রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছে বিএনপি। দলীয় একটি সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী ও দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে শীর্ষ ও জ্যেষ্ঠ নেতাদের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়, এরপরই তিনি দলের মহাসচিব, স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর পদ ছেড়ে দেন। দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

নির্বাচন কমিশনের তপশিল অনুযায়ী মনোনয়নপত্র জমার সময় ছিল ১৩ আগস্ট সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যে। ১৬ আগস্ট যাচাই-বাছাইয়ের পর ১৮ আগস্ট বিকেল ৪টা পর্যন্ত প্রার্থিতা প্রত্যাহার করা যাবে, আর ২০ আগস্ট ভোট হওয়ার কথা জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে। রাষ্ট্রপতির পদে তার সম্ভাব্য অভিষেকের পেছনে দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলাকেই বড় কারণ হিসেবে দেখছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা—দুঃসময়ে দায়িত্ব পালন, আন্দোলনে সক্রিয়তা এবং দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখার চেষ্টা তার পরিচয়ের বড় অংশ।

মির্জা ফখরুলের জন্ম ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি, ঠাকুরগাঁওয়ে; সেখানকার স্থানীয় রাজনীতি থেকেই একসময় জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে উঠে আসেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতির ছাত্র থাকাকালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের মাধ্যমে রাজনীতিতে তার হাতেখড়ি; ষাটের দশকের আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান ও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের বাস্তবতা তার রাজনৈতিক ভাবনায় প্রভাব রাখে। পড়াশোনা শেষে সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়ে ঢাকা কলেজে অর্থনীতি পড়াতে শুরু করেন, পরে সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরে ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান হন।

নব্বইয়ের আন্দোলনের সময় তিনি বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হন এবং ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও থেকে জিতে দলের নেতৃত্বাধীন সরকারে দায়িত্ব পান। কৃষি এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সামলানোর পর বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীও ছিলেন তিনি। তবে ২০০৯ সালের পর থেকে শুরু হয় তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কঠিন পর্ব।

বিএনপির কাউন্সিলে তারেক রহমান সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবের পদ ছেড়ে দিলে সেই দায়িত্ব পান মির্জা ফখরুল, তখন থেকে জাতীয় রাজনীতিতে তার ভূমিকা আরও স্পষ্ট হয়। তারেক রহমানের দীর্ঘ প্রবাসজীবন ও খালেদা জিয়ার কারাবাসের সময় রাজপথের আন্দোলনে তিনি ছিলেন দলের প্রধান মুখগুলোর একজন; মামলা, গ্রেপ্তার, কারাবরণ ও আদালতে হাজিরার মধ্যেও তিনি সামনের সারিতে ছিলেন। দলকে সাংগঠনিকভাবে ধরে রাখায় তার ভূমিকার কথা বিএনপির নেতারা বিভিন্ন সময়ে তুলে ধরেছেন।

সংযত বক্তব্য ও পরিমিত ভাষাকে তার রাজনৈতিক পরিচয়ের আরেকটি দিক হিসেবে দেখা হয়; উত্তেজনার মধ্যেও আক্রমণের বদলে যুক্তি দিয়ে অবস্থান তুলে ধরা এবং প্রতিপক্ষের প্রতি শালীন আচরণের কারণে বিভিন্ন মহলে তার গ্রহণযোগ্যতার কথা আলোচিত হয়। বিএনপির নেতাকর্মীদের একাংশের মতে, তার অভিজ্ঞতা, দলীয় আনুগত্য, ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি ও জাতীয় রাজনীতিতে দীর্ঘ ভূমিকা বিবেচনা করেই এ মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে, তৃণমূলের নেতাকর্মীরাও তার ওপর আস্থা রাখেন। সংকটের সময় রাষ্ট্রপতির কাছে রাজনৈতিক ভারসাম্য, সাংবিধানিক দায়িত্ববোধ ও জাতীয় ঐক্যের ভূমিকা প্রত্যাশিত, আর সেই দায়িত্ব তিনি পালন করতে পারবেন বলে মনে করছে দলটির সংশ্লিষ্ট মহল।

নেতাকর্মীদের ভাষ্য, খালেদা জিয়ার মুক্তি, তারেক রহমানের দেশে ফেরা এবং নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় ফেরা—বিএনপির দীর্ঘদিনের এই তিন প্রত্যাশার সঙ্গেই জড়িয়ে ছিল মির্জা ফখরুলের পথচলা; তাই ক্ষমতায় ফেরার পর রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে তার নাম আসাকে দীর্ঘ সংগ্রামের পরিণতি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি; মনোনয়নপত্র বাছাই ও প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পরই পরের ধাপ স্পষ্ট হবে।