জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ঘরবাড়ি ও জীবিকা হারিয়ে সাতক্ষীরায় আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলোর বড় অংশ তীব্র খাদ্যসংকটে দিন কাটাচ্ছে। এসব পরিবারের ৭৪ দশমিক ৯ শতাংশ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে এবং ৯০ দশমিক ৮ শতাংশ পরিবারের ঘরে কোনো খাবার মজুত নেই। খাদ্যসংকটের পাশাপাশি নিরাপদ পানি, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থান নিয়েও চরম অনিশ্চয়তায় আছে তারা।
বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক (খানি) ও পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাকশন নেটওয়ার্ক (প্রাণ) পরিচালিত এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। আজ মঙ্গলবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
২০২৬ সালের আগস্ট মাসজুড়ে সাতক্ষীরা পৌরসভার ৩৫টি অনানুষ্ঠানিক বসতির ৩৫৮টি পরিবারের এক হাজার ৩৪১ জন সদস্যের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, সাতক্ষীরা পৌরসভার ৪৭টি বসতিতে আনুমানিক ৭ হাজার ৫৭৩টি জলবায়ু বাস্তুচ্যুত পরিবার বসবাস করছে। ২০২৪ সালের জুনের হিসাব অনুযায়ী এই সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়েছিল। স্থানীয় প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাস্তুচ্যুত পরিবারের সংখ্যা আরও বেড়েছে।
মাঝারি খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ২৩ শতাংশ
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, জরিপে অংশ নেওয়া ২৩ দশমিক ২ শতাংশ পরিবার মাঝারি খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে। খাদ্যনিরাপদ অবস্থায় থাকা কোনো পরিবার জরিপে পাওয়া যায়নি।
খাবার জোগাড় করতে গিয়ে ৫৭ দশমিক ৩ শতাংশ পরিবার তাদের উৎপাদনশীল সম্পদ বা প্রয়োজনীয় গৃহস্থালি সামগ্রী বিক্রি করেছে। শিশুদের খাবারের ব্যবস্থা করতে গিয়ে ৯৫ দশমিক ২ শতাংশ পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক সদস্য নিজেরা কম খেয়েছেন।
খাদ্যসংকটের প্রধান কারণ হিসেবে ৯৯ দশমিক ৪ শতাংশ পরিবার অর্থসংকট এবং ৭৮ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবার খাদ্যের উচ্চমূল্যকে দায়ী করেছে। পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের সুযোগও সীমিত। এসব পরিবারে সপ্তাহে গড়ে মাত্র ১ দশমিক ৯ দিন মাছ, মাংস বা ডিম, শূন্য দশমিক ৯ দিন দুধ এবং শূন্য দশমিক ৬ দিন ফল খাওয়ার সুযোগ হয়।
নিরাপদ পানির সংকট, বাড়ছে রোগ
খাদ্যসংকটের পাশাপাশি নিরাপদ পানির অভাবও প্রকট হয়ে উঠেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ৯৬ দশমিক ৯ শতাংশ পরিবার অন্তত আংশিকভাবে লবণাক্ত ও আয়রনযুক্ত অগভীর নলকূপের পানির ওপর নির্ভরশীল। মাত্র ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, তাদের খাবার পানির উৎস সব সময় পাওয়া যায়।
গত এক মাসে জরিপে অংশ নেওয়া ৫০ শতাংশ পরিবারের অন্তত একজন সদস্য পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। আক্রান্তদের মধ্যে ৫২ দশমিক ৫ শতাংশ আনুষ্ঠানিক চিকিৎসাসেবা পাননি।
উচ্ছেদের শঙ্কায় ৫৯ শতাংশ পরিবার
বাসস্থানের নিরাপত্তাহীনতাও বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর বড় উদ্বেগ। সরকারি জমিতে অনানুষ্ঠানিকভাবে বসবাসকারী ৫৯ শতাংশ পরিবার উচ্ছেদ বা উচ্ছেদের হুমকির মুখে রয়েছে। গত ১২ মাসে ৭৭ দশমিক ১ শতাংশ পরিবারের ঘরে পানি উঠেছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, উচ্ছেদের আশঙ্কায় থাকা পরিবারগুলোর পক্ষে ঘরবাড়ি, স্যানিটেশন ও জীবিকার উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
বাস্তুচ্যুতির সময় ৯২ দশমিক ৭ শতাংশ পরিবার গবাদিপশু বা হাঁস-মুরগি, ৬৩ দশমিক ৪ শতাংশ খাদ্য মজুত, ৪১ দশমিক ১ শতাংশ কৃষিজমি এবং ২৯ দশমিক ৯ শতাংশ মাছ ধরার সরঞ্জাম হারিয়েছে।
একসময় কৃষিকাজ, মাছ ধরা ও পশুপালনের সঙ্গে যুক্ত অনেকেই এখন দিনমজুরি, ভ্যান-রিকশা চালানো কিংবা গৃহকর্মের মতো পেশায় যুক্ত হয়েছেন। বাস্তুচ্যুতির আগের তুলনায় ৪৬ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষের আয় কমেছে। অন্যদিকে ৫২ দশমিক ৮ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, বাস্তুচ্যুতির পর পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবার কেনার সামর্থ্য কমেছে।
সহায়তার বাইরে ৭৯ শতাংশ পরিবার
গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ৭ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবার কোনো সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। গত ১২ মাসে ৭৯ দশমিক ১ শতাংশ পরিবার সরকারি বা বেসরকারি কোনো ধরনের সহায়তা পায়নি। সরকারি আবাসন কর্মসূচিতে আবেদন করতে পেরেছে মাত্র ৩ দশমিক ১ শতাংশ পরিবার।
জাতীয় পরিচয়পত্র, স্থায়ী ঠিকানা ও ভোটার নিবন্ধনের জটিলতা এবং প্রয়োজনীয় তথ্যের অভাবকে সহায়তা পাওয়ার প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এমনকি সহায়তা না পেলে কোথায় অভিযোগ জানাতে হবে, তা জানেন না ৯২ দশমিক ৭ শতাংশ পরিবার।
শিক্ষার বাইরে ৩৩ শতাংশ শিশু-কিশোর
বাস্তুচ্যুতির প্রভাব পড়েছে শিশুদের শিক্ষা ও সামাজিক জীবনেও। গবেষণায় বলা হয়েছে, ৬ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ বিদ্যালয়ের বাইরে রয়েছে। ১৬ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের মধ্যে বিদ্যালয়ে যাচ্ছে মাত্র ৩৫ দশমিক ৩ শতাংশ। বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা শিশু-কিশোরদের ৩০ শতাংশ শিশুশ্রমে যুক্ত।
গবেষণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেছেন, বাস্তুচ্যুতির ক্ষতি শুধু ঘরবাড়ি, জমি কিংবা সম্পদ হারানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ঠিকানা ও পরিচয় হারানো, সামাজিক বন্ধন ভেঙে যাওয়া, নতুন এলাকায় বৈষম্যের শিকার হওয়া, শিশুদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়া, বাল্যবিবাহ এবং দীর্ঘ অনিশ্চয়তা থেকে তৈরি মানসিক চাপও এর অংশ। এসব ক্ষতি অর্থের হিসাবে সহজে পরিমাপ করা যায় না।
দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির বাস্তবতা
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ মূল্যায়নের বরাত দিয়ে গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে বাংলাদেশে দুর্যোগের কারণে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত ছিলেন। তাদের প্রায় ৬৩ শতাংশ ২০২০ সালের এপ্রিলের আগেই বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। অর্থাৎ অনেকের জন্য বাস্তুচ্যুতি সাময়িক সংকট নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী বাস্তবতা।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ‘এশিয়া-প্যাসিফিক ক্লাইমেট রিপোর্ট ২০২৬’-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, পানির সংকট ও কৃষি উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ার কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের প্রায় ১ কোটি ৩৩ লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণ জলবায়ু অভিবাসীতে পরিণত হতে পারেন।
নীতিমালা থাকলেও বাস্তবায়ন সীমিত
গবেষণায় বাংলাদেশের বিদ্যমান নীতিমালা ও বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে বড় ব্যবধানের কথা তুলে ধরা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি ব্যবস্থাপনা বিষয়ক জাতীয় কৌশলপত্র ২০২১-এ বাস্তুচ্যুত মানুষের সামাজিক ভাতা অব্যাহত রাখা, নতুন ঠিকানায় জাতীয় পরিচয়পত্র ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ব্যবস্থা, ভূমির নিরাপত্তা, জীবিকা সহায়তা এবং কাগজপত্রের অভাবে শিশুদের শিক্ষাবঞ্চিত না করার অঙ্গীকার রয়েছে। এ ছাড়া জাতীয় কর্মপরিকল্পনা ২০২২-২০৪২, জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা ২০২৩-২০৫০ এবং বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনাতেও এসব বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে।
তবে গবেষণার তথ্য বলছে, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে বাস্তুচ্যুত মানুষের অংশগ্রহণ কম, ভূমির নিরাপত্তা নেই এবং বিপুলসংখ্যক শিশু শিক্ষার বাইরে রয়েছে।
কপ৩১-এ যেসব সুপারিশ
আগামী ৯ থেকে ২০ নভেম্বর তুরস্কের আনাতোলিয়ায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন কপ৩১। সম্মেলনে বাংলাদেশের অবস্থানে জলবায়ু বাস্তুচ্যুত মানুষের অধিকার, খাদ্যনিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের বিষয়গুলো গুরুত্ব দেওয়ার সুপারিশ করেছে খানি ও প্রাণ।
সংগঠন দুটি বলেছে, জলবায়ু বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর জন্য সরকারি খাসজমিতে স্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা, কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়ন, জরুরি খাদ্যসহায়তা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্তি এবং নিরাপদ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
পুনর্বাসন ছাড়া কোনো পরিবারকে উচ্ছেদ না করা, জাতীয় পরিচয়পত্র ও ভোটার নিবন্ধনের জন্য বসতিভিত্তিক ভ্রাম্যমাণ ক্যাম্প আয়োজন এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের অভাবে কোনো শিশুকে বিদ্যালয়ে ভর্তি থেকে বঞ্চিত না করার সুপারিশও করেছে সংগঠন দুটি।
কপ৩১-এ ক্ষয়ক্ষতি ও বিনষ্টি মোকাবিলা তহবিলের অর্থায়নে বাংলাদেশের জাতীয় কৌশলপত্র বাস্তবায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানানোর পাশাপাশি জলবায়ু অভিযোজনের অর্থায়নে শহরের অনানুষ্ঠানিক বসতিতে থাকা বাস্তুচ্যুত মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি, পূর্বানুমানযোগ্য ও অনুদানভিত্তিক অর্থায়ন নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, দুর্যোগ শেষ হলেও বাস্তুচ্যুত মানুষের সংকট শেষ হয় না। বরং ঘর হারানোর পর শুরু হয় খাদ্য, পানি, আবাসন, জীবিকা ও মর্যাদা রক্ষার দীর্ঘ লড়াই। তাই শুধু জরুরি ত্রাণ নয়, জলবায়ু বাস্তুচ্যুত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং জীবিকার টেকসই পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
Source: জাগো নিউজ২৪






