আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার মেয়র, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে ইউপি সদস্য ও কাউন্সিলর পর্যন্ত প্রতিটি পদে একক প্রার্থী দিতে জেলা পর্যায়ে কাজ শুরু করেছে বিএনপি। এ জন্য প্রতিটি জেলা ও সংসদীয় আসন ধরে বিশেষ বাছাই কমিটি করার প্রক্রিয়া চলছে, যারা সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে জরিপ চালাবে; দলীয় সূত্র জানায়, কয়েকটি জেলায় এমন কমিটি এরই মধ্যে হয়েছে।
দলের একাধিক নীতিনির্ধারক নেতার ভাষ্য, অতীতের স্থানীয় নির্বাচনে একাধিক প্রার্থী থাকায় ভোট ভাগ হওয়া ও সাংগঠনিক বিরোধের অভিজ্ঞতা থেকেই এবার আগেভাগে একক প্রার্থী ঠিক করায় জোর দিচ্ছে হাইকমান্ড। তাদের মতে, এতে দলের ভেতরের প্রতিযোগিতা ও গ্রুপিং নিয়ন্ত্রণে থাকবে, জয়ের সম্ভাবনা বাড়বে এবং তৃণমূলে সংগঠন আরও মজবুত হবে। সূত্র জানায়, প্রার্থীর জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক গ্রহণযোগ্যতা, দলের ভাষায় ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে ভূমিকা ও স্থানীয় জনসম্পৃক্ততা হবে বাছাইয়ের মানদণ্ড, আর জরিপে এগিয়ে থাকা গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিই দলের সমর্থন পাবেন—এমন নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এ লক্ষ্যে গত ৪ জুলাই থেকে প্রতি শুক্র ও শনিবার ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুরসহ নানা জেলার নেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান, যেখানে তিনি অভ্যন্তরীণ কোন্দল মিটিয়ে একক প্রার্থী ঠিক করার নির্দেশ দিয়েছেন। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী সংবাদমাধ্যমকে বলেন, জনমত যাচাইয়ে প্রতিটি এলাকায় স্থানীয় নেতারা জরিপ চালাবেন; ইউপি চেয়ারম্যান ও পৌর মেয়র প্রার্থীর বিষয়ে উপজেলা ও জেলার নেতারা মত দেবেন, উপজেলা চেয়ারম্যান প্রার্থী বাছবেন জেলার নেতারা, আর সমাধান না হলে কেন্দ্র তা নিষ্পত্তি করবে। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে কেউ প্রার্থী হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং এ ক্ষেত্রে হাইকমান্ড ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি মানবে বলে জানান তিনি।
দলীয় সূত্র জানায়, জেলার বাছাই কমিটিগুলো সম্ভাব্য প্রার্থীদের তথ্য সংগ্রহ করে মূল ও বিকল্প প্রার্থীর সংক্ষিপ্ত তালিকা করবে এবং এলাকার সাংগঠনিক অবস্থা, নেতাকর্মীদের মত, জনসমর্থন ও আগের নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণের পর সুপারিশ যাবে জেলা ও বিভাগীয় নেতাদের কাছে; তারা প্রার্থী ঠিক করতে না পারলে কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় তা চূড়ান্ত হবে। এরই অংশ হিসেবে ভোলা-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. হাফিজ ইব্রাহিম বোরহানউদ্দিন ও দৌলতখান উপজেলার জন্য ৭ সদস্যের দুটি আহ্বায়ক কমিটি করেছেন—দৌলতখানে আহ্বায়ক আব্দুল মান্নান মিয়া, আর বোরহানউদ্দিনে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মাফরুজা সুলতানা। কমিটিগুলোর কাজ তৃণমূলের মত ও জরিপ মূল্যায়ন করে সর্বসম্মতভাবে একক চূড়ান্ত ও বিকল্প প্রার্থী বাছাই করে অনুমোদনের জন্য পাঠানো।
ভোলা জেলা বিএনপির সদস্য সচিব রাইসুল আলম বলেন, প্রার্থী বাছাইয়ে শিগগির জেলার নেতাদের নিয়ে বসবেন তারা; এলাকায় জনপ্রিয়তা আর দলের প্রতি ত্যাগ—এ দুটি বিষয় বেশি গুরুত্ব পাবে। তবে ভোলা-২ আসনে কমিটি স্থানীয়ভাবে হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এমন কমিটি গঠনে কেন্দ্রের নির্দেশনা তারা এখনো পাননি, পেলে সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত হবে। চাঁদপুর জেলা বিএনপির সভাপতি শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক, যিনি সংসদ সদস্যও, জানান, তিনি কয়েকটি কমিটি করে দিয়েছেন; বিদেশ বা ঢাকায় থেকেও অনেকে নির্বাচন করতে চান, তাই মাঠে কার অবস্থান কেমন, তা অভ্যন্তরীণ জরিপে যাচাই করা হচ্ছে এবং কেন্দ্রের চূড়ান্ত নির্দেশনা পেলে মূল ও বিকল্প প্রার্থীর তালিকা দেওয়া হবে।
জেলা পর্যায়ের কয়েকজন নেতা জানান, হাইকমান্ডের চূড়ান্ত নির্দেশনা না এলেও তারা আগাম জরিপ চালিয়ে মূল ও বিকল্প প্রার্থীসহ তালিকা পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন, আর সম্ভাব্য প্রার্থীরা জনসংযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় সংসদ সদস্যের সমর্থন পেতে তদবির চালাচ্ছেন। মোহাম্মদ হযরত আলী, শেরপুর জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক, বলেন, জেলায় কমিটি না থাকলেও কাজ এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে; প্রতিটি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে প্রাথমিকভাবে তিনজনকে বাছাইয়ের চিন্তা আছে এবং কেন্দ্র থেকে কিছু মৌখিক নির্দেশনাও এসেছে। জাহিদুল ইসলাম ধলু, নওগাঁ জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক, জানান, কেন্দ্র থেকে এমন কমিটির নির্দেশনা আসেনি; তারেক রহমানের নির্দেশনা মেনে সংসদ সদস্য এবং জেলা-উপজেলার শীর্ষ নেতারা মিলে প্রার্থী বাছাই করবেন, আর সে জন্য আগামী সপ্তাহে বৈঠকের কথা রয়েছে।
দলের নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, স্থানীয় নির্বাচনে বিএনপি চেয়ারম্যান কেবল সিটি করপোরেশনের মেয়র পদপ্রার্থীদের আনুষ্ঠানিকভাবে সামনে আনবেন, আর সিটিগুলোতে দায়িত্বে থাকা দলের প্রশাসকরাই প্রার্থী হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে। অন্য স্তরে প্রার্থী ঠিক করতে সংশ্লিষ্ট এলাকার সংসদ সদস্য এবং জেলা ও উপজেলা নেতাদের মত প্রাধান্য পাবে এবং কেউ যেন বিদ্রোহী প্রার্থী না হন, সে নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।






