সমাজসেবা ও দাতব্য কাজে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ব্রিটেনের রাজার দেওয়া এমবিই সম্মাননা পেতে যাচ্ছেন লন্ডনপ্রবাসী ব্রিটিশ-বাংলাদেশি আবু তাহের। এমবিই হিসেবে তার নাম এরই মধ্যে ঘোষণা করা হয়েছে। আগামী সোমবার (১৩ মে) রাজকীয় বাসভবন উইন্ডসর ক্যাসেলে রাজা তৃতীয় চার্লস আনুষ্ঠানিকভাবে তার হাতে এ সম্মাননা তুলে দেবেন।
লন্ডনের বাসিন্দা আবু তাহের একাধারে কমিউনিটি নেতা, সাহিত্যিক ও পেশাদার অ্যাকাউন্ট্যান্ট; তার পৈতৃক বাড়ি সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার বুধবারীবাজার ইউনিয়নের চন্দরপুর গ্রামে, বাবা মরহুম মক্তার আলী ও মা মরহুমা মাছুমা খাতুন। ১৯৮৭ সালে যুক্তরাজ্যে গিয়ে অ্যাকাউন্ট্যান্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান তিনি, আর ১৯৯৯ সালে পূর্ব লন্ডনে গড়ে তোলেন ‘মাহি অ্যান্ড কো-সার্টিফাইড প্র্যাক্টিসিং অ্যাকাউন্ট্যান্টস’, যা এখন একটি সুপরিচিত প্রতিষ্ঠান। ব্যক্তি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও নানা সামাজিক সংগঠনকে আর্থিক পরামর্শ দিয়ে আসা আবু তাহের ‘ইনস্টিটিউট অব সার্টিফাইড প্র্যাকটিসিং অ্যাকাউন্ট্যান্টস’-এর ফেলো সদস্য।
ছাত্রজীবনেই লেখালেখি শুরু করা আবু তাহের ছড়া-কবিতা, প্রবন্ধ ও নাটক—সব শাখাতেই সমান স্বচ্ছন্দ; তার লেখায় উঠে এসেছে প্রবাসজীবন, মানবতা, সমাজসচেতনতা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের নানা দিক। প্রকাশিত বই ও প্রচারিত নাটক মিলিয়ে তার কাজের সংখ্যা দশের বেশি। বিলেতে নতুন প্রজন্মের লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগানো এবং ব্রিটিশ-বাংলাদেশি তরুণেরা যাতে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে আগ্রহী হয়, সে চেষ্টাতেও তার অবদান রয়েছে।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চার উদ্দেশ্যে ১৯৮৮ সালে যুক্তরাজ্যে গড়ে ওঠা সংহতি সাহিত্য পরিষদের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা আবু তাহের। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি, এখন সভাপতি; তার নেতৃত্বে কবিতা উৎসব, কর্মশালা, সাহিত্যসভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের নিয়মিত আয়োজনে সংগঠনটি আন্তর্জাতিক পরিসরেও গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠেছে।
৩০ বছরের বেশি সময় ধরে স্বেচ্ছাসেবা, সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব ও মানবিক কাজে যুক্ত আবু তাহের ভিশন কেয়ার ফাউন্ডেশনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা; এর মাধ্যমে বাংলাদেশের সুবিধাবঞ্চিত মানুষ বিনামূল্যে চোখের চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের সুযোগ পাচ্ছেন। মাসুমা মেমোরিয়াল ট্রাস্টের মাধ্যমে তিনি দীর্ঘদিন দরিদ্র শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় সহায়তা দিচ্ছেন। টি-ফাইভ টেইলরিং ট্রেনিং সেন্টারের মাধ্যমে তৃণমূলের সুবিধাবঞ্চিত নারীদের স্বাবলম্বী করার উদ্যোগও নিয়েছেন তিনি।
দেশের শিক্ষাক্ষেত্রেও অবদান রয়েছে তার: গোলাপগঞ্জের আল ইমদাদ ডিগ্রি কলেজের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা তিনি, সিলেটের ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয় ব্রিজ অ্যাকাডেমিরও প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক। ইংরেজি ও আইসিটিতে শিশু-তরুণদের দক্ষ ও আত্মবিশ্বাসী করে তোলাই বিদ্যালয়টির মূল লক্ষ্য। বাংলাদেশে তার স্বপ্নের প্রকল্প ‘হ্যাভেন কেয়ার হোম’, যেখানে বৃদ্ধ ও অসহায় মানুষের জন্য সম্মানজনক ও নিরাপদ আশ্রয় গড়ার কাজ চলছে।
এমবিই পাওয়ার অনুভূতি জানাতে গিয়ে আবু তাহের বলেন, মানুষের কল্যাণ, সংস্কৃতির বিকাশ আর প্রজন্মের মধ্যে মূল্যবোধের সেতু গড়াই সব সময় তার কাজের মূল লক্ষ্য ছিল। তার ভাষায়, ‘সফলতা শুধু ব্যক্তিগত অর্জনে সীমাবদ্ধ নয়’; সমাজের কল্যাণে তা কাজে লাগানোতেই প্রকৃত সার্থকতা। আবু তাহেরের স্ত্রী মিতা তাহের বিলেতের পরিচিত কণ্ঠশিল্পী ও সাংস্কৃতিক সংগঠক; দুই ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে তারা লন্ডনে স্থায়ীভাবে থাকেন।






