প্রায় তিন দশক প্রবাসে কাটিয়ে, যার ২৭ বছরই পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না, দেশে ফিরেছেন শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার আমির হোসেন। বাতিক এয়ারের একটি ফ্লাইটে (OD162) মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১২টা ২০ মিনিটে তিনি ঢাকায় নামেন; স্বামীকে ফিরে পেয়ে আবেগাপ্লুত স্ত্রী রোকেয়া বেগম ও পরিবারের সদস্যরা।
চামটা ইউনিয়নের দিনারা গ্রামের এই দম্পতির তিন ছেলে ও তিন মেয়ে। অভাব ঘোচাতে ১৯৯৬ সালে পরিবারের জমি বেচে দালালের মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় গিয়ে রংমিস্ত্রির কাজ নেন আমির। প্রথম তিন বছর টাকা পাঠাতেন ও খোঁজ রাখতেন, এরপর হঠাৎ যোগাযোগ বন্ধ; পরের ২৭ বছর তিনি বেঁচে আছেন কি না, তা-ও জানত না পরিবার।
স্বজনদের সহায়তায় অনেক কষ্টে ছয় সন্তানকে বড় করেন রোকেয়া। ছয় মাস আগে মালয়েশিয়ার পেনাংয়ের একটি জঙ্গলে ছোট্ট টিনের ঘরে মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় আমিরকে খুঁজে পান প্রবাসী দিপু এবং প্রবাসী সাংবাদিক বাপ্পি কুমার দাস। তাঁরা তাঁর ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করলে পরিবার তাঁকে চিনতে পারে এবং ভিডিও কলে কথা বলে।
এরপর মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাস পরিচয় যাচাইয়ের তথ্য পাঠায় নড়িয়া উপজেলা প্রশাসনে; জন্মনিবন্ধনসহ কাগজপত্র তৈরি করে পাঠানো হলে দূতাবাস তাঁকে ট্রাভেল পাস দেয়। বিমানবন্দরে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম, প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক ও সিভিল অ্যাভিয়েশন সিকিউরিটির (এভসেক) সহায়তায় পরিবার তাঁকে গ্রহণ করে; এখন তিনি কেরানীগঞ্জে ছোট ছেলে শহীদুল ইসলামের বাসায় বিশ্রামে।
রোকেয়া বেগম জানান, ছয়টি ছোট সন্তান রেখে স্বামী বিদেশে যান, তিন বছর পর টাকা আসা বন্ধ হয়ে যায় এবং ২৭ বছর কোনো খবর ছিল না; ছয় মাস আগে ভিডিও দেখে তাঁকে চিনতে পারেন। তাঁর ভাষায়, ‘এটি আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত।’ ছেলে বাবু তালুকদার জানান, বাবা যখন যান তখন তাঁর বয়স মাত্র ছয় বছর; প্রবাসীদের সহায়তায় বাবাকে ফিরে পাওয়া তাঁদের কাছে অকল্পনীয়, অসুস্থ বাবার শিগগির চিকিৎসা করানো হবে।
পরিবার জানায়, তিন বছর আগে মারা গেছেন দম্পতির বড় ছেলে, তিন মেয়ের বিয়ে হয়েছে আর দুই ছেলে ঢাকায় শ্রমিকের কাজ করেন। ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) হিসেবে কর্মরত শরিফুল হাসান ৩০ বছর প্রবাসে থেকে ২৭ বছর পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকাকে অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং প্রবাসজীবনের অনিশ্চয়তার বাস্তব উদাহরণ বলে উল্লেখ করেন। প্রযুক্তির এ যুগে প্রত্যেক প্রবাসীর তথ্য নিয়ে ডাটাবেজ থাকা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
নড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল কাইয়ূম জানান, দূতাবাসের পাঠানো তথ্য যাচাই করে পরিবারের সঙ্গে মিলিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করার পর কাগজপত্র পাঠানো হয়। ভবিষ্যতেও উপজেলা প্রশাসন তাঁর পাশে থাকবে বলে জানান তিনি।




