ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলো থেকে সাতজন আলোচিত নেতা বড় প্রত্যাশা নিয়ে বিএনপিতে এসেছিলেন; তাদের কেউ ছিলেন নিজ দলের চেয়ারম্যান, কেউ মহাসচিব, কেউ প্রভাবশালী রাজনীতিক, আর ধানের শীষ নিয়ে ভোটে লড়তে কেউ কেউ নিজের দলই বিলুপ্ত করেন। নির্বাচনের আগে-পরে আরও বেশ কয়েকজন নেতা দলটিতে যোগ দেন, যারা সবাই বিগত সরকারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। কিন্তু যোগদানের ছয় মাস পরও দলে সাংগঠনিক পদ না থাকায় তারা এখন পরিচয়ের সংকটে, এলাকায় স্থানীয় নেতাদের সঙ্গেও তৈরি হয়েছে দূরত্ব।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এদের কেউ কেউ সংসদ সদস্য হলেও মন্ত্রিসভায় জায়গা পাননি, কেউ প্রতিমন্ত্রী হয়েও দলে কোনো পদ পাননি, আর পরাজিতরা তাকিয়ে আছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মূল্যায়নের দিকে; এর মধ্যে গণঅধিকার পরিষদ থেকে আসা রাশেদ খানকে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব করা হয়েছে। যোগ দেওয়া একাধিক নেতা সংবাদমাধ্যমকে বলেন, সাধারণ সদস্য হিসেবে পরিচিত হওয়ায় এলাকায় তারা রাজনৈতিক গুরুত্ব পাচ্ছেন না, ভোটের সময় বিদ্রোহী প্রার্থীদের পাশে থাকা লোকজন এখনো তাদের সঙ্গেই আছেন এবং নতুনদের কাকে কোথায় রাখা হবে, সে বিষয়ে কোনো নির্দেশনাও নেই। সংকট কাটাতে তারা দলের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে কথা বলছেন, আর তাদের অনুসারীরাও সাংগঠনিক পরিচয় না থাকায় কর্মী-সমর্থকদের প্রশ্নের মুখে পড়ছেন।
জাতীয় রাজনীতি ও জুলাই সনদের পক্ষে নানা কর্মসূচি চালাতে সম্প্রতি তারা গড়েছেন ‘আমরা বাংলাদেশি’ নামের একটি প্ল্যাটফর্ম; তাদের দাবি, আন্দোলনের কঠিন সময়ে বিএনপির পক্ষে সক্রিয় থাকায় দল ও সরকারে যথাযথ মূল্যায়ন তাদের প্রাপ্য। বিএনপির দায়িত্বশীল সূত্রের ভাষ্য, নতুনদের বিষয়টি নেতৃত্ব সময় ও প্রয়োজন বুঝে বিবেচনা করবে এবং জাতীয় কাউন্সিলের আগে বড় পরিসরে পদ দেওয়া কঠিন, যদিও এর মধ্যেই বেলায়েত হোসেন মৃধাকে গত ১৬ মার্চ বিশেষ সম্পাদক এবং ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদলকে ২৯ এপ্রিল আইনবিষয়ক সম্পাদক করা হয়েছে। দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী সংবাদমাধ্যমকে বলেন, আগে যারা যোগ দিয়েছেন তাদের সবাইকে বিএনপি মূল্যায়ন করেছে, নতুনদেরও যোগ্যতা অনুযায়ী সামনে মূল্যায়ন করা হবে, তবে ‘কতদিন লাগতে পারে, এটা বলা কঠিন’।
নিজেদের দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে আসা শাহাদাত হোসেন সেলিম (বাংলাদেশ এলডিপির সাবেক চেয়ারম্যান) ও সৈয়দ এহসানুল হুদা (বাংলাদেশ জাতীয় দলের সাবেক চেয়ারম্যান) একসময় বিএনপি নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ ছিলেন; ২০ দলীয় জোটে দীর্ঘদিন থাকার পর ১২ দলীয় জোট গড়াতেও ভূমিকা ছিল তাদের, এরপর ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দুজনই বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৭৮ সালে দলটির প্রতিষ্ঠার সময় ছাত্রদল দিয়ে রাজনীতি শুরু করা সেলিম প্রায় দুই দশক পর ফিরে লক্ষ্মীপুর-১ আসনে ধানের শীষ নিয়ে সংসদ সদস্য হয়েছেন; তার ভাষ্য, আন্দোলন ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কাজে বিএনপির পক্ষে সক্রিয় থাকলেও দলে কোনো পদ না থাকায় জাতীয় পর্যায়ে কাজের সুযোগ কমে যাচ্ছে। বাবা সৈয়দ সিরাজুল হুদার ১৯৭৬ সালে গড়া প্রায় ৫০ বছরের পুরোনো দলটি বিলুপ্ত করে ২০২৫ সালের ২২ ডিসেম্বর যোগ দেওয়া এহসানুল হুদা জানান, কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে তিনি নিয়মিত তৃণমূল গোছানোর কাজ করছেন এবং দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান যথাসময়ে এর মূল্যায়ন করবেন বলে আশা করেন।
এলডিপির সাবেক মহাসচিব রেদোয়ান আহমদ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ১৯৮৬ ও ১৯৯১ সালে জিতেছিলেন, ১৯৯৬ সালে বিএনপিতে এসে খালেদা জিয়ার সরকারে প্রতিমন্ত্রী হন এবং ২০০৬ সালে এলডিপিতে গেলেও সর্বশেষ নির্বাচনের আগে অনুসারীদের নিয়ে আবার ফেরেন, কিন্তু কুমিল্লা-৭ আসনে ধানের শীষ নিয়ে দলের বিদ্রোহী প্রার্থীর কাছে হেরে যান। সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেন, স্থানীয় কয়েক হাজার নেতাকর্মী নিয়ে যোগ দিয়ে তিনি এলাকায় দলের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন, তবে স্থানীয় বিএনপির একাংশ তার পাশে থাকলেও অন্য অংশ এখনো বিদ্রোহী প্রার্থীর সঙ্গে; পুনর্গঠনের সময় তাদের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে বলে তিনি আশাবাদী। সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়ার সন্তান রেজা কিবরিয়া গণফোরাম, গণঅধিকার পরিষদ ও আমজনতা দল ঘুরে ২০২৫ সালের নভেম্বরে বিএনপিতে আসেন এবং হবিগঞ্জ-১ আসনে ধানের শীষে জয়ী হন; তিনি বলেন, যোগ দেওয়ার সময় পদ নিয়ে কোনো কথা হয়নি, মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত শীর্ষ নেতৃত্বের।
২০১৮ সালের কোটা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক এবং ২০২১ সালে যাত্রা শুরু করা গণঅধিকার পরিষদের প্রথম সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান ঝিনাইদহ-৪ আসনে ধানের শীষে হেরে গেলেও সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব হয়েছেন; তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর তার আস্থা আছে এবং নির্বাচনের আগে যোগ দেওয়া নেতাদের তিনি ধাপে ধাপে যোগ্যতা অনুযায়ী মূল্যায়ন করবেন। নিবন্ধনের পর থেকে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের (এনডিএম) চেয়ারম্যান হিসেবে প্রায় সাড়ে ৮ বছর দায়িত্ব পালন করা ববি হাজ্জাজ নির্বাচনের আগে পদ ছেড়ে বিএনপিতে আসেন এবং ঢাকা-১৩ আসনে জিতে এখন শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী, কিন্তু দলে তার কোনো পদ নেই; এনডিএমের মহাসচিব মোমিনুল আমিনও গত ২৩ এপ্রিল প্রাথমিক সদস্যপদের ফরম পূরণ করে যোগ দিয়েছেন, দলের গবেষণা ও রিসার্চ সেলে যুক্ত হওয়ার চেষ্টায় থাকা এই নেতা জানান, পদপদবি নিয়ে আপাতত ভাবছেন না। এ ছাড়া ইসলামী ঐক্যজোটের একাংশের মুফতি রশিদ বিন ওয়াক্কাস, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী ও গণফোরামের জ্যেষ্ঠ নেতা আবু সাইয়িদ, মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ (জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ মীর মুগ্ধের যমজ ভাই) এবং এনসিপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ও দলটির চট্টগ্রাম মহানগরের প্রধান সমন্বয়ক মীর আরশাদুল হকও দলে যোগ দিয়েছেন, তবে তাদের কারও এখনো দলীয় পদ নেই।
নির্বাচনে বিএনপির জোট শরিকদের বড় অংশই হেরেছেন; নিজ নিজ দলীয় প্রতীকে লড়া শরিক দলের ৯ নেতার মধ্যে বিএনপি সরকারে দায়িত্ব পেয়েছেন কেবল তিনজন—আন্দালিভ রহমান পার্থ (বিজেপির চেয়ারম্যান), জোনায়েদ সাকি (গণসংহতি আন্দোলনের সমন্বয়ক) ও নুরুল হক নুর (গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি), যাদের মধ্যে সাকি ও নুর প্রতিমন্ত্রী। সমঝোতায় আসন ছাড় পাওয়া ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) নেতা মোস্তফা জামাল হায়দার, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সভাপতি মো. উবায়দুল্লাহ ফারুক ও মহাসচিব মো. মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী এবং মনির হোসাইন কাসেমী ও জুনায়েদ আল হাবীব—সবাই জামায়াত জোট বা বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর কাছে হেরেছেন; শরিক নেতাদের মন্তব্য, নিরঙ্কুশ জয় বিএনপিকে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে, তবে সম্প্রতি দলের চেয়ারম্যান শরিকদের মূল্যায়নের কথা বলায় তারা আশায় আছেন। জমিয়তের মহাসচিব মো. মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী সংবাদমাধ্যমকে বলেন, সরকার গঠন নিয়ে বিএনপি হয়তো ব্যস্ত, তাদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো যোগাযোগ বা বৈঠক হয়নি।






