স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে দলের ভেতরের বিরোধ মিটিয়ে সব স্তরের সংগঠন মজবুত করার কাজে নেমেছে ক্ষমতাসীন বিএনপি। প্রথম ধাপে জেলা, উপজেলা এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের যেসব কমিটির মেয়াদ ফুরিয়েছে, সেগুলো ভেঙে নতুন কমিটি দেওয়া এবং বিভিন্ন স্তরে নেতৃত্ব নতুন করে সাজানোর পরিকল্পনা নিয়েছে দলটি। হাইকমান্ডের মূল্যায়ন হলো, মাঠের নেতাদের বড় অংশ এখন মন্ত্রী-এমপি হিসেবে সরকারের দায়িত্বে থাকায় তৃণমূলকে নতুন করে চাঙা না করলে স্থানীয় ভোটে দলের পক্ষে ফল আনা কঠিন হবে।
দলীয় সূত্রের তথ্য, রুহুল কবির রিজভীকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করার মধ্য দিয়েই এ প্রক্রিয়ার সূচনা হয়েছে; চলতি সপ্তাহেই কেন্দ্রীয় দপ্তরে নতুন কেউ দায়িত্ব পেতে পারেন, এরপর একেকটি বিভাগ ধরে জেলা, মহানগর, উপজেলা ও থানায় নতুন কমিটি ঘোষণা করা হবে। নানা কারণে দল থেকে বহিষ্কৃতদের আবেদন খতিয়ে দেখে ফিরিয়ে আনা এবং প্রয়োজনমতো পদ ও দায়িত্বে রদবদল শেষে সপ্তম জাতীয় কাউন্সিল ডাকা হবে, যা আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি বা মার্চে করার পরিকল্পনা রয়েছে। স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন সংবাদমাধ্যমকে বলেন, কাউন্সিলকে সামনে রেখে পুনর্গঠন চলছে, তবে গতি ধীর; সম্প্রতি কয়েকটি ইউনিটে কমিটি ঘোষণা হয়েছে, বাকিগুলোর কাজও চলছে এবং সারা দেশের ইউনিট গোছানোর পরই কাউন্সিল হবে।
সপ্তাহের শুক্র ও শনিবারকে মূলত সাংগঠনিক সফর আর তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের জন্য রাখছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান; গত ৪ জুলাই থেকে গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে তিনি ঢাকা মহানগর ও জেলার পাশাপাশি চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের জেলা নেতাদের সঙ্গে বসেছেন, সর্বশেষ বৃহস্পতিবার রাতে বৈঠক হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও পাবনার নেতাদের সঙ্গে। খুলনা, বরিশাল, ফরিদপুর ও ময়মনসিংহসহ বাকি বিভাগের নেতারাও পর্যায়ক্রমে ডাক পাবেন। দলীয় সূত্র জানায়, এসব বৈঠকে তারেক রহমান কোন্দল মিটিয়ে কমিটি ঢেলে সাজানো, স্থানীয় নির্বাচনে একক প্রার্থী ঠিক করে সবাইকে এক হয়ে কাজ করা এবং বিতর্কিত বা দলের সুনাম নষ্ট করতে পারেন—এমন কাউকে নেতৃত্বে না আনার নির্দেশ দিচ্ছেন।
দলের নীতিনির্ধারকদের কয়েকজনের ভাষ্য, পুনর্গঠনের এই বড় কর্মযজ্ঞ চলবে আগামী চার-পাঁচ মাস, আর দলকে সরকার থেকে আলাদা রাখতে নতুন নেতৃত্ব বাছাইয়ে তরুণ, মেধাবী ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নেতাদের সামনে আনা এবং নেতৃত্বের বিকেন্দ্রীকরণ—এই দুই বিষয় অগ্রাধিকার পাচ্ছে; ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে কার কী ভূমিকা ছিল, সেটিও মূল্যায়নের বড় মাপকাঠি হবে বলে তারা জানান। তাদের ভাষ্য, প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের সময়ে সরকার ও দলের দায়িত্ব আলাদা রাখা হতো এবং অনেক মন্ত্রী-এমপি স্বেচ্ছায় সাংগঠনিক পদ ছেড়ে সরকারি কাজে মন দিয়েছিলেন; সেই ধারায় এবারও মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের জেলা, মহানগর বা উপজেলার শীর্ষ পদে না রেখে ‘এক নেতা, এক পদ’ নীতি চালুর কথা ভাবা হচ্ছে। তারেক রহমান নিজে এ উদ্যোগ সমর্থন করছেন; তার মতে, মন্ত্রী-এমপিরা একটি দায়িত্বে মনোযোগ দিলে সরকার পরিচালনা ও সংগঠন—দুই জায়গাতেই কাজের দক্ষতা বাড়বে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ১৯ সদস্যের স্থায়ী কমিটিতে এরই মধ্যে আমান উল্লাহ আমান, রুহুল কবির রিজভী, মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ ও অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনারকে নেওয়া হয়েছে, তবু সেখানে তিনটি পদ ফাঁকা; মৃত্যু, পদত্যাগ ও বহিষ্কারে খালি হওয়া ভাইস চেয়ারম্যানের ১২টি পদও প্রবীণ ও মধ্যম সারির নেতাদের দিয়ে পূরণের চেষ্টা চলছে। কেন্দ্রীয় দপ্তরের দায়িত্ব যেতে পারে তিন যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, খায়রুল কবির খোকন ও হাবিব-উন-নবী খান সোহেলের মধ্যে যেকোনো একজনের কাছে। ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, কৃষক দল ও শ্রমিক দলসহ অঙ্গসংগঠনের নেতৃত্ব বদলের প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে; আগস্টের শেষ ভাগে বা আগামী মাসের গোড়ায় নতুন কমিটি পেতে পারে ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দল।
দলীয় হিসাবে, ৮২টি সাংগঠনিক ইউনিটের মধ্যে জেলা ও মহানগর পর্যায়ের ৭২টি কমিটি অনেক আগেই মেয়াদ হারিয়েছে; শেরপুর জেলার কমিটি স্থগিত, চট্টগ্রাম উত্তর জেলার কমিটি বিলুপ্ত, আর মেয়াদ বাকি আছে কেবল যশোর, চুয়াডাঙ্গা, ঠাকুরগাঁও, পটুয়াখালী, নেত্রকোনা ও জামালপুর জেলা এবং খুলনা মহানগর কমিটির। গঠনতন্ত্রে মেয়াদ দুই বছর হলেও কোথাও তিন, কোথাও পাঁচ বছর, এমনকি প্রায় এক দশক ধরে একই কমিটি চলছে, আর ১১টি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের ১০টির মেয়াদও শেষ; তাই বিভাগ ধরে কমিটি পুনর্গঠনের নির্দেশনা পেয়েছেন সাংগঠনিক সম্পাদকেরা। গত দুই মাসে এরই মধ্যে ১৩ জুলাই কুমিল্লা উত্তর জেলায় ৮ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি, ১৫ জুলাই কুমিল্লা মহানগরে পূর্ণাঙ্গ কমিটি, ২৭ জুলাই সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলায় আহ্বায়ক কমিটি ও ২৯ জুলাই গোপালগঞ্জ সদর উপজেলায় কমিটি দেওয়া হয়েছে, ২৬ জুলাই দিনাজপুরের পার্বতীপুর ও ফুলবাড়ী উপজেলা ও পৌর কমিটি বিলুপ্ত হয়েছে, আর ৬ আগস্ট নাসিম হোসাইনকে আবার সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি করার পাশাপাশি নড়াইলের মো. তেলাওয়াত হোসেন, মো. আহাদুজ্জামান বাটু, কাজী সুলতানুজ্জামান সেলিম ও মিলু শরীফসহ ছয় নেতার বহিষ্কারাদেশ তুলে নেওয়া হয়েছে।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, জরুরি ভিত্তিতে যেসব জেলা, উপজেলা ও থানায় কমিটি দরকার, আপাতত সেগুলোতেই সীমিত পরিসরে কাজ চলছে, যা সামনে বাড়তে পারে এবং জাতীয় কাউন্সিলের মধ্য দিয়ে এ প্রক্রিয়া শেষ হবে; তবে কাউন্সিল ঘিরে সারা দেশে নতুন নেতৃত্ব আনা হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি, হাইকমান্ড বিষয়টি দেখছে। ময়মনসিংহ বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. শরীফুল আলম জানান, বিভাগভিত্তিক ধাপে ধাপে এগোনোর কথা তাদের বলা হয়েছিল এবং এখন তারা দলের নির্দেশনার অপেক্ষায় আছেন। বিএনপির সর্বশেষ, অর্থাৎ ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল হয়েছিল ২০১৬ সালের মার্চে; গঠনতন্ত্রে প্রতি তিন বছর পর কাউন্সিলের কথা থাকলেও গত এক দশকে আর কাউন্সিল হয়নি, যদিও এ সময়ে কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটিতে কয়েক দফা পরিবর্তন আনা হয়েছে।






