রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক সড়কে টানা নবম দিনের মতো অবরোধ কর্মসূচি চলছে। পাঁচ দফা দাবিতে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের ডাকে গত ২২ অক্টোবর থেকে অনির্দিষ্টকালের এই অবরোধ শুরু হয়। এই অবরোধের কারণে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে সাজেক।
বন্ধ রয়েছে পর্যটকদের যাতায়াত এবং স্থবির হয়ে পড়েছে পর্যটন ও পরিবহন ব্যবসা। একই সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ থাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য ও জরুরি ওষুধের সরবরাহও ব্যাহত হচ্ছে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
আন্দোলনকারীদের পাঁচ দফা দাবির মধ্যে চারটি বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে। তবে প্রধান দাবি নিয়ে মতপার্থক্য থাকায় অবরোধ প্রত্যাহার হয়নি। সাজেক থেকে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার দাবিতে অনড় রয়েছেন আন্দোলনকারীরা। তাদের অভিযোগ, এলাকায় নিরাপত্তাহীনতা, ভয়ভীতি ও চাঁদাবাজির কারণে স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে।
এর আগে সোমবার (২৬ অক্টোবর) সাজেকের উজো বাজারে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সরকারি প্রতিনিধি দলের দীর্ঘ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য আব্দুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া, রাঙামাটির সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ান, দুই জেলার জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অংশ নেন। বৈঠকে পাঁচ দফা দাবির চারটি বিষয়ে সমঝোতা হলেও সশস্ত্র সদস্যদের অপসারণের বিষয়ে নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি। ফলে কোনো সমাধান ছাড়াই বৈঠক শেষ হয় এবং অবরোধ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন আন্দোলনকারীরা।
তিন সদস্যের কমিটি গঠন
সংকট নিরসনে রাঙামাটি জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম হেডম্যান নেটওয়ার্কের সহ সভাপতি ভবতোষ দেওয়ান, সাধারণ সম্পাদক শান্তি বিজয় চাকমা এবং হেডম্যান কল্যাণ মিত্র চাকমা রয়েছেন। কমিটি স্থানীয় হেডম্যান ও কারবারিদের সঙ্গে মতবিনিময় করে প্রশাসনকে পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করেছে। তবে অবরোধ প্রত্যাহারে এখনো কার্যকর কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি।
কমিটির সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রাম হেডম্যান নেটওয়ার্কের সাধারণ সম্পাদক শান্তি বিজয় চাকমা জাগো নিউজকে জানান, স্থানীয় হেডম্যান ও কারবারিদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। তাঁরা জানিয়েছেন, এই আন্দোলনের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা নেই। জেলা প্রশাসনের কাছে প্রতিবেদন পেশ করা হয়েছে। তিনি বলেন, এখন চলমান সংকট থেকে উত্তরণের জন্য জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসন মিলে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ বের করবেন।
পর্যটন ব্যবসা স্থবির
অবরোধের কারণে সাজেকের পর্যটনকেন্দ্রের রিসোর্ট, কটেজ, রেস্তোরাঁ ও দোকানপাট অনেকটাই নিস্তব্ধ। পর্যটক না থাকায় বন্ধ হয়ে গেছে ব্যবসায়ীদের আয়-রোজগার। অন্যদিকে সাজেক-দীঘিনালা-খাগড়াছড়ি সড়কে চলাচলকারী অধিকাংশ যানবাহন অচল হয়ে পড়ায় গাড়ির মালিক, চালক ও শ্রমিকেরাও আর্থিক সংকটে পড়েছেন। ফলে পর্যটন খাতের সঙ্গে যুক্ত কয়েক হাজার মানুষের জীবিকায় এর প্রভাব পড়ছে।
সাজেক রিসোর্ট অনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক রাহুল চাকমা জাগো নিউজকে বলেন, অবরোধের নবম দিন চলছে। পর্যটন ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের দুর্ভোগ ক্রমেই বাড়ছে। খাবারের মজুত শেষ হয়ে আসছে। যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। পরিস্থিতির কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। এখন মূলত এক দফায় এসে ঠেকেছে আন্দোলন। এর সমাধান কীভাবে হবে, সেই অপেক্ষায় আছি। দ্রুত সমাধান হওয়া একান্ত দরকার।
নিত্যপণ্য ও চিকিৎসায় উদ্বেগ
শুধু ব্যবসা-বাণিজ্য নয়, অবরোধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও চিকিৎসাসেবা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। চাল, ডাল, তেলসহ প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য এবং জরুরি ওষুধের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা সীমিত হওয়ায় পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
অবরোধের নবম দিনে সাজেকের বিভিন্ন পয়েন্টে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। বাঘাইহাটের ১০ মাইল ও মাচালংয়ের ১৪ কিলোমিটারসহ কয়েকটি স্থানে সড়কে গাছের গুঁড়ি ফেলে যান চলাচল আটকে রাখা হয়। তবে পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি শান্ত থাকার কথা জানানো হয়েছে।
সাজেকের চলমান সংকটের কারণে একদিকে পর্যটন ও পরিবহন খাতে বিপুল আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে স্থানীয়দের জীবনযাত্রা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে দ্রুত কার্যকর সংলাপ এবং গ্রহণযোগ্য সমাধান না হলে এই অচলাবস্থা আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা করছেন পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
তথ্যসূত্র: জাগো নিউজ
Source: জাগো নিউজ২৪






