বিশ্বের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আন্তর্জাতিক দিবসে আদিবাসী অধিকারকর্মী পল্লব চাকমার কাজ ও অবদান তুলে ধরেছে বাংলাদেশে অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশন। অস্ট্রেলিয়া অ্যাওয়ার্ডস বৃত্তি নিয়ে পড়াশোনা করা পল্লব দেশের আদিবাসীদের ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও অধিকার রক্ষায় কাজ করছেন, আর তাঁর নেতৃত্ব এখন দেশের সীমানা ছাড়িয়ে এশিয়া ও আন্তর্জাতিক পরিসরে পৌঁছেছে।

হাইকমিশন জানিয়েছে, পল্লব বর্তমানে এশিয়া ইন্ডিজেনাস পিপলস প্যাক্টের (এআইপিপি) মহাসচিব। এশিয়ার বিভিন্ন দেশের আদিবাসী সংগঠন নিয়ে গড়া এই আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক আদিবাসীদের অধিকার, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা, অন্তর্ভুক্তি ও টেকসই উন্নয়ন নিয়ে কাজ করে। পাশাপাশি তিনি দেশের অন্যতম আদিবাসী অধিকার সংগঠন কাপেং ফাউন্ডেশনের বোর্ডে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে আছেন, আর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির আগপর্যন্ত সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক ছিলেন।

পার্বত্য চট্টগ্রামের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির মধ্যে বড় হওয়া পল্লবের ছোটবেলা থেকেই আদিবাসীদের ভাষা, জ্ঞানব্যবস্থা ও ঐতিহ্যের প্রতি টান তৈরি হয়, যা পরে তাঁর সামাজিক ও পেশাগত কাজের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। ২০১২ সালে অস্ট্রেলিয়া অ্যাওয়ার্ডস বৃত্তি পেয়ে তিনি পড়তে যান ইউনিভার্সিটি অব সাউথ অস্ট্রেলিয়ায়, সেখানে তাঁর স্নাতকোত্তরের বিষয় ছিল মধ্যস্থতা ও সংঘাত নিরসন। পল্লবের ভাষায়, এই বৃত্তি ছিল তাঁর জীবন বদলে দেওয়া অভিজ্ঞতা, বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশে পড়াশোনা তাঁর নেতৃত্ব ও নানা সম্প্রদায়ের সঙ্গে কাজের দক্ষতা বাড়িয়েছে এবং বৈচিত্র্য, অন্তর্ভুক্তি ও শান্তিপূর্ণ সংলাপ নিয়ে পাওয়া শিক্ষা পরে তাঁর কাজকে আরও শক্ত ভিত দিয়েছে।

অস্ট্রেলিয়া অ্যাওয়ার্ডস অ্যালামনাই গ্র্যান্টের অর্থায়নে ২০২৫ সালে পল্লব ও তাঁর সহকর্মীরা রাঙামাটিতে একটি বৈচিত্র্য উৎসবের আয়োজন করেন। আদিবাসী ও অনাদিবাসী মানুষের মধ্যে বোঝাপড়া, সাংস্কৃতিক বিনিময় ও সম্প্রীতি বাড়ানো ছিল এর লক্ষ্য, আর প্রদর্শনী ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় সেখানে তুলে ধরা হয় আদিবাসীদের ভাষা, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। উৎসবে উপস্থিত ছিলেন ক্লিনটন পোবকে, যিনি বাংলাদেশে অস্ট্রেলিয়ার ডেপুটি হেড অব মিশন।

স্থানীয় প্রশাসন, উন্নয়ন সহযোগী, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং আদিবাসী ও অনাদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষ উৎসবে অংশ নেন। সেখানে পার্বত্য চট্টগ্রামে বহুভাষিক শিক্ষা আর আগামী প্রজন্মের জন্য আদিবাসী ভাষা ও জ্ঞান সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও আলোচনা হয়।

এআইপিপির মহাসচিব হিসেবে পল্লব এখন এশিয়ার আদিবাসীদের অগ্রাধিকার ও সমস্যা নিয়ে আঞ্চলিক পর্যায়ের আলোচনা ও সহযোগিতায় যুক্ত। জলবায়ু সহনশীলতা ও পরিবেশগত স্থায়িত্ব প্রশ্নে আদিবাসীদের অগ্রাধিকার ঠিক করতে ২০২৬ সালে যে আঞ্চলিক পরামর্শ প্রক্রিয়া চলে, তাতেও ছিলেন পল্লব। সে বছরই জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক স্থায়ী ফোরামের ২৫তম অধিবেশন বসলে সেখানে এশিয়া ইন্ডিজেনাস পিপলস ককাসের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেন তিনি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ, শান্তি প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়নে আদিবাসীদের আরও কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার পক্ষে কথা বলেন।

কাপেং ফাউন্ডেশনও পল্লবের নেতৃত্বে আঞ্চলিক পর্যায়ে স্বীকৃতি পেয়েছে। আদিবাসী মানবাধিকারকর্মীদের সহায়তায় অগ্রণী ডিফেন্ডার সেন্টারগুলোর একটি হিসেবে ২০২৪ সালে সংগঠনটিকে স্বীকৃতি দেয় এআইপিপি, সংগঠনের পক্ষে সম্মাননাটি নেন পল্লব। তাঁর মতে, আদিবাসী দিবস একদিকে আদিবাসীদের ভাষা, সংস্কৃতি ও জ্ঞানব্যবস্থার সমৃদ্ধি উদযাপনের, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তা রক্ষার উপলক্ষ, আর এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে সরকার, উন্নয়ন সহযোগী ও জনগোষ্ঠীকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।