আপনি হাই তুলছেন, কিছুক্ষণ পর আপনার পোষা কুকুরটিও হাই তুলছে—এমন অভিজ্ঞতা অনেকেরই আছে। কিন্তু অন্য কোনো কুকুরকে হাই তুলতে দেখলে আপনার কুকুরটি একই আচরণ করে না কেন? এর ব্যাখ্যা হয়তো লুকিয়ে আছে হাজার হাজার বছরের বিবর্তন এবং মানুষের সঙ্গে কুকুরের ঘনিষ্ঠ সহাবস্থানে।
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গবেষণা করেছেন জার্মানির লাইপজিগে অবস্থিত ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর ইভোল্যুশনারি অ্যানথ্রোপলজির ফেদেরিকা আমিচি এবং ইতালির রোমের লা সাপিয়েঞ্জা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাওলো চিউচ্চি। তাঁরা নেকড়ে এবং নেকড়ে-কুকুরের সংকর প্রাণীর হাই তোলার আচরণ পর্যবেক্ষণ করেছেন। গবেষণার ফল অ্যানিম্যাল কগনিশন সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। তথ্যসূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট।
হাই তোলা কি সামাজিক বন্ধনের ইঙ্গিত
মানুষের মতো অনেক প্রাণীর মধ্যেই একজনের হাই দেখে অন্যজনের হাই তোলার প্রবণতা দেখা যায়। শিম্পাঞ্জি, হাতি, শূকর ও নেকড়ের মধ্যে এমন আচরণ পাওয়া গেছে; কিছু পাখির ক্ষেত্রেও এ ধরনের দাবি রয়েছে। গবেষকদের ধারণা, অন্যের হাই অনুকরণ করা সামাজিক আচরণের একটি অংশ হতে পারে, যা একই দলের সদস্যদের মধ্যে যোগাযোগ ও পারস্পরিক বন্ধন জোরদার করতে ভূমিকা রাখে। শিম্পাঞ্জির ক্ষেত্রে পরিচিত সদস্যদের মধ্যে সংক্রামক হাই তোলার প্রবণতা বেশি দেখা যায়।
কুকুরের ক্ষেত্রে আচরণটি কিছুটা আলাদা। গবেষকদের মতে, নিজেদের প্রজাতিভুক্ত অন্য সদস্যের তুলনায় তারা মানুষের হাই অনুকরণে বেশি আগ্রহী।
নেকড়ে ও সংকর প্রাণীর আচরণে পার্থক্য
গবেষণার জন্য জার্মানি ও ইতালির পাহাড়ি এলাকায় বিশেষ ঘেরের মধ্যে রাখা ২০টি বিশুদ্ধ জাতের নেকড়ে এবং বন্য পরিবেশে নেকড়ে ও কুকুরের সংকরায়ণে জন্ম নেওয়া ১৩টি প্রাণীকে পর্যবেক্ষণ করা হয়। সংকর প্রাণীগুলোর বংশধারায় দুই থেকে তিন প্রজন্ম ধরে নেকড়ে ও কুকুরের জিনের মিশ্রণ ছিল। প্রতিটি প্রাণীকে ১৫ মিনিট দৈর্ঘ্যের ২২টি পর্যবেক্ষণ পর্বে দেখা হয়। এ সময় একটি প্রাণী হাই তুললে অন্য প্রাণীরা পরে একই আচরণ করে কি না, তা গবেষকেরা লিখে রাখেন।
ফলাফলে দেখা যায়, একটি বিশুদ্ধ জাতের নেকড়ে অন্য নেকড়ের হাই দেখার দুই মিনিটের মধ্যে হাই তুলেছে ৪১ শতাংশ ক্ষেত্রে। বিপরীতে নেকড়ে-কুকুরের সংকর প্রাণীদের ক্ষেত্রে একই প্রবণতা দেখা গেছে মাত্র ২৪ শতাংশ ক্ষেত্রে। গবেষকদের মতে, এই পার্থক্য ইঙ্গিত দেয়—গৃহপালিত হওয়ার দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় কুকুরের আচরণ বদলেছে। মানুষের সঙ্গে বসবাসের কারণে তারা মানুষের আচরণের প্রতি বেশি সংবেদনশীল হয়ে উঠতে পারে, একই সঙ্গে নিজ প্রজাতির সদস্যদের আচরণ অনুকরণের প্রবণতা কমে থাকতে পারে।
সামাজিকভাবে সক্রিয় নেকড়েরা বেশি প্রভাব ফেলে
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, কোনো নেকড়ে দলের নেতা কি না, তা অন্যদের হাই তোলাকে প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। বরং যে নেকড়ে দলের বেশি সদস্যের সঙ্গে সময় কাটাত, তার হাই দেখে অন্যদের হাই তোলার প্রবণতা বেশি ছিল। অর্থাৎ, দলের মধ্যে সামাজিকভাবে বেশি সক্রিয় নেকড়েরা অন্যদের আচরণে তুলনামূলক বেশি প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে আরেকটি চমকপ্রদ বিষয় উঠে এসেছে। দুটি প্রাণীর মধ্যে সম্পর্ক কতটা ঘনিষ্ঠ, তা পরবর্তী প্রাণীর হাই তোলার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেনি। শিম্পাঞ্জি ও বনোবোর মতো কিছু প্রাণীর ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠ সামাজিক সম্পর্ক সংক্রামক হাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। নেকড়ের ক্ষেত্রে গবেষকেরা একই ধরনের প্রভাব পাননি।
বন্য নেকড়ের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ এই গবেষণা
গৃহপালিত কুকুর ও বন্য নেকড়ের মধ্যে সংকরায়ণের ফলে শুধু শারীরিক বৈশিষ্ট্য নয়, আচরণগত বৈশিষ্ট্যও এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়তে পারে। গবেষকদের আশঙ্কা, কুকুরের সঙ্গে সংকরায়ণের ফলে বন্য নেকড়ের আচরণে আরও কিছু সূক্ষ্ম পরিবর্তন ঘটতে পারে, যা এখনো পুরোপুরি শনাক্ত হয়নি।
নেকড়েরা দলবদ্ধভাবে বসবাস করে এবং শিকার ধরার সময় নিজেদের মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখে। তাদের সামাজিক বন্ধন ও দলগত আচরণে বড় পরিবর্তন এলে শিকার, প্রজনন এবং বংশধরদের টিকে থাকার ওপর প্রভাব পড়তে পারে। তবে হাই অনুকরণের প্রবণতা কমে যাওয়াই যে নেকড়ের সামাজিক কাঠামো বা টিকে থাকার জন্য ক্ষতিকর হবে, তা এই গবেষণায় প্রমাণিত হয়নি। এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন বলে গবেষকেরা জানিয়েছেন।
Source: জাগো নিউজ২৪






