অস্ট্রেলিয়ার বিশাল আউটব্যাকে এমন একটি শহর আছে, যার জীবনের বড় অংশই চলে মাটির নিচে। দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার কুবের পেডি নামের এই শহরে দোকান, গির্জা, হোটেল, বাড়ি, ক্যাফে ও জাদুঘর তো বটেই, পর্যটকদের থাকার জায়গাও ভূগর্ভে। তীব্র গরম আর শুষ্ক মরুভূমির সঙ্গে মানুষের মানিয়ে নেওয়ার এক অনন্য উদাহরণ হয়ে আছে শহরটি।

স্টুয়ার্ট হাইওয়ের পাশে, অ্যাডিলেড থেকে প্রায় ৮৫০ কিলোমিটার উত্তরের এই শহর বিশ্বজুড়ে ‘অপালের রাজধানী’ নামে পরিচিত। গ্রীষ্মে এখানে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়ানো অস্বাভাবিক নয়; সেই গরমের সঙ্গে মানিয়ে নিতে বাসিন্দারা বহু বছর ধরে বেলেপাথরের স্তর কেটে মাটির নিচে ঘর বানাচ্ছেন, যেগুলো স্থানীয়ভাবে ডাগআউট নামে পরিচিত। এসব ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা তুলনামূলক স্থির থাকে, তাই বাইরে তীব্র গরমেও ভেতরে আরাম মেলে।

২০২১ সালের আদমশুমারিতে কুবের পেডি অঞ্চলের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১ হাজার ৫৬৬; নানা দেশ ও সংস্কৃতির মানুষের বাস শহরটিকে দিয়েছে বহুজাতিক রূপ। এখানে মাটির নিচের জীবন কেবল বাসাবাড়িতে আটকে নেই, শহরজুড়ে ভূগর্ভে রয়েছে উপাসনালয়, দোকান, জাদুঘর ও পর্যটনকেন্দ্র। খনি, অভিবাসন ও সংস্কৃতির মিশেলে গড়া এই ভূগর্ভস্থ জীবনই এখন বিশ্বের নানা প্রান্তের পর্যটকদের কাছে বিস্ময়ের বিষয়।

পাথর খোদাই করা অন্দরসজ্জা ও রঙিন কাচের জানালার জন্য দর্শনার্থীদের কাছে জনপ্রিয় সার্বিয়ান অর্থোডক্স আন্ডারগ্রাউন্ড চার্চ। বেলেপাথর কেটে ক্রুশের আকারে বানানো হয়েছে ক্যাটাকম্ব চার্চ, আর সেন্ট পিটার অ্যান্ড পলস ক্যাথলিক চার্চকে বলা হয় শহরের প্রথম ভূগর্ভস্থ গির্জা।

পুরোনো এক অপাল খনি ঘিরে গড়ে ওঠা উমুনা অপাল মাইন অ্যান্ড মিউজিয়ামে খনির ইতিহাস, জীবাশ্ম, আদিবাসী ও ইউরোপীয় বসতির ইতিহাস এবং মাটির নিচের আধুনিক বাড়ির নমুনা দেখা যায়; অপাল কেনার ব্যবস্থাসহ বড় সংগ্রহও আছে সেখানে। ১৯১৬ সালের পুরোনো খনি, ভূগর্ভস্থ বাড়ি ও জাদুঘর নিয়ে গড়া ওল্ড টাইমার্স মাইনে খনির ভেতর হাঁটা ও নির্দিষ্ট জায়গায় অপাল খোঁজার সুযোগ মেলে। পর্যটকদের জন্য অনেক ডাগআউট এখন আধুনিক আবাসন; লুকআউট কেভ আন্ডারগ্রাউন্ড মোটেলের ১৮টি কক্ষ পাহাড়ের বেলেপাথর খুঁড়ে বানানো, আর ক্রিস্টাল কেভ ক্যাফে পরিচিত শহরের একমাত্র ভূগর্ভস্থ ক্যাফে হিসেবে।

শহরের গল্পের শুরু অপাল দিয়েই। স্থানীয় ইতিহাস অনুযায়ী, ১৯১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ১৫ বছরের উইলি হাচিনসন এখানে অপালের খোঁজ পান; এরপর খনিশ্রমিকেরা আসতে থাকেন, বসতি গড়ে ওঠে এবং ১৯২০ সালে নাম হয় কুবের পেডি, যে আদিবাসী শব্দগুচ্ছ থেকে নামটি এসেছে তার প্রচলিত অর্থ ‘সাদা মানুষের গর্ত’। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে ফেরা কিছু অস্ট্রেলীয় সৈনিকও এখানে থিতু হন, যাদের অনেকে ফ্রান্সের রণক্ষেত্রে ট্রেঞ্চে থাকার অভিজ্ঞতা থেকে মাটির নিচে ঘর বানানোর ধারণা নেন বলে স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখ আছে।

এখন কুবের পেডি কেবল খনিশহর নয়, দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার আউটব্যাকে বেড়াতে আসা পর্যটকদের বড় আকর্ষণ; তারা দেখতে যান মুন প্লেইন, ডগ ফেন্স, কঙ্কু-ব্রেকঅ্যাওয়েজ কনজারভেশন পার্ক, বিস্তীর্ণ অপাল ক্ষেত্র ও পুরোনো খনি। সূর্যাস্তে কঙ্কু-ব্রেকঅ্যাওয়েজের লাল-কমলা মরুভূমি অপরূপ হয়ে ওঠে। পর্যটকেরা চাইলে নির্দিষ্ট এলাকায় হাত দিয়ে মাটি খুঁড়ে অপাল খুঁজতে পারেন, স্থানীয়ভাবে যাকে বলা হয় নুডলিং।