প্রকাশনা ও সাহিত্যজগতের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক আয়োজনগুলোর একটি ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা এবার শুরু হচ্ছে ৭ অক্টোবর, চলবে ১১ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত। পাঁচ দিনের এ মেলায় ফ্রাঙ্কফুর্টের মেসে প্রাঙ্গণে জড়ো হবেন নানা দেশের প্রকাশক, লেখক, বই বিক্রেতা, সাহিত্য এজেন্ট, অনুবাদক ও পাঠক। শরতের এই সময়ে লাখো বইপ্রেমীর ভিড়ে মুখর হয়ে ওঠে শহরটি।
এবারের অতিথি দেশ চেক প্রজাতন্ত্র, যা চেকিয়া নামেও পরিচিত। ‘চেকিয়া: সমুদ্রতীরের একটি দেশ’ প্রতিপাদ্য নিয়ে দেশটি তার সাহিত্য, সংস্কৃতি ও প্রকাশনাশিল্প তুলে ধরবে; আয়োজকদের তথ্যমতে কবিতা, কথাসাহিত্য, নাট্যসাহিত্য, চিত্রকাহিনি, তথ্যভিত্তিক লেখা ও শিশু-কিশোর সাহিত্যের ৭৫ জন চেক লেখক এতে অংশ নেবেন। দেশটির ৪০টির বেশি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থাকবে, আর পাঁচ দিন ধরে চলবে সাহিত্যপাঠ, আলোচনা, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, পেশাগত মতবিনিময় এবং বইয়ের স্বত্ব ও অনুবাদস্বত্ব নিয়ে ব্যবসায়িক বৈঠক।
আয়োজকদের হিসাবে, ২০২৫ সালের মেলায় ১৩১টি দেশের ২ লাখ ৩৮ হাজার দর্শনার্থী এসেছিলেন, প্রদর্শক প্রতিষ্ঠান ছিল ৪ হাজার ৩৫০টি। পেশাজীবী ও সাধারণ দর্শনার্থীর আলাদা হিসাব কিংবা গণমাধ্যমকর্মী ও মোট অনুষ্ঠানের সংখ্যা নিয়ে প্রকাশিত তথ্যে ভিন্নতা রয়েছে। এবারের মেলার দর্শনার্থী ও প্রদর্শকের চূড়ান্ত সংখ্যা এখনো প্রকাশ হয়নি, তবে গত বছরের আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণ বিবেচনায় এবারও বড় সমাগমের আশা করা হচ্ছে।
ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা কেবল বই দেখানো বা বেচাকেনার জায়গা নয়, এটি আন্তর্জাতিক প্রকাশনা ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্রও। এখানে প্রকাশকেরা বইয়ের আন্তর্জাতিক স্বত্ব, অনুবাদস্বত্ব, চলচ্চিত্র-টেলিভিশন স্বত্ব ও ডিজিটাল কনটেন্টের বাজার নিয়ে দর-কষাকষি করেন; উপন্যাস, শিশুতোষ ও গবেষণাধর্মী বইয়ের পাশাপাশি চলচ্চিত্র, গেমস ও ভার্চুয়াল রিয়েলিটির মতো ডিজিটাল কনটেন্টও আলোচনায় আসে। ফলে বড় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান, সাহিত্য এজেন্সি, অনুবাদক ও স্বত্ব-ব্যবসায়ীদের কাছে এটি বছরের অন্যতম প্রধান মিলনকেন্দ্র।
প্রকাশনাশিল্পে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে যে বিতর্ক, তার প্রভাবও দেখা যাচ্ছে মেলায়। লেখক-প্রকাশকের অধিকার, কপিরাইট, অনুবাদ ও ডিজিটাল প্রকাশনা এবং বই লেখায় এআইয়ের ব্যবহার এখন আন্তর্জাতিক প্রকাশনাজগতের আলোচিত বিষয়; আয়োজকদের প্রতিবেদন বলছে, ২০২৫ সালের মেলার নানা আলোচনাতেও এআই ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তন গুরুত্ব পেয়েছিল। এবারের এআই-বিষয়ক অধিবেশনগুলোর বিস্তারিত জানা যাবে পুরো কর্মসূচি প্রকাশের পর।
শুরুর দিনগুলোতে প্রকাশনা পেশাজীবীদের ভিড় বেশি থাকলেও আয়োজকেরা জানিয়েছেন, ৯ থেকে ১১ অক্টোবর মেলা সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকবে; তখন পাঠকেরা লেখকদের সঙ্গে দেখা, আলোচনা, পাঠ ও স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারবেন। এবারের কর্মসূচিতে জার্মান লেখক কর্নেলিয়া ফুনকে, পুলিৎজার পুরস্কারজয়ী লেখক জিল লেপোর, শিদা বাজিয়ার ও ইয়াং শুয়াং-জিসহ কয়েকজন খ্যাতিমান লেখকের অংশ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন আয়োজকেরা। পেশাজীবীদের বৈঠক আর সাধারণ দর্শনার্থীদের সাহিত্য-আয়োজনে অংশগ্রহণ সহজ করতে হলের বিন্যাসেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
বাংলাদেশের প্রকাশনাশিল্পের জন্যও মেলাটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মঞ্চ হয়ে উঠতে পারে। দেশের লেখকদের বই অন্য ভাষায় অনুবাদ করানো, বিদেশি প্রকাশকদের সঙ্গে সংযোগ গড়া, স্বত্ব বিক্রি এবং দেশের সাহিত্যকে বিশ্বপাঠকের সামনে আনায় এমন মেলা ভূমিকা রাখতে পারে। পাঠকের রুচিবদল, অনুবাদবাজারের বিস্তার ও প্রযুক্তির প্রভাবের মতো বিষয়ও মেলার আলোচনায় গুরুত্ব পায়।





