার্মার কার্ড প্রকল্পে হাজার কোটি টাকার অনিয়মের চক্রান্ত হচ্ছে। গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনের বরাতে তার দাবি, বিএনপি সরকার প্রায় সব বড় প্রকল্পেই ডিপিএমের দিকে ঝুঁকছে এবং সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী বা আন্তঃবাহিনী পরিচালিত বিএমটিএফকে সামনে রেখে আড়ালের কাজ দলীয় নেতাদের হাতে তুলে দেওয়ার ফন্দি আঁটছে। রঙিন কার্ড ছাপার এ কর্মসূচি ঘিরে অনিয়মের নানা অভিযোগ উঠলেও সরকার আজও তদন্তের কোনো উদ্যোগ নেয়নি বলে উল্লেখ করেন তিনি।

তার দাবি, বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড দেয় এমন এক বিএনপি-এমপির প্রতিষ্ঠান প্রতিটি প্লাস্টিক কার্ড ১২৫-১৩০ টাকায় সরবরাহ করে, অথচ ফার্মার ও ফ্যামিলি কার্ডে মোট দাম পড়ছে প্রায় ৩০০ থেকে ৩৬৫ টাকা; এর ওপর ডাটাবেজ তৈরির নামে ২০১০ কোটি টাকা হাতানোর চক্রান্ত শুরু হয়েছে। বাহিনীগুলোর লোগো ব্যবহার করে বিএনপি নেতারা দুর্নীতির যে আয়োজন করেছেন, তাতে বাহিনীর সম্মান ক্ষুণ্ন হবে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। বিকল্প হিসেবে তিনি বলেন, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) নিয়মিত গরিব মানুষের তথ্য হালনাগাদ করে এবং মোবাইল ব্যাংকিং, ইউটিলিটি বিল, মোবাইল টপআপ, ক্ষুদ্রঋণ বা খানা আয়-ব্যয় জরিপের তথ্য দিয়ে বিদ্যমান বাজেটেই অতিদরিদ্রদের প্রায় নির্ভুল তালিকা করা সম্ভব।

হাসনাতের দাবি, এসব প্রকল্প প্রধানমন্ত্রীর অজান্তে বা ইচ্ছার বাইরে চলছে ভাবার সুযোগ নেই, কারণ তিনি নিজেই প্রতিটি সভা-সেমিনারে এই দুই কার্ডের প্রচার চালান এবং বিরোধী দলকে খোঁচা দেন। তার অভিযোগ, কেনাকাটার নামে লুটপাট বৈধ করতে সেনা ও নৌবাহিনীকে ডিপিএমের ঢাল বানানো হচ্ছে; সামরিক কর্মকর্তাদের এখন দৃঢ়ভাবে বলা উচিত, ভাতা দিতে প্লাস্টিক কার্ড নয়, দরকার স্বয়ংক্রিয় ও টেকসই ডেটাবেজ। প্রকল্প শেষ হলে সেই তথ্যভান্ডার কে হালনাগাদ করবে, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।

হাসনাত উল্লেখ করেন, শেখ হাসিনার আমলে সামরিক ও আধা-সামরিক বাহিনীকে দিয়ে গুম, খুন ও ক্রসফায়ারের মতো বিচারবহির্ভূত হত্যার কারণে সংস্থাগুলো দেশে-বিদেশে কলঙ্কিত হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞাও এসেছে। তার অভিযোগ, ৫ আগস্টের পরিবর্তনের পর গত দুই বছরে বাহিনীগুলো রাজনৈতিক অপব্যবহার থেকে কিছুটা বেরিয়ে এলেও তারেক রহমান আবার এজেন্সিকে দিয়ে বিরোধী দল ও নেতাদের নিশানা করার বার্তা দিয়েছেন; বিএনপি নেতাদের লুটপাটের অংশীদার না হতে সংস্থাগুলোকে আগাম সতর্কও করেন তিনি। তার ভাষায়, ‘বাংলাদেশ ক্যান নট এফোর্ড অ্যানাদার ফেইজ অব অটোক্র্যাটিক জার্নি।’

পোস্টের শেষাংশে হাসনাত লেখেন, রাষ্ট্রীয় বাহিনী ক্ষমতাসীন দলের সম্পত্তি নয়, বরং জনগণের সেবক; সরকার ও বিরোধী দলসহ ১৮ কোটি মানুষের জন্য কাজ করতেই প্রতিষ্ঠানগুলো গড়া হয়েছে। দেশের বদলে দলের সংকীর্ণ স্বার্থে এগুলো ব্যবহার করা কেবল নিয়মভঙ্গ নয়, জনগণের দেওয়া দায়িত্বের সঙ্গে সরাসরি প্রতারণা বলেও মন্তব্য করেন তিনি।