গাজীপুরের টঙ্গীতে অবস্থিত শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র (বালক) থেকে ভার্চ্যুয়াল শুনানির মাধ্যমে গত তিন সপ্তাহে ৫২ শিশু জামিন পেয়েছে। দূরবর্তী জেলার আদালতে শিশুদের শারীরিকভাবে হাজির করতে পরিবহন, নিরাপত্তা ও জনবলসংকটসহ নানা প্রতিবন্ধকতা থাকে। এমন পরিস্থিতিতে ভার্চ্যুয়াল শুনানি শিশুদের বিচারপ্রক্রিয়া সহজ ও গতিশীল করার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
দেশের ৩২ জেলার ৫৮টি শিশু আদালতের মামলায় আটক শিশুদের নিয়ে কাজ করে টঙ্গীর এই কেন্দ্র। ফলে এসব শিশুকে নিয়মিত দূরবর্তী আদালতে হাজির করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। পর্যাপ্ত যানবাহন, নিরাপত্তাকর্মী ও প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে অনেক সময় নির্ধারিত সময়ে শিশুদের আদালতে উপস্থাপন করা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে শুনানি বিলম্বিত হওয়ার পাশাপাশি শিশুদের দীর্ঘদিন কেন্দ্রে থাকার ঝুঁকিও তৈরি হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রটির অনুমোদিত ধারণক্ষমতা ৩০০ জন। তবে বাস্তবে অনেক সময় সেখানে ৯০০ থেকে ১ হাজার শিশুকে থাকতে হয়। অতিরিক্ত শিশুর চাপে আবাসন, শিক্ষা, চিকিৎসা, কাউন্সেলিং, নিরাপত্তা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিচালনায় সীমাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। এ অবস্থায় দ্রুত বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন করা এবং আইন অনুযায়ী জামিনের সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক মো. এমরান খান বলেন, ভার্চ্যুয়াল শুনানির ফলে শিশুদের আদালতে হাজির করার জটিলতা কিছুটা কমছে। তবে পর্যাপ্ত জনবল ও নিরাপত্তাকর্মীর অভাবে দূরবর্তী আদালতে শিশুদের নিয়ে যাওয়া এবং শুনানি শেষে কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনা সময়সাপেক্ষ। একটি শিশুকে আদালতে নিতে গেলে কেন্দ্রের অন্যান্য প্রশাসনিক ও সেবামূলক কার্যক্রমেও চাপ তৈরি হয়।
কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক মো. এমরান খানের তত্ত্বাবধানে প্রবেশন কর্মকর্তা আবু বকর সিদ্দিকী মজুমদার ও শাকিল মাহমুদ ভার্চ্যুয়াল শুনানি সমন্বয়ের কাজে যুক্ত রয়েছেন।
সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন ২০২৬ সালের ৯ জুলাই শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র (বালক), টঙ্গী পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি শিশুদের বিচারিক কার্যক্রম সহজ করতে ভার্চ্যুয়াল শুনানির গুরুত্ব তুলে ধরেন। দূরবর্তী আদালতগুলোর সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ ভার্চ্যুয়াল আদালত-সুবিধা চালু এবং কেন্দ্রে একজন ম্যাজিস্ট্রেটের ব্যবস্থা করার বিষয়েও তিনি গুরুত্বারোপ করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ‘বিদ্যমান শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র ৩টির সক্ষমতা বৃদ্ধি’ প্রকল্পের আওতায় টঙ্গী কেন্দ্রে নিয়োজিত প্রবেশন কর্মকর্তা শাকিল মাহমুদ বলেন, সব শিশু আদালতের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ ভার্চ্যুয়াল শুনানির ব্যবস্থা চালু করা গেলে এ সমস্যার অনেকটাই সমাধান সম্ভব। তবে এ ব্যবস্থা কার্যকর ও টেকসই করতে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট, উপযুক্ত প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম, প্রশিক্ষিত জনবল এবং আদালতগুলোর সঙ্গে সমন্বিত যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
শিশু আইন কী বলছে
শিশু আইন, ২০১৩ অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সি প্রত্যেক ব্যক্তি শিশু। আইনের ৪ ধারায় শিশুর সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ আইনে শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ, মর্যাদা, নিরাপত্তা, সংশোধন ও পুনর্বাসনকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আইনের ৬ ধারায় প্রবেশন কর্মকর্তার দায়িত্ব ও ভূমিকা নির্ধারণ করা হয়েছে। শিশুর সামাজিক অনুসন্ধান প্রতিবেদন তৈরি, আদালতকে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ এবং শিশুর আইনগত সহায়তা ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করা তাদের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত।
আইনের ২৯ ধারায় শিশু আদালতের জামিন দেওয়ার ক্ষমতা সম্পর্কে বলা হয়েছে। অপরাধ জামিনযোগ্য হোক বা অজামিনযোগ্য—প্রযোজ্য ক্ষেত্রে আদালত শিশুকে জামিন দিতে পারেন। তবে শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ, নিরাপত্তা ও সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতি বিবেচনা করে আদালত সিদ্ধান্ত নেন। জামিন নামঞ্জুর করা হলে তার কারণ লিপিবদ্ধ করার বিধানও রয়েছে।
এছাড়া আইনের ৪৭ থেকে ৫১ ধারায় বিকল্প পদ্ধতিতে বিরোধ নিষ্পত্তি বা ডাইভারশনের বিধান রয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো, উপযুক্ত ক্ষেত্রে শিশুকে আনুষ্ঠানিক বিচারপ্রক্রিয়ার বাইরে রেখে সংশোধন, পুনর্বাসন ও সমাজে পুনঃএকীভূত হওয়ার সুযোগ তৈরি করা।
আইনের ৩১ ধারায় শিশুকে আদালতে উপস্থাপনের পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সামাজিক অনুসন্ধান প্রতিবেদন প্রস্তুতের বিধান রয়েছে। এ প্রতিবেদনে শিশুর পারিবারিক অবস্থা, সামাজিক পরিবেশ, শিক্ষা, মানসিক পরিস্থিতি ও পুনর্বাসনের সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়। অন্যদিকে আইনের ৫২ ধারায় নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে শিশু বিষয়ক পুলিশ কর্মকর্তার মাধ্যমে শিশুকে জামিনে মুক্তি দেওয়ার বিধান রয়েছে। বাবা-মা, অভিভাবক বা প্রবেশন কর্মকর্তার জিম্মায় শিশুকে দেওয়ার ক্ষেত্রে আইন নির্ধারিত শর্ত অনুসরণ করতে হয়।
আইনের ৫৪ ধারায় শিশুর মর্যাদা, পরিচয় ও গোপনীয়তা রক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শিশু সাক্ষীর ক্ষেত্রে সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা, ক্যামেরা ট্রায়াল ও ভিডিও সংযোগের মতো পদ্ধতির বিধান রয়েছে। তবে শিশু সাক্ষীর জন্য ভিডিও সংযোগের সুযোগ থাকার অর্থ এই নয় যে সব ধরনের মামলায় সাধারণ ভার্চ্যুয়াল শুনানি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুমোদিত। এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন ও আদালতের নির্দেশনা অনুসরণ করতে হয়।
প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, শিশুদের বিচারপ্রক্রিয়ায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো গেলে আদালতে যাতায়াতের সময় ও ব্যয় কমার পাশাপাশি নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকিও কমবে। বিশেষ করে দূরবর্তী জেলার আদালতে মামলা থাকা শিশুদের ক্ষেত্রে এ ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে। তবে ভার্চ্যুয়াল শুনানির মাধ্যমে শিশুর ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার, আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শের সুযোগ এবং নিজের বক্তব্য উপস্থাপনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে শুনানির সময় শিশুর পরিচয় ও ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা এবং প্রযুক্তিগত ত্রুটি এড়ানোর ব্যবস্থাও থাকতে হবে।
কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক মো. এমরান খান বলেন, পর্যাপ্ত প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, প্রশিক্ষিত জনবল এবং আদালতগুলোর সঙ্গে সমন্বিত অনলাইন যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে ভার্চ্যুয়াল শুনানি আরও কার্যকর হবে। পাশাপাশি কেন্দ্রের ধারণক্ষমতা ও জনবলসংকট দূর করাও জরুরি।
শিশু আইন, ২০১৩-এর মূল দর্শন শিশুকে শাস্তির পরিবর্তে সংশোধন ও পুনর্বাসনের সুযোগ দেওয়া। ভার্চ্যুয়াল শুনানি সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে প্রযুক্তির এই সুবিধা যেন শুধু প্রশাসনিক কাজ সহজ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং প্রতিটি শিশুর দ্রুত, ন্যায়সংগত ও শিশুবান্ধব বিচার নিশ্চিত করার মাধ্যম হয়ে ওঠে।
Source: জাগো নিউজ২৪






