আওয়ামী লীগ সরকারবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনে রাজপথে থাকা দল ও জোটগুলোর সঙ্গে আগামী নভেম্বর বা ডিসেম্বরের মধ্যে সংলাপে বসার পরিকল্পনা করছেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দলের নির্ভরযোগ্য সূত্রের ভাষ্য, বিএনপি যাদের ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তি বলে, তাদের মধ্যে পারস্পরিক দূরত্ব কমানো ও ঐক্য মজবুত করাই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। তবে ১১ দলীয় জোটসহ অন্য কোনো দল এ সংলাপে আমন্ত্রণ পাচ্ছে না বলে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, আন্দোলনের দিনগুলোতে দলগুলোর মধ্যে যে বোঝাপড়া ও সংহতি গড়ে উঠেছিল, সাম্প্রতিক কিছু বিষয়ে মতভেদে তাতে চিড় ধরেছে; বিএনপির সঙ্গে শরিকদের দূরত্ব বেড়েছে, নিজেদের মধ্যেও আগের সেই যোগাযোগ ও হৃদ্যতা নেই। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে-পরে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানের প্রভাব মাঠপর্যায়েও পড়েছে। এ অবস্থায় সবাইকে এক টেবিলে এনে ভুল বোঝাবুঝি দূর করতে এবং প্রতিটি দলের মতামত ও দুঃখ-কষ্টের কথা শুনতে চান তারেক রহমান।
সূত্রের দাবি, সংলাপে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, সংবিধান সংশোধন, রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফা রূপরেখা, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের রোডম্যাপ ও জাতীয় সংকটে একসঙ্গে কাজের কৌশল গুরুত্ব পাবে; আগামী ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে জল্পনা এবং রাজপথে আওয়ামী লীগের ফিরে আসার হুংকারের প্রেক্ষাপটে দলগুলোর করণীয় নিয়েও বার্তা দেবেন তারেক রহমান। দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের ধারণা, এ উদ্যোগ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং তাঁদের ভাষায় ফ্যাসিবাদী শক্তির পুনরুত্থান ঠেকানোর ক্ষেত্রে বড় মনস্তাত্ত্বিক বিজয় এনে দেবে। স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বলেন, ফ্যাসিবাদের পতন হলেও তাদের দোসররা এখনো ষড়যন্ত্র করছে বলে এখন বিভেদ দেশের জন্য বড় ক্ষতি ডেকে আনতে পারে; তাই তারেক রহমান নিজেই উদ্যোগী হয়েছেন এবং দুই মাসের মধ্যে সংলাপ হতে পারে।
সংলাপ আয়োজনের সার্বিক দায়িত্বে আছেন নজরুল ইসলাম খান, যিনি বিএনপির স্থায়ী কমিটি ও লিয়াজোঁ কমিটির সদস্য এবং যুগপৎ আন্দোলনের সময়ও লিয়াজোঁ কমিটিতে ছিলেন; চিকিৎসার জন্য এখন চীনে থাকা এই নেতা বলেন, দেশে ফিরে আলোচনার পর বিস্তারিত জানাতে পারবেন। সংলাপ হতে পারে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন যমুনা কিংবা গুলশানে বিএনপি চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে; ২০ জুলাইয়ের নৈশভোজের মতো বড় আয়োজন না করে এবার দলভেদে এক থেকে তিনজন করে সর্বোচ্চ ৫০-৬০ জনকে ডাকা হবে, আমন্ত্রণপত্র তৈরির কাজও চলছে। বিএনপির সূত্র জানায়, সংলাপে বার্তা দেওয়া হবে যে ঐক্যে ফাটল সবার জন্যই ক্ষতিকর; আওয়ামী লীগ রাজপথে ফিরতে পারলে সবচেয়ে বেশি আক্রোশের মুখে পড়বে বিএনপি, এরপর জাতীয় নাগরিক পার্টি, জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যরা।
২০২২ সালের ডিসেম্বরে শুরু হওয়া যুগপৎ আন্দোলনে চারটি জোটসহ নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত মোট ৪২টি দল সরাসরি যুক্ত ছিল, যাদের কেউ কেউ ২০০৮ সাল থেকেই বিএনপির সঙ্গী; বড় কর্মীবাহিনী না থাকলেও কয়েকটি দলের নেতাদের জাতীয় পরিচিতি তখন আন্দোলনে প্রভাব ফেলেছিল এবং তাঁরাও মামলা-হামলা ও নির্যাতনের শিকার হন। জোট নেতারা বলছেন, ১৪ বছরের বেশি সময় প্রলোভন ও চাপ উপেক্ষা করে তাঁরা কঠিন সময়ে বিএনপির পাশে থেকেছেন এবং জোটের সিদ্ধান্ত মেনেছেন, কিন্তু পটপরিবর্তনের পরও প্রত্যাশিত মূল্যায়ন না পাওয়ায় আক্ষেপ বাড়ছে। তাঁদের অভিযোগ, যুগপৎ আন্দোলনে যুক্ত হওয়া নতুন মিত্ররা অগ্রাধিকার পেয়েছে, পিছিয়ে পড়েছেন পুরোনো ২০-দলীয় জোটের শরিকেরা; প্রতিমন্ত্রী করা হয়েছে গণঅধিকার পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলন ও এনডিএমের একজন করে নেতাকে, পরে বিজেপির চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থ পেয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রীর দায়িত্ব।
জোট নেতাদের ভাষ্য, সরকার গঠনের পাঁচ মাস পর ২০ জুলাই যমুনায় নৈশভোজে তারেক রহমান যোগ্যতা অনুযায়ী যথাযথ মূল্যায়নের আশ্বাস দিলেও তার বাস্তবায়ন এখনো চোখে পড়েনি; কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন, এক যুগের বেশি বিএনপির সঙ্গে থেকে তাঁরা কী পেলেন। সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, যিনি বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও লিয়াজোঁ কমিটির সদস্য, বলেন, শরিকেরা আন্দোলনের সহযাত্রী ছিলেন এবং বিএনপির মতোই হামলা-মামলার শিকার হয়েছেন, তাই গণতন্ত্রের যাত্রা নির্বিঘ্ন রাখতে তাঁদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করতে হবে। তাঁর দাবি, যোগ্য প্রার্থী থাকার পরও জোটের স্বার্থে বেশ কিছু আসনে শরিক নেতাদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল, জয়ের পর অনেকে মন্ত্রী বা বিশেষ সহকারী হয়েছেন এবং বাকিদের বিষয়েও তারেক রহমান ইতিবাচক; ধাপে ধাপে সবার মূল্যায়ন হবে বলে তিনি আশা করেন।
সাইফুল হক, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক, বলেন, বিএনপি ও সরকারের সঙ্গে শরিকদের মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব দীর্ঘদিনের এবং সরকার গঠনের পর তা বেড়েছে; ন্যূনতম রাজনৈতিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে ৩১ দফা ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা গেলে বিএনপির প্রতি মানুষের আস্থা বাড়বে, আর সরকারপ্রধানের সংলাপ উদ্যোগকে তিনি ইতিবাচক বলে মনে করেন। লায়ন মো. ফারুক রহমান, ন্যাশনাল লেবার পার্টির চেয়ারম্যান, সংলাপকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ১২ দলীয় জোটে যোগ্য নেতা থাকলেও তাঁদের মূল্যায়ন হয়নি, তাই নির্বাচনের আগে-পরে বিএনপি চেয়ারম্যানের দেওয়া প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন চান তাঁরা। বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক পার্টির চেয়ারম্যান ও জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের মুখপাত্র এস এম শাহাদাত জানান, সংলাপের কথা শুনলেও দিনক্ষণ চূড়ান্ত হয়নি; সংলাপে তাঁরা জুলাই সনদের যৌক্তিক বিষয়গুলো তুলে ধরবেন এবং ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় ৩১ দফা ও জুলাই সনদের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধন নিয়ে মতামত দেবেন।






