নারী শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি ছাত্রী উইং গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, যার কাঠামো হবে দলের প্রচলিত সাংগঠনিক ধারা থেকে আলাদা। কেন্দ্রের পর জেলা ও থানায় কমিটি হলেও ওপরের স্তর নিচের স্তরকে পরিচালনা করবে—এমন ধাপে ধাপে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা এতে রাখা হবে না; নারীদের চলাফেরায় শরিয়াহর যে বিধিনিষেধ আছে, তা বিবেচনায় রেখেই এমন নকশা করা হচ্ছে। আপাতত দলের বিদ্যমান নারী ইউনিটের তত্ত্বাবধানে উইংটি চলবে, তবে এর নিজস্ব নীতিমালা থাকবে।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) রাতে এক আলাপে এসব তথ্য জানান দলের যুগ্ম মহাসচিব এবং ছাত্রী সংগঠন গড়ার দায়িত্বে থাকা অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা শেখ ফজলে বারী মাসউদ। তিনি বলেন, ১৩ সেপ্টেম্বর দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বসা মহিলা ও পরিবার বিষয়ক উপকমিটির সভায় উইংটির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা নিয়ে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হলেও তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি, বাকি বিষয়গুলো গুছিয়ে আনা হচ্ছে। ঘোষণাটি দেবেন দলের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম; আমিরের বিদেশ সফর থাকলে তার আগে বা পরে, ডিসেম্বরের আগেই—মূলত নভেম্বরে—তা দেওয়ার জোর চেষ্টা চলছে বলে জানান তিনি।
শেখ ফজলে বারী মাসউদের ভাষ্য, উইংটির ফরম্যাট হবে কিছুটা ভিন্ন: প্রথমে কেন্দ্রীয় কমিটি হবে, পরে জেলা ও থানার কমিটি গড়া হবে অন্য প্রক্রিয়ায়, যাতে শরিয়াহর বিধান মেনে মেয়েরা কাজ করতে পারেন। তিনি বলেন, ‘জেলা পর্যায়ের কার্যক্রম জেলাতেই সম্পন্ন করা যায়, এরকম একটা ফরম্যাট আসবে।’ অর্থাৎ কেন্দ্র থেকে জেলা আর জেলা থেকে থানায় নিয়ন্ত্রণ ছড়িয়ে দেওয়ার বদলে নারীদের চলাচল ও কাজের বাস্তবতা মাথায় রেখে প্রতিটি স্তরে আলাদাভাবে স্থানীয় কাজ চালানোর কথা ভাবছে দলটি, যেখানে ছাত্রীদের উপযোগী কাঠামোয় ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক কাজ বেশি গুরুত্ব পাবে।
দলের অন্য সহযোগী সংগঠনের মতো ছাত্রী উইংয়েরও আলাদা গঠনতন্ত্র বা নীতিমালা থাকবে এবং সেটি মেনেই এটি চলবে বলে জানান এই নেতা। শরিয়াহ অনুসরণকেই উইংটির স্বাতন্ত্র্যের প্রধান জায়গা হিসেবে দেখছে দল: মূল সংগঠন যেভাবে অন্যদের থেকে আলাদা, তেমনি কাজের ক্ষেত্র, নীতি ও কর্মসূচিতে এরও নিজস্বতা থাকবে এবং শরিয়াহর বিধান যেন ভঙ্গ না হয়, সে ব্যাপারে বাড়তি সতর্কতা নেওয়া হবে। তার দাবি, অন্য নারী বা ছাত্রী সংগঠনে শরিয়াহ পালনে যে শিথিলতা চোখে পড়ে বলে তাদের ধারণা, ইসলামী আন্দোলন সে পথে হাঁটবে না।
কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে কারও নাম এখনো ঠিক হয়নি। শুরুতে দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের পরামর্শে শীর্ষ নেতৃত্ব মনোনীত হতে পারে, পরে নীতিমালা তৈরি করে নিয়মিত প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব বাছাইয়ের কথা ভাবা হচ্ছে। দলের বর্তমান নারী শাখা কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসার ছাত্রীদের মধ্য থেকে নেতৃত্ব আসতে পারে, যদিও নারী শাখা থেকে নেওয়ার বিষয়টিই বেশি আলোচিত; বিশ্ববিদ্যালয় না কওমি মাদ্রাসা—এ নিয়ে কোনো বাধ্যবাধকতা থাকবে না, কোনো একটি শিক্ষাধারাকে আলাদা অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্তও হয়নি; যোগ্যতার ভিত্তিতে ধাপে ধাপে যারা উঠে আসবেন, দায়িত্ব পাবেন তারাই।
সাধারণ শিক্ষা, কওমি ও আলিয়া মাদ্রাসা—তিন ধারার ছাত্রীরাই এই উইংয়ে যুক্ত হতে পারবেন; ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষাধারার ছাত্রীদের এক মঞ্চে এনে সংগঠনের পরিসর বাড়ানোই দায়িত্বশীলদের পরিকল্পনা। দলটি বলছে, ছাত্রীদের মাধ্যমে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানো, ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে নারীদের সক্রিয় করা এবং দেশের বিপুল নারী ভোটারের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয় গড়ে তোলাও এর লক্ষ্য। শেখ ফজলে বারী মাসউদ বলেন, সংখ্যায় পুরুষের চেয়ে নারী ভোটার বেশি, তাই সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে তাদের সক্রিয় ভূমিকার সুযোগ তৈরি এবং নারীদের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া গড়ে তোলাও উইংটির উদ্দেশ্য; শরিয়াহ মেনে নারীরা যেন ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে গঠনমূলক অবদান রাখতে পারেন, সে লক্ষ্যেই সংগঠনটি কাজ করবে বলে জানান তিনি।
১৩ সেপ্টেম্বরের সভায় দেশজুড়ে দলের নারী কর্মীদের সক্রিয় করা ও তাদের জন্য নিরাপদ কাজের পরিবেশ তৈরির নানা কর্মসূচি নিয়েও কথা হয়। এর ধারাবাহিকতায় উইংটির কাঠামো ও নীতিমালা তৈরির কাজ এগোচ্ছে, তবে ঘোষণার দিনক্ষণ, কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ও পূর্ণাঙ্গ কাঠামো এখনো চূড়ান্ত হয়নি।






