স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদকে ঘিরে বিরোধী দল ও রাজনীতিকদের সমালোচনা এবং বিতর্ক এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে; রাজপথ থেকে সংসদ—সবখানেই তাকে লক্ষ্য করে আক্রমণ বাড়ছে। কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও এনসিপির শীর্ষ নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ তিন দিন আগে ফেসবুকে তার সমালোচনা করে যে পোস্ট দেন, তার পর বিতর্ক নতুন করে মাথাচাড়া দিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের একাংশের দাবি, আওয়ামী আমলের কিছু মনগড়া ঘটনা সামনে এনে তার বিরুদ্ধে কাল্পনিক তথ্য ছড়ানো হচ্ছে, আর বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, বিরোধীদের সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই প্রকাশ্য বিরোধ সামনে আরও জটিল রূপ নিতে পারে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে জুলাই সনদ প্রণয়নকে ঘিরে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সংলাপেই এ মতপার্থক্যের শুরু। প্রায় ৯ মাসের সেই সংলাপে বিএনপির প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন সালাহউদ্দিন আহমদ এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচনকালীন ব্যবস্থা, সংসদের উচ্চকক্ষ, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ, জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল এবং সাংবিধানিক ও স্বাধীন কমিশনসহ সংবিধান সংস্কারের নানা প্রশ্নে দলের অবস্থান তুলে ধরেন; এসব নিয়ে জামায়াত ও এনসিপির নেতাদের সঙ্গে তার বহুবার তর্ক হয় এবং কয়েকটি বিষয়ে বিএনপি ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দেয়; সংবিধানের ধারা-উপধারা নিয়ে তার ব্যাখ্যা ঘিরে সংলাপে বিরোধী নেতাদের কটাক্ষও শুনতে হয় তাকে, যার রেশ নির্বাচনের আগে ও পরে থেকে যায়। পরে সংসদে বাগ্‌যুদ্ধ, আইনশৃঙ্খলা নিয়ে বিতর্ক ও সামাজিক মাধ্যমে ট্রলের ভেতর দিয়ে তিনি বিরোধী শিবিরের অন্যতম প্রধান নিশানা হয়ে ওঠেন।

বিভিন্ন সূত্রের দাবি, আওয়ামী লীগ, জামায়াত ও এনসিপি—তিন পক্ষেরই লক্ষ্যে এখন সালাহউদ্দিন আহমদ, কারণ তাদের ধারণা তাকে কোণঠাসা করা গেলে বিএনপি দুর্বল হবে। কিছু রাজনীতি বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষকের মত, ঐকমত্য কমিশনের বৈঠক ও জাতীয় ইস্যুতে তার যুক্তির জবাব দিতে না পেরে বিরোধীরা নীতিগত বিতর্কের বদলে ব্যক্তিগত আক্রমণের পথ বেছে নিচ্ছেন—সরকারি নীতির বিরুদ্ধে তথ্যভিত্তিক যুক্তি দিতে না পারা, তার ও পরিবারের সম্পত্তি নিয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ট্রল ও গুজবে জনমত বিভ্রান্ত করা এবং মানুষকে মূল জাতীয় ইস্যুর বদলে ব্যক্তিগত কাদা ছোড়াছুড়িতে ব্যস্ত রাখাকে তারা এর কারণ হিসেবে দেখছেন; তাদের মতে, এ প্রবণতা সুস্থ গণতান্ত্রিক চর্চার পরিপন্থি এবং দীর্ঘ মেয়াদে বিরোধী রাজনীতিরই ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। বিএনপির সমমনা যেসব দল ঐকমত্য কমিশনে অংশ নিয়েছিল, তাদের কয়েকজন নেতাও দাবি করেন, কমিশনে তার উপস্থাপিত যুক্তি ও তথ্য-প্রমাণ নানা মহলে প্রশংসিত হলেও বিরোধীরা তা খণ্ডন না করে খোঁড়া অভিযোগ তুলছে এবং অভিযোগকারীরা কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ হাজির করতে পারেননি; রাজনীতি-সচেতন মহলের একাংশের মতে, হাসনাত আবদুল্লাহর মতো জনপ্রতিনিধিরা গঠনমূলক সমালোচনার বদলে সামাজিক মাধ্যমে মুখরোচক বক্তব্য দিলে তাতে ট্রল সংস্কৃতিই উৎসাহ পায়।

সালাহউদ্দিন আহমদ ২০১৫ সালে গুম হন এবং ৬২ দিন পর সে বছরের ১১ মে ভারতের মেঘালয়ের রাজধানী শিলংয়ে তার সন্ধান মেলে; তখনকার আওয়ামী লীগ সরকার তাকে দেশে ফিরতে দেয়নি, ফলে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রায় সাড়ে ৯ বছর তাকে ভারতে থাকতে হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে সেই সরকারের পতনের পর তিনি দেশে ফেরেন এবং ঐকমত্য কমিশনে বিএনপির প্রতিনিধিত্ব করেন; ভারতে থাকার সময়ও তিনি আওয়ামীবিরোধী আন্দোলনের সমন্বয়কের ভূমিকায় ছিলেন, আর ২০০৮ সালে তার স্ত্রী হাসিনা আহমদ বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন। বিএনপি-সংশ্লিষ্টদের দাবি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিনরাত দপ্তরের কাজে ব্যস্ত থাকলেও ছোটখাটো বিষয়ে, এমনকি পরিবারের আয় ও সম্পদ নিয়েও তাকে অহেতুক সমালোচনার মুখে পড়তে হচ্ছে, অথচ আওয়ামী আমলে তার ও পরিবারের আয়কর নথি খুঁটিয়ে দেখেও অসংগতি মেলেনি এবং সে সময় দলের সামনের সারির নেতা হিসেবে তিনি বহুবার কারাবরণ করেছেন; হাসনাত আবদুল্লাহ আওয়ামী আমলের মামলায় তার সাজা খাটার প্রসঙ্গ ফেসবুকে লেখায় তাদের প্রশ্ন, এর মাধ্যমে কি সে সময়ের মিথ্যা মামলার রায়গুলোকেই আইনি বৈধতা দেওয়া হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. বোরহান উদ্দিন খান সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ছাত্রজীবনে সালাহউদ্দিন আহমদ ছিলেন মেধাবী ও মিষ্টভাষী; রাজনীতির কারণে নিয়মিত ক্লাস করতে না পারলেও কোন বই থেকে কী পড়বেন, সে বিষয়ে মহসিন হলের ভালো ছাত্রদের সঙ্গে আলোচনা করে তুষ্ট না হয়ে তার কাছেই পরামর্শ নিতেন, মাস্টার্সে ১২০ জনের মধ্যে ১৫তম হন এবং আরও বেশি পড়াশোনা করলে হয়তো প্রথম শ্রেণিও পেতেন, পরে বিসিএস দিয়ে সিভিল সার্ভিসে যোগ দেন, একসময় বেগম খালেদা জিয়ার এপিএসের দায়িত্বও সামলান এবং শেষে চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে আসেন। তার ব্যক্তিগত ধারণা, সিভিল সার্ভিস, পুলিশ ও সেনাবাহিনীতে পরিচিতদের সহানুভূতির কারণেই গুমের পর তাকে শিলংয়ে ফেলে আসা হয়, নইলে নিখোঁজ ইলিয়াস আলীর মতো পরিণতি হতে পারত; সেখানে প্রথমে তাকে আটকে রাখা হয়েছিল, মামলা থেকে ছাড়া পেতে নানা কাগজপত্র জোগাড় করতে হয়েছে, লড়াই করে তিনি নিম্ন আদালতে জেতেন, ভারত সরকার আপিল করে এবং ট্রাভেল পাস না মেলায় তিনি দেশে ফিরতে পারেননি, অর্থাৎ সেখানে তিনি আরাম-আয়েশে ছিলেন না। তাকে ভারতপন্থি বা ‘র’-এর এজেন্ট বলার সমালোচনা নাকচ করে এই অধ্যাপক বলেন, কোনো দেশ কাউকে এজেন্ট বানালে গোপনেই বানায়—মোসাদ বা সিআইএর এজেন্টও তৈরি হয় লোকচক্ষুর আড়ালে—অথচ সালাহউদ্দিন সেখানে প্রকাশ্যে ছিলেন; তিনি তাকে সবসময় দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া একজন বাংলাদেশপন্থি রাজনীতিক হিসেবেই দেখেছেন।

বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য ও গণশিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খান সংবাদমাধ্যমকে বলেন, সালাহউদ্দিন আহমদ দেশের রাজনীতিতে সততা, নিষ্ঠা ও ত্যাগের প্রতীক এবং স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তার ভূমিকা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে; আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফেরাতে তিনি যখন দিনরাত কাজ করছেন, তখন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তার চরিত্রহননের চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ করেন এই নেতা, আর গঠনমূলক সমালোচনা গণতন্ত্রের অংশ হলেও ব্যক্তিস্বার্থ বা রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব থেকে শিষ্টাচারবহির্ভূত মন্তব্য ও অপপ্রচার মেনে নেওয়া যায় না মন্তব্য করে বিরোধীদের কাদা ছোড়াছুড়ি বন্ধ করে গঠনমূলক রাজনীতি করার আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রীর সহকারী (রাজনৈতিক) মো. রাশেদ খান বলেন, ফ্যাসিবাদী জামানায় নিপীড়িত সালাহউদ্দিনের বক্তব্য শেখ হাসিনার সাম্রাজ্যে আঘাত করেছিল বলেই প্রতিহিংসা থেকে তাকে ৬১ দিন গুম রাখা হয়। তার অভিযোগ, সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিরোধী দলের ভুল ধরিয়ে দেন বলে জামায়াত ও এনসিপি তা মানতে পারছে না—তার ভাষ্যে, বিরোধীদের ৯০ জন এমপি একসঙ্গেও যুক্তিতর্কে তার সঙ্গে পেরে ওঠেন না—আর সেই ক্ষোভ থেকেই দল দুটি অনলাইন-অফলাইনে অপতথ্য ছড়িয়ে শেখ হাসিনার মতো আচরণ করছে; সম্প্রতি এনসিপির কয়েকজন নেতাও তার বিরুদ্ধে নানা অপতথ্য ছড়াচ্ছেন বলে দাবি করেন তিনি।

রাশেদ খান আরও অভিযোগ করেন, ফখরুদ্দিন-মঈন উদ্দিনের জামানায় বহু রাজনীতিকের চরিত্রহনন করে মিথ্যা অভিযোগ আনা হয়েছিল এবং তারা শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় বসিয়ে সেফ এক্সিট নেয়, আর সেই ভারতীয় মদদপুষ্ট বয়ানই এখন হাসনাত আবদুল্লাহরা গ্রহণ করছেন; তার প্রশ্ন, গণঅভ্যুত্থানের সময় ১৯ জুলাই হাসনাত কেন আওয়ামী লীগের মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠকে গিয়েছিলেন, আর ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার পর প্রেস রিলিজ দেখার দায়িত্ব পেয়েও কেন নিজের মতো করে আলোচনার দুয়ার খোলা আছে বলে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলেন। তিনি দাবি করেন, সালাহউদ্দিন হাসিনার সঙ্গে আপস করেননি, বরং হাসনাত ও সারজিস ছাত্রলীগের এজেন্ট হিসেবে কাজ করেছেন, তাই একজন গুমের শিকার নেতার বিরুদ্ধে তাদের এই মিথ্যাচার গ্রহণযোগ্য নয়; তার দাবি, শেখ হাসিনা টিকে গেলে হাসনাত ও সারজিস ছাত্রলীগের বড় নেতা হতেন বা পুরস্কার পেতেন, আর নির্বাসিত ও নিপীড়িতরা নির্যাতিতই থেকে যেতেন—কোটা সংস্কার আন্দোলনের আগে হাসনাত কখনো হাসিনার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছিলেন কি না, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, রাজনীতিতে ব্যক্তিগত আক্রমণ বা হেয় করা উচিত নয়, রাজনীতিকে রাজনীতি দিয়েই মোকাবিলা করতে হবে, কারণ ব্যক্তিগত আক্রমণ ঢুকে পড়লে রাজনীতি আর রাজনীতি থাকে না; তার মতে, সংবিধান ও সংসদীয় প্রক্রিয়া সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখা এবং সংবিধানের পক্ষে জোরালো যুক্তি তুলে ধরতে সক্ষম সালাহউদ্দিন আহমদ মেধা দিয়ে দল ও দেশের জন্য ভূমিকা রাখছেন, আর তার মতো রাজনীতিকদের মর্যাদা দেওয়া উচিত; বিশ্লেষকেরা বিষয়টি সংসদীয় বিতর্কের বাইরে গিয়ে দেখা এবং আলোচনার টেবিলে বসে দুই পক্ষকে বিরোধ মিটিয়ে ফেলার পরামর্শ দিচ্ছেন।