সিডনির ম্যাককোয়ারি স্ট্রিটে, রয়্যাল বোটানিক গার্ডেনের ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে নিউ সাউথ ওয়েলসের গভর্নরের দাপ্তরিক বাসভবন ও কার্যালয় গভর্নমেন্ট হাউস। নজরকাড়া স্থাপত্য, সবুজ বাগান, মূল্যবান শিল্পকর্ম আর প্রায় দুই শতাব্দীর ইতিহাস ভবনটিকে শহরের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যস্থানগুলোর একটি করে তুলেছে। সরকারি ও আনুষ্ঠানিক কাজের পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ে এটি সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্যও বিনা খরচে খোলা থাকে, ফলে ইতিহাস, স্থাপত্য বা সংস্কৃতিতে আগ্রহীদের কাছে এটি শহরের অন্যতম আকর্ষণ।

বর্তমান ভবনের নির্মাণ শুরু হয় ১৮৩৬ সালে, নকশা করেন ব্রিটিশ স্থপতি এডওয়ার্ড ব্লোর, যিনি রাজা উইলিয়াম চতুর্থ ও রানি ভিক্টোরিয়ার স্থাপত্যকার ছিলেন এবং বাকিংহাম প্যালেস ও উইন্ডসর ক্যাসলের মতো প্রকল্পে যুক্ত ছিলেন। নির্মাণে দেরি ও খরচ বেড়ে যাওয়ায় কাজ শেষ হয় ১৮৪৫ সালে; সে বছরই তৎকালীন গভর্নর স্যার জর্জ গিপস সেখানে থাকতে শুরু করেন। প্রায় ১৮০ বছরের পুরোনো এ স্থাপত্যের সঙ্গে আজ মিশে আছে শিল্প, সংগীত ও অস্ট্রেলিয়ার রাষ্ট্রীয় ইতিহাস।

স্থানীয় বেলেপাথরে গড়া ভবনটি গথিক পুনর্জাগরণ বা টিউডর-গথিক শৈলীর অনন্য উদাহরণ; দুর্গের মতো দেয়াল, উঁচু টাওয়ার আর কেল্লাসদৃশ অলংকরণে এটি সিডনি হারবারের তীরে আলাদা করে চোখে পড়ে। পরে ১৮৭৩ সালে সামনের প্রবেশপথে যোগ হয় একটি পোর্টিকো, ১৮৭৯ সালে পূর্ব পাশে বারান্দা, আর ১৯০০-০১ সালে সম্প্রসারিত হয় বলরুম ও গভর্নরের স্টাডি। ভেতরে রয়েছে বিভিন্ন সময়ের গভর্নরদের প্রতিকৃতি, ঐতিহাসিক আসবাব, অলংকারশিল্প ও স্মারক, আর স্টেট রুমসহ আনুষ্ঠানিক কক্ষগুলোর সাজসজ্জা ভবনের মর্যাদা আরও বাড়িয়েছে।

এই ভবনের পেছনে রয়েছে আরও পুরোনো এক অধ্যায়। নিউ সাউথ ওয়েলসের প্রথম গভর্নর আর্থার ফিলিপ ১৭৮৮ সালে সিডনি কোভের কাছে প্রথম গভর্নমেন্ট হাউসের গোড়াপত্তন করেন, যা ছিল নতুন উপনিবেশের রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র; প্রায় ৫০ বছর পর সেটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়লে নতুন ভবনের প্রয়োজন দেখা দেয়। আজকের ব্রিজ ও ফিলিপ স্ট্রিটের সংযোগস্থলে, মিউজিয়াম অব সিডনির জায়গায় ছিল সেই ভবন, যা ১৮৪৫ সালের পর পরিত্যক্ত হয়ে ভেঙে ফেলা হয়; ১৮৯৯ সালে খননের সময় এর ভিত্তিপ্রস্তর আবার পাওয়া যায় এবং সেখানকার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এখন জাদুঘরের অংশ।

নিউ সাউথ ওয়েলস পার্লামেন্টের তথ্য বলছে, গভর্নমেন্ট হাউসের নিজস্ব বাগান প্রায় পাঁচ হেক্টরের, পাশেই বিশাল রয়্যাল বোটানিক গার্ডেন; ফলে পরিবার ও শিশুদের নিয়ে সবুজে সময় কাটানো, স্থাপত্য দেখা কিংবা বাগানে হাঁটার জন্য জায়গাটি বেশ আকর্ষণীয়। আরেক আকর্ষণ ‘জ্যাজ অ্যাট দ্য হাউস’, সাধারণত মাসের এক রোববার রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সেবাবাহিনীর জ্যাজ দল দুপুর ১২টা, ১টা ও ২টায় বিনা খরচে সংগীত পরিবেশন করে। সেদিন স্টেট রুম ঘুরে দেখা, বাগানের ভাস্কর্য দেখা ও প্রাঙ্গণে সময় কাটানোর সুযোগও থাকে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কিছু শুক্র, শনি ও রোববারে ভবনটি খোলা থাকে, সময় সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বেলা ৩টা; তখন বিনা খরচে গাইডসহ ঘুরে দেখার ব্যবস্থা থাকে। প্রতিটি দলে সর্বোচ্চ ২০ জন অংশ নিতে পারেন, সাধারণত আগে এলে আগে পাওয়ার ভিত্তিতে। সময়সূচি বদলাতে পারে বলে যাওয়ার আগে সরকারি ওয়েবসাইটে হালনাগাদ তথ্য দেখে নেওয়াই ভালো।

১৮৪৫ থেকে ১৯৯৬ সালের মধ্যে ২৮ জন গভর্নর এ ভবনে থেকেছেন, আর ১৯০১ থেকে ১৯১৪ সালে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম পাঁচ গভর্নর-জেনারেলও এটিকে সরকারি বাসভবন হিসেবে ব্যবহার করেন। নিউ সাউথ ওয়েলসের ৩৯তম ও বর্তমান গভর্নর মার্গারেট বেজলি এসি কেসি দায়িত্ব নেন ২০১৯ সালের ২ মে; এই ভবনে বাস করা গভর্নরদের মধ্যে তিনি ২৮তম। সিডনিতে থাকা বাংলাদেশিসহ অভিবাসী পরিবারগুলোর জন্য, বিশেষ করে সন্তানদের নিয়ে, বসবাসের দেশের ইতিহাস, স্থাপত্য ও রাষ্ট্রীয় ঐতিহ্য জানার ভালো জায়গা হতে পারে গভর্নমেন্ট হাউস; খোলা দিনগুলোতে পরিবার নিয়ে ঘুরে দেখা যেমন আনন্দের, তেমনি দেশটির ইতিহাস জানারও মূল্যবান অভিজ্ঞতা।