বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বের শেষ দিনে দলীয় নেতাকর্মী ও সহযোদ্ধাদের উদ্দেশে ফেসবুকে আবেগঘন বিদায়ী বার্তা দিয়েছেন নাছির উদ্দীন নাছির। শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকালে নিজের ভেরিফায়েড প্রোফাইলে দেওয়া দীর্ঘ পোস্টে সংগঠনে কাজের দীর্ঘ সময়ে পাশে থাকার জন্য দলের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে শুরু করে ছাত্রদলের নেতাকর্মী ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নেতাদের ধন্যবাদ জানান তিনি। এর আগে বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) রাতে ছাত্রদলের শীর্ষ পাঁচ নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে গুলশানে বিএনপির চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে বিদায়ী সাক্ষাৎ করেন।
পোস্টে নাছির লেখেন, ওয়ান ইলেভেনের দুঃসময়ে তার রাজনীতির হাতেখড়ি, আর সতেরো বছরের দীর্ঘ অনিশ্চয়তা পেরিয়ে আজ তারা উজ্জ্বল ভিন্ন এক বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে আছেন; এ যাত্রায় ত্যাগ, সংগ্রাম, নির্যাতন আর গুম-খুনের ভয়াবহতা ছিল উল্লেখ করে এ সময়ে নির্যাতিত, গুম ও খুনের শিকার নেতাকর্মীদের তিনি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন। তার ভাষায়, তাদের ত্যাগের ওপরই আজকের শক্ত অবস্থান দাঁড়িয়ে আছে। নোয়াখালীর সুবর্ণচর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসে ক্যাম্পাসে ছাত্রদলে যুক্ত হওয়ার কথা স্মরণ করে তিনি লেখেন, রাজনীতি কেবল পদ-পদবির ব্যাপার নয়, বরং মানুষের জন্য কাজ করা, সংকটে পাশে থাকা আর নিজের বিশ্বাসে অটল থাকার দীর্ঘ পথচলা, যে পথে ছাত্রদল তাকে অনেক কিছু দিয়েছে।
নাছির জানান, বেগম খালেদা জিয়ার আপসহীন নেতৃত্ব, দৃঢ়তা ও গণতন্ত্রের প্রতি অবিচল অবস্থান সব সময় তাকে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। ২০২৪ সালের ১লা মার্চ দায়িত্ব নেওয়ার পর কঠিন রাজনৈতিক বাস্তবতা পার করতে হয়েছে এবং সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় ছিল সে বছরের জুলাই-আগস্ট, যখন নেতাকর্মীদের রাজপথে সক্রিয় রাখা, সাহস জোগানো এবং সংগঠনের সব স্তরকে আন্দোলনে যুক্ত রাখাই ছিল প্রধান চ্যালেঞ্জ। তিনি লেখেন, সেই আন্দোলনে ছাত্রদলের অগণিত নেতাকর্মী জীবন বাজি রেখে রাজপথে ছিলেন, ঢাকার পাঁচ বিশ্ববিদ্যালয়, পাঁচ কলেজ ও চার মহানগরের তৎকালীন নেতৃত্ব অসাধারণ ভূমিকা রেখেছিলেন, আর এমন অনেকের নাম হয়তো ইতিহাসে থাকবে না, কিন্তু যেকোনো গণআন্দোলনের পেছনে থাকে হাজারো পরিচয়হীন, নির্ভীক তরুণের ত্যাগ।
আন্দোলনের সময় হান্নান মাসুদ, রিফাত রশিদ, নাহিদ, আসিফ, হাসনাত, সারজিস, কাদের ও মাহিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার কথা উল্লেখ করে নাছির লেখেন, তখন তারা ছাত্রদলকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন; পরে রাজনৈতিক বাস্তবতায় হয়তো ছাত্রদলের অবদান তারা সব সময় সমানভাবে স্বীকার করেননি, তবু সংকটকালের সেই সহযোগিতার জন্য তিনি কৃতজ্ঞ। এর কিছুদিন পরই নোয়াখালী-ফেনী অঞ্চলে বন্যা ভয়াবহ রূপ নিলে খালেদা জিয়া তাকে এলাকার সন্তান হিসেবে দ্রুত বন্যার্তদের পাশে দাঁড়াতে বলেন এবং সে রাতেই তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ফোন করে একই নির্দেশনা দিলে রাতেই তিনি ফেনীর পথে রওনা হন বলে লেখেন নাছির। দুই দিন পর রাকিবসহ সুপার ফাইভের অন্য নেতারাও ফেনীসহ বৃহত্তর নোয়াখালীতে যান; তখনই তারা বুঝেছিলেন, দুর্দিনে মানুষের পাশে থাকাই রাজনীতির আসল পরিচয়।
নাছিরের ভাষ্য, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে মব সংস্কৃতি, নানা প্রচারণা, অপপ্রচার, বিভ্রান্তি ও রাজনৈতিক চাপের মধ্যে ছাত্রদলকে রাজপথে সক্রিয় ও ঐক্যবদ্ধ রাখা এবং দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করা সহজ ছিল না। তার দায়িত্বকালে দুই হাজারেরও বেশি সাংগঠনিক কমিটি গঠিত হয়েছে, যাকে তিনি কারও একক কৃতিত্ব নয়, বরং সর্বস্তরের নেতাকর্মীর সম্মিলিত শ্রমের ফল বলে উল্লেখ করেন। তবে কেন্দ্রীয় কমিটির বর্ধিত অংশসহ অল্প কয়েকটি কমিটি শেষ করতে না পারায় আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করেন তিনি এবং যোগ্যতা থাকার পরও যারা সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক হতে পারেননি, তাদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে লেখেন, পদই কারও যোগ্যতার একমাত্র মাপকাঠি নয়।
ছাত্রসংসদ নির্বাচনে প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ার বিষয়টি এখনো তাকে পীড়া দেয় বলে লেখেন নাছির; ঘাটতি কোথায় ছিল, সে প্রশ্ন নিজেকে বারবার করেছেন জানিয়ে তিনি আশা প্রকাশ করেন, এ অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ছাত্রদল ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী, গ্রহণযোগ্য ও সংগঠিত হয়ে উঠবে। পোস্টে তিনি খালেদা জিয়া ও চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পাশাপাশি রুহুল কবির রিজভী, মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং বিএনপির ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক আলহাজ রকিবুল বকুলসহ জ্যেষ্ঠ নেতাদের পরামর্শ ও অভিভাবকত্বের জন্য কৃতজ্ঞতা জানান। পদ-পদবির প্রত্যাশা ছাড়াই যারা সংগঠনের জন্য কাজ করেছেন, তাদের পাশাপাশি পরিবার, বন্ধু ও সাংবাদিকদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান তিনি; ভুল-ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা থাকলেও ছাত্রদলের স্বার্থের বাইরে কাজ করার ইচ্ছা কখনো ছিল না দাবি করে কাউকে কষ্ট দিয়ে থাকলে ক্ষমাও চান।
নাছির লেখেন, ‘আজ দায়িত্ব থেকে বিদায় নিচ্ছি, কিন্তু ছাত্রদল থেকে নয়।’ নতুন নেতৃত্বের প্রতি পূর্ণ আস্থা জানিয়ে তিনি বলেন, প্রয়োজনে তাদের ডাকে আগের মতোই পাশে থাকবেন এবং অন্য কোনো প্ল্যাটফর্মে, অন্য কোনো দায়িত্বে আবার দেখা হবে। পোস্টের শেষে ছাত্রদলের প্রত্যেক সহযোদ্ধার সুন্দর আগামী এবং বাংলাদেশের গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হওয়ার প্রত্যাশা জানান তিনি।






